মধ্যপ্রাচ্য

আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর ১০০ দিন অতিবাহিত: দাফন নিয়ে কাটছে না ধোঁয়াশা

তেহরান, ৭ জুন – যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর কেটে গেছে ১০০টিরও বেশি দিন। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা থাকা এই নেতার দাফন আজও সম্পন্ন করতে পারেনি ইরান কর্তৃপক্ষ। শিয়া ইসলামিক ঐতিহ্য অনুযায়ী যেখানে মৃত্যুর পর দ্রুততম সময়ে মরদেহ সমাহিত করার কঠোর নিয়ম রয়েছে, সেখানে খামেনির দাফনে এই নজিরবিহীন বিলম্ব এখন দেশের ভেতরে ও আন্তর্জাতিক মহলে শত শত প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

এই চরম ধোঁয়াশার মাঝেই খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি বাবার স্থলাভিষিক্ত হয়ে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হয়েছেন। তবে ক্ষমতা হস্তান্তর হলেও খামেনির মরদেহ কোথায় আছে এবং কেন দাফন করা হচ্ছে না—তা নিয়ে তেহরানের রহস্যময় নীরবতা জল্পনার পারদ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

কেন আটকে আছে শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা?

ইরান-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘ইরান ইন্টারন্যাশনাল’-এর এক বিস্ফোরক প্রতিবেদনে খামেনির দাফন আটকে থাকার পেছনে মূলত দুটি বড় কারণ তুলে ধরা হয়েছে:

১. নতুন শীর্ষ নেতৃত্বের চরম নিরাপত্তা ঝুঁকি: খামেনির উত্তরসূরি ও তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনি বাবার মৃত্যুর পর থেকে আজ পর্যন্ত একটিবারের জন্যও জনসমক্ষে আসেননি। তেহরানের দাবি, মার্কিন-ইসরায়েলি ওই হামলায় মোজতবা সামান্য আহত হলেও বেঁচে গেছেন। তবে তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়ে এখনও গভীর সংশয় রয়েছে। সর্বোচ্চ নেতার জানাজা ও দাফন একই সাথে এক বিশাল রাজনৈতিক ঘটনা, যেখানে নতুন নেতার উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। কিন্তু মোজতবা সামনে আসলেই আবারও বড় ধরণের হামলা বা নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার চরম আতঙ্ক রয়েছে তেহরানের নীতিনির্ধারকদের মনে।

২. মরদেহের ক্ষত ও শনাক্তকরণের জটিলতা: মার্কিন-ইসরায়েলি সেই বিধ্বংসী হামলায় খামেনির মরদেহ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল কি না, তা নিয়ে মুখ খুলছে না কোনো সরকারি দপ্তর। একই হামলায় নিহত অন্যান্য জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডারদের মরদেহ কয়েক সপ্তাহ পর উদ্ধার করা হয়েছিল এবং নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে ডিএনএ (DNA) টেস্টের প্রয়োজন পড়েছিল। খামেনির মরদেহের বর্তমান অবস্থা দাফনের উপযোগী কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকরা।

ঐতিহাসিকভাবেই ইরানের শীর্ষ নেতাদের দাফন প্রক্রিয়াকে এক বিশাল রাজনৈতিক প্রচারণায় রূপ দেয় দেশটির সরকার। এর আগে ২০২০ সালে রেভল্যুশনারি গার্ডসের প্রধান কাসেম সোলাইমানির মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ ইরাক ও ইরানের একাধিক শহর ঘুরিয়ে এক জাতীয় জাগরণ তৈরির চেষ্টা হয়েছিল।

খামেনির ক্ষেত্রেও তেহরানের পরিকল্পনা ছিল একই রকম। কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় পবিত্র শহর মাশহাদে সমাহিত করার আগে খামেনির মরদেহ নিয়ে দেশের বড় বড় শহরগুলোতে বিশাল ‘শোক শোভাযাত্রা’ করা হবে। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি এবং ভঙ্গুর লজিস্টিক সাপোর্টের কারণে এই ধরণের লাখো মানুষের গণজাগরণ বা গণজমায়েত আয়োজন করা এখন খোদ ইরানি প্রশাসনের জন্যই এক দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত থমথমে এবং অস্বাভাবিক। খামেনির মৃত্যুর ১০০ দিন পর নতুন উত্তরসূরির নাম ঘোষণা করা হলেও, দেশের মানুষ এখনও তাদের নতুন নেতা মোজতবাকে চোখে দেখেনি। একদিকে সাবেক নেতাকে ঐতিহাসিক বিদায় জানানোর অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে পর্দার আড়ালে থাকা নতুন নেতৃত্ব—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের এই পরাশক্তির ভবিষ্যৎ এবং ক্ষমতার চাবিকাঠি এখন এক গভীর অন্ধকারের চাদরে ঢাকা।

এনএন/ ৭ জুন ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language