আমদানি ও রপ্তানির আড়ালে বছরে ৮ বিলিয়ন ডলার পাচারের অভিযোগ রুমিন ফারহানার

ঢাকা, ৮ জুন – ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে আজ সোমবার (৮ জুন) এক নাটকীয় মুহূর্তের সাক্ষী হলো দেশবাসী। দীর্ঘ এক ঘণ্টা হাত উঁচিয়ে অপেক্ষা করার পর অবশেষে যখন সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা কথা বলার সুযোগ পেলেন, তখন তার করা একটি প্রশ্নে রীতিমতো গরম হয়ে ওঠে সংসদের হাওয়া। দেশের অর্থনীতিকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাওয়া সবচেয়ে বড় ব্যাধি—’অর্থ পাচার’ নিয়ে সরকারের দিকে সরাসরি তোপ দাগেন তিনি।
সংসদের সম্পূরক প্রশ্নত্তোর পর্বে রুমিন ফারহানা অভিযোগ করেন, কেবল আমদানি আর রপ্তানির আড়ালেই দেশ থেকে প্রতি বছর প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৯৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি) বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে।
স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে কতটা বেগ পেতে হয়েছে, তা রুমিন ফারহানার বক্তব্যের শুরুতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ডেপুটি স্পিকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, “দীর্ঘ এক ঘণ্টা হাত উঁচিয়ে ছিলাম, এরপর সংসদে কথা বলার সুযোগ পেয়েছি।”
এরপরই তিনি মূল প্রসঙ্গে গিয়ে সরাসরি বাণিজ্যমন্ত্রীর কাছে জানতে চান, আমদানি-রপ্তানির আড়ালে যে দেদারসে টাকা পাচার হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আসলে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেবে কি না।
রুমিন ফারহানার এই ক্ষুরধার প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরও বেশ কৌশলী এবং বাস্তববাদী উত্তর দেন। তিনি স্বীকার করে নেন যে, বাণিজ্য খাতের আড়ালে অনেক কিছুই ঘটছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, “আমদানি-রপ্তানির আড়ালে অনেক কিছু আছে। নানাপণ্য বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। অর্থপাচার হচ্ছে, এটা নিয়ে স্টাডির (গবেষণার) বিষয় আছে। তবে এটা শুনতে যত সহজ, প্রমাণ করা ততটাই কঠিন।”
মন্ত্রী আরও জানান, বর্তমানে দেশে প্রায় ১৩০ বিলিয়ন ডলারের বিশাল বাণিজ্য হচ্ছে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের মধ্যে নির্দিষ্ট করে কোন পণ্য রপ্তানি করে কত টাকা পাচার করা হচ্ছে, তা হুট করে বা সুনির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন। তবে সরকার হাত গুটিয়ে বসে নেই। মন্ত্রী স্পষ্ট আশ্বাস দিয়ে বলেন, “এটা নিয়ে আমরা কাজ করছি। রপ্তানির আড়ালে পাচারের প্রমাণ পেলেই যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
নেপথ্য বিশ্লেষণ: কেন এই ওভার-ইনভয়েসিং আর আন্ডার-ইনভয়েসিং ঠেকানো যাচ্ছে না?
অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, বাংলাদেশে অর্থ পাচারের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো আমদানি ও রপ্তানি।
ওভার-ইনভয়েসিং (Over-Invoicing): কোনো পণ্যের প্রকৃত দাম ১ টাকা হলে, কাগজে-কলমে সেটির দাম ১০ টাকা দেখিয়ে অতিরিক্ত ৯ টাকা বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
আন্ডার-ইনভয়েসিং (Under-Invoicing): দেশ থেকে ১০ টাকার পণ্য রপ্তানি করে কাগজে-কলমে দেখানো হয় ১ টাকা। বাকি ৯ টাকা আর দেশে ফেরত আনা হয় না, তা বিদেশের ব্যাংকেই রেখে দেওয়া হয়।
বাণিজ্যমন্ত্রী ঠিক এই জায়গাটাতেই ইঙ্গিত করেছেন। লাখ লাখ চালানের ভিড়ে কোন চালানে পণ্যের দাম কম বা বেশি দেখানো হচ্ছে, তা ট্র্যাক করা প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার ছাড়া অসম্ভব।
সংসদে তর্ক-বিতর্ক হবে, বিরোধী দল প্রশ্ন তুলবে আর সরকার ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেবে—এটিই আমাদের চেনা সংসদীয় রূপ। কিন্তু সাধারণ মানুষ আজ জানতে চায়, এই যে প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার দেশ থেকে হাওয়া হয়ে যাচ্ছে, যার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে মুদ্রাস্ফীতি আর ডলার সংকটের মধ্য দিয়ে, তা থামবে কবে?
বাণিজ্যমন্ত্রী প্রমাণ করার কঠিন চ্যালেঞ্জের কথা বলেছেন ঠিকই, কিন্তু দেশের অর্থনীতির স্বার্থেই এই ‘কঠিন’ কাজটিকে এখন ‘সহজ’ করার সময় এসেছে।
এনএন/ ৮ জুন ২০২৬









