জাতীয়

অস্ট্রেলিয়া ও কানাডায় চাকরির প্রলোভনে কোটি টাকা আত্মসাৎ, গ্রেপ্তার ২

ঢাকা, ৩১ জুলাই – স্বপ্ন ছিল অস্ট্রেলিয়া বা কানাডায় পাড়ি জমিয়ে ভাগ্য বদলানোর। সেই স্বপ্নের সুবাদে হাত বাড়িয়েছিলেন ভুয়া ভিসা প্রতারকদের কাছে, আর তাতেই নিঃস্ব হলেন বহু চাকরিপ্রত্যাশী! জাল কাগজপত্র, তৈরি করা কৃত্রিম ওয়েবসাইট আর ডিজিটাল কারসাজি ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া সংঘবদ্ধ চক্রের দুই মূল হোতাকে গ্রেফতার করেছে ডিবি। ৭২ জনেরও বেশি মানুষের জীবন ছারখার করা এই প্রতারকদের চাঞ্চল্যকর কৌশল উন্মোচন করল পুলিশ!

অস্ট্রেলিয়া ও কানাডায় স্থায়ী বসবাস এবং মোটা অঙ্কের বেতনের চাকরির লোভ দেখিয়ে সাধারণ মানুষের সরলতার সুযোগ নিচ্ছিল এক সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র। অভিযোগের ভিত্তিতে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় আসামিদের অবস্থান শনাক্ত করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (উত্তর) বিভাগ।

গত মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলায় এক ঝটিকা অভিযান চালিয়ে চক্রের দুই সক্রিয় সদস্য মারিফুল ইসলাম (২১) ও বাচ্চা বাউ ওরফে হাসিনুরকে (২৮) গ্রেফতার করা হয়। শুক্রবার (৩১ জুলাই) ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নিয়াজ মেহেদী গণমাধ্যমকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

অভিযানকালে তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়—

  • ৯টি ভুয়া বাংলাদেশি পাসপোর্ট
  • ৭টি স্মার্টফোন ও ১৩টি সিম কার্ড
  • প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত ল্যাপটপ

৪ লাখ ৮০ হাজার টাকার প্রতারণা থেকে মামলার সূত্রপাত

এই চক্রের জালে ধরা দিয়েছিলেন ভুক্তভোগী মো. ছায়েদুল হক। অস্ট্রেলিয়ায় একটি ভালো চাকরি পাওয়ার আশায় আসামিদের মিষ্টি কথায় ভুলে ধাপে ধাপে প্রায় ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা তুলে দেন তাদের হাতে। এরপরও যখন তারা আরও টাকার জন্য চাপ দিতে থাকে এবং বিদেশে পাঠানোর কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না, তখন ছায়েদুল হকের সন্দেহ হয়। প্রতারিত হয়েছেন বুঝতে পেরে তিনি রাজধানীর পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেন, যার ধারাবাহিকতায় মাঠে নামে ডিবি।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতাররা স্বীকার করেছেন যে তারা দেশের বিভিন্ন জেলার বিদেশগামী সহজ-সরল মানুষকে টার্গেট করতেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনের লোভ দেখিয়ে যোগাযোগের পর শুরু হতো আসল প্রতারণা।

প্রতারণার ধাপগুলো ছিল চোখ কপালে তোলার মতো:

১. ভুয়া কাগজপত্র তৈরি: ভুক্তভোগীদের বিশ্বাস অর্জনে ভুয়া ওয়ার্ক পারমিট, ভিসা অ্যাপ্রোভাল লেটার ও কানাডার এলএমআইএ (LMIA) লেটার বানাত তারা।

২. হুবহু দেখতে ভুয়া ওয়েবসাইট (Phishing/Cloning): অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার সরকারি ওয়েবসাইটের আদলে একটি ভুয়া ভিসা ভেরিফিকেশন সাইট তৈরি করে রেখেছিল তারা। ভুক্তভোগী যখন ওই সাইটে গিয়ে নিজের নম্বর দিয়ে সার্চ দিতেন, তখন সেখানে “ভিসা অনুমোদিত হয়েছে” (Visa Approved) বার্তা ভেসে উঠত!

৩. ধাপে ধাপে অর্থ আত্মসাৎ: এই ভুয়া বার্তা দেখিয়ে মেডিকেল ফি, ডকুমেন্ট প্রসেসিং ও এয়ার টিকিটের বাহানায় মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে তারা লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিত।

ডিবি কর্মকর্তা নিয়াজ মেহেদী জানান, তাদের ডিজিটাল ডিভাইস পরীক্ষা করে এ পর্যন্ত ৭২ জনেরও বেশি ভুক্তভোগীর সঙ্গে প্রতারণার চাঞ্চল্যকর তথ্য এবং লাখ লাখ টাকার লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

সাত দিনের রিমান্ড আবেদন, ডিবি পুলিশ কী পরামর্শ দিচ্ছে?

আসামিদের ৭ দিনের পুলিশি রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে এবং এই চক্রের অন্য আড়ালে থাকা মাস্টারমাইন্ডদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

একই সঙ্গে বিদেশগামী ভাই-বোনদের সতর্ক করে ডিবির পক্ষ থেকে বিশেষ অনুরোধ জানানো হয়েছে—

অনুমোদন যাচাই: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিজ্ঞাপন বা অপরিচিত ব্যক্তির কথায় কোনো টাকা দেবেন না। বায়রা (BAIRA) বা সরকারি নিবন্ধিত রিক্রুটিং এজেন্সির বৈধতা যাচাই করুন।

দূতাবাস ও অফিশিয়াল মাধ্যম: ভিসা বা এলএমআইএ পেপার কেবল সংশ্লিষ্ট দেশের অফিশিয়াল ওয়েব ডোমেইন (.gov) বা সরাসরি দূতাবাসের মাধ্যমে যাচাই করুন।

দ্রুত আইনি ব্যবস্থা: সন্দেহ হলে বা প্রতারণার শিকার হলে কালবিলম্ব না করে নিকটস্থ থানা বা সাইবার পুলিশের সহায়তা নিন।

এনএন/ ৩১ জুলাই ২০২৬


Back to top button