ইসলামী ব্যাংকে চরম অস্থিরতা, এবার শীর্ষ কর্মকর্তাদের জরুরি তলব করল বাংলাদেশ ব্যাংক

ঢাকা, ১৪ জুন – দেশের ব্যাংকিং খাতের অন্যতম শীর্ষ স্তম্ভ এবং বৃহত্তম বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ‘ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি’তে শুরু হয়েছে নজিরবিহীন অস্থিরতা। নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট তীব্র আস্থাহীনতা, গ্রাহকদের দলবেঁধে আমানত প্রত্যাহার এবং ভয়াবহ তারল্য (ক্যাশ) সংকটের মুখে এবার ব্যাংকটির শীর্ষ নির্বাহীদের জরুরি ভিত্তিতে তলব করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
আজ রোববার (১৪ জুন) বিকেল ৪টায় বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে খোদ গভর্নরের সভাপতিত্বে এই সংকটকালীন বৈঠক শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই জরুরি বৈঠকে ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব), দুজন অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) এবং ছয়জন উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) অংশ নিয়েছেন।
নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের পর ব্যাংকটিতে যে তীব্র ক্ষোভ ও গ্রাহকদের টাকা তোলার হিড়িক পড়েছে, সেই চলমান পরিস্থিতি এবং তারল্য চাপ সামাল দেওয়ার উপায় খুঁজতেই গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান এই বৈঠক ডেকেছেন।
ব্যাংকিং সূত্র জানাচ্ছে, গত ২৪ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর থেকেই গ্রাহকদের বড় একটি অংশের মধ্যে চরম আস্থাহীনতা তৈরি হয়। যার জেরে মাত্র সাত কার্যদিবসে ব্যাংকটি থেকে প্রায় ৪ হাজার ২৪০ কোটি টাকা তুলে নেন আতঙ্কিত আমানতকারীরা। ফলে ব্যাংকটির ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও (সিআরআর) যেখানে নিয়ম অনুযায়ী প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা থাকার কথা, তা হু হু করে কমে বর্তমানে মাত্র ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে! ধস নেমেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সংরক্ষিত চলতি হিসাবের ব্যালেন্সেও।
দৈনন্দিন লেনদেন সচল রাখতে হিমশিম খাওয়া ইসলামী ব্যাংক ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তারল্য সহায়তা চেয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রাথমিকভাবে আড়াই হাজার কোটি টাকা ছাড় করেছে। এর মধ্যে ২ হাজার কোটি টাকা নগদ এবং ৫০০ কোটি টাকা আরটিজিএস (RTGS) সেবা সচল রাখতে দেওয়া হয়েছে।
কেন এই লঙ্কাকাণ্ড? আসল রহস্য কী?
গত ২৪ মে ইসলামী ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম. জুবায়দুর রহমান আকস্মিকভাবে পদত্যাগ করার পরই বিতর্কের সূত্রপাত। নতুন চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের নিয়োগকে কেন্দ্র করে ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শেয়ারহোল্ডারদের একাংশের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে।
হেড অফিসের সামনে বিক্ষোভ: ‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে মতিঝিলে প্রধান কার্যালয়ের সামনে টানা এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বিক্ষোভ চলছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, বিতর্কিত কাউকে শীর্ষ পদে রাখলে ব্যাংকের সংস্কার বাধাগ্রস্ত হবে। দাবি না মানলে আগামী মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংক ঘেরাও করার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
গভর্নরের বক্তব্য: তবে গত শুক্রবার প্রস্তাবিত বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান স্পষ্ট জানিয়েছেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো অনেক তথ্যই গুঞ্জন। সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রমে কোনো অবৈধ হস্তক্ষেপ বা কারও বদলি-পদোন্নতিতে প্রভাব খাটায়নি।
দেশের বৃহত্তম এই ব্যাংকের অস্থিরতা পুরো আর্থিক খাতকে ঝুঁকিতে ফেলবে কিনা, তা নিয়ে এখন সাধারণ গ্রাহকদের মনে তীব্র উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।
এনএন/ ১৪ জুন ২০২৬









