সম্পাদকের পাতা

সংখ্যালঘু থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠতার দোরগোড়ায় কার্নির লিবারেল

নজরুল মিন্টো

কানাডার সংসদীয় রাজনীতিতে দলবদল নতুন নয়। তবে সব দলবদল সমান গুরুত্ব বহন করে না। কিছু ঘটনা শুধু একজন এমপির দল পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, আবার কিছু ঘটনা সরাসরি ক্ষমতার ভারসাম্যে প্রভাব ফেলে। ৮ এপ্রিল ২০২৬ সালে অন্টারিওর সার্নিয়া ল্যাম্বটন বকেজোয়ানাং আসনের চারবারের এমপি মেরিলিন গ্ল্যাদোর কনজারভেটিভ পার্টি ছেড়ে লিবারেলে যোগদান ঠিক তেমনই একটি ঘটনা। এই দলবদলের পর মার্ক কার্নির লিবারেলরা ৩৪৩ সদস্যের হাউস অব কমন্সে ১৭১ আসনে পৌঁছেছে, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সীমা ১৭২। অর্থাৎ অটোয়ার ক্ষমতার অঙ্ক এখন এক আসনের ব্যবধানে দাঁড়িয়ে আছে।

গ্ল্যাদোর সিদ্ধান্তকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। কারণ এটি গত কয়েক মাসে বিরোধী শিবির থেকে কার্নির লিবারেল দলে যোগদানের পঞ্চম ঘটনা। এই ধারাবাহিকতা শুরু হয় ২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর, যখন নোভা স্কোশিয়ার কনজারভেটিভ এমপি ক্রিস ডি’এন্ত্রেমঁ কার্নির অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যের কথা বলে লিবারেলে যোগ দেন। এরপর ১১ ডিসেম্বর অন্টারিওর কনজারভেটিভ এমপি মাইকেল মা দেশের ভবিষ্যতের জন্য ঐক্য ও দৃঢ় পদক্ষেপের প্রয়োজনের কথা বলে দলবদল করেন। ১৮ ফেব্রুয়ারি এডমন্টনের কনজারভেটিভ এমপি ম্যাট জেনেরু কার্নির বৈশ্বিক নেতৃত্বের ভাষণে প্রভাবিত হওয়ার কথা বলে লিবারেলে যান। ১১ মার্চ নুনাভুটের এনডিপি এমপি লরি ইডলাউট বলেন, আর্কটিক ইস্যুতে ভেতর থেকে কাজ করাই তার জন্য বেশি ফলপ্রসূ হবে। এই ধারার সর্বশেষ নাম মেরিলিন গ্ল্যাদো। রয়টার্স এক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের বক্তব্য তুলে ধরে বলেছে, কানাডার সাম্প্রতিক রাজনীতিতে বিরোধী শিবির থেকে এভাবে একের পর এক সরকারদলে যোগ দেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল।

এই ধারাবাহিক দলবদলের পেছনে শুধু ব্যক্তি সিদ্ধান্ত নয়, কানাডার বদলে যাওয়া রাজনৈতিক আবহও কাজ করছে। কনজারভেটিভ পার্টির জনসমর্থন কমে যাওয়ার পেছনে মূল কারণ হলো, তাদের রাজনৈতিক কৌশল এখন আগের মতো ভোটারদের টানতে পারছে না। দীর্ঘদিন ধরে পিয়ের পোলিভারের রাজনীতি ট্রুডোবিরোধী অসন্তোষকে কেন্দ্র করে এগিয়েছে। কিন্তু ট্রুডোর বিদায়ের পর সেই আক্রমণের মূল ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। একই সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক হুমকি এবং কানাডার সার্বভৌমত্ব নিয়ে মন্তব্য জনমনে নতুন দুশ্চিন্তা তৈরি করে। এর ফলে ভোটারদের একটি অংশ এবং বিরোধী শিবিরের কিছু মধ্যপন্থী নেতা নতুন করে রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণে ভাবতে শুরু করেন।

অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বাণিজ্যসংকট এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে এখন কানাডার জনমতে একটি স্পষ্ট প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ক্রমশ এমন নেতৃত্বের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে, যাকে মানুষ স্থির, দায়িত্বশীল এবং সংকট মোকাবিলায় সক্ষম বলে মনে করে। এই জায়গাতেই মার্ক কার্নি সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন। অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাকে অনেকের কাছে উপযোগী নেতা হিসেবে তুলে ধরেছে। মার্চের শেষ দিকে প্রকাশিত এক জনমত জরিপে দেখা যায়, পছন্দের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কার্নির সমর্থন ছিল ৫৪ দশমিক ৫ শতাংশ, আর পিয়ের পোলিভারের পক্ষে ছিল ২২ দশমিক ৯ শতাংশ। এই ব্যবধান শুধু জনপ্রিয়তার পার্থক্য নয়; এটি নেতৃত্বের ধরন ও রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে জনমতের পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত দেয়।

লিবারেলদের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পটি কেবল ভাগ্যের ফের নয়। ২০২৫ সালের শুরুতে দলটি স্পষ্ট চাপের মধ্যে ছিল। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তারা নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান নতুন করে গুছিয়ে নেয়। নেতৃত্ব পরিবর্তন সেই প্রক্রিয়াকে গতি দেয়। পাশাপাশি মধ্যপন্থী ও বামঘেঁষা ভোটারদের একটি অংশ আবার লিবারেলের দিকে ফিরে আসে। এর ফল দেখা যায় এপ্রিল ২০২৫ সালের ফেডারেল নির্বাচনে, যখন মার্ক কার্নির নেতৃত্বে দলটি একটি শক্তিশালী সংখ্যালঘু সরকার গঠন করে। অর্থাৎ লিবারেলদের বর্তমান শক্তিবৃদ্ধি হঠাৎ ঘটেনি; এটি ছিল বদলে যাওয়া নেতৃত্ব, নতুন কৌশল এবং ভোটারদের আস্থার পুনরাগমনের ফল।

এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব এখন সংসদের আসনসংখ্যাতেও স্পষ্ট। ২০২৫ সালের নির্বাচনে লিবারেলরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও একটি শক্তিশালী সংখ্যালঘু সরকার গঠন করেছিল। পরে বিরোধী শিবির থেকে একের পর এক এমপি তাদের দলে যোগ দেওয়ায় সেই অবস্থান আরও মজবুত হয়। মেরিলিন গ্ল্যাদোর যোগদানের পর লিবারেলদের আসনসংখ্যা ১৭১-এ পৌঁছেছে। ফলে সংসদের বর্তমান সমীকরণে লিবারেলরা এখন পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে।

এই কারণেই ১৩ এপ্রিলের উপনির্বাচন এখন জাতীয় গুরুত্ব পেয়েছে। ইলেকশন্স কানাডার সূচি অনুযায়ী ওই দিন স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট, ইউনিভার্সিটি রোজডেল এবং তেরবোনে ভোট হবে। এই তিনটির যেকোনো একটিতে জয় পেলেই লিবারেলরা পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পৌঁছে যাবে। ফলে এই উপনির্বাচন কেবল শূন্য আসন পূরণের ভোট নয়; এগুলো কার্নি সরকারের ভবিষ্যৎ সংসদীয় স্থিতিরও পরীক্ষা।

এই প্রেক্ষাপটে স্কারবোরো সাউথওয়েস্টে ডলি বেগমের প্রার্থিতা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। তিনি লিবারেল প্রার্থী হিসেবে এমন এক আসনে লড়ছেন, যা সংখ্যাগরিষ্ঠতার অঙ্কে সরাসরি যুক্ত। লিবারেল পার্টি তাকে সাত বছরের বেশি সময়ের স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব, অন্টারিও বিরোধী দলের সাবেক ডেপুটি লিডার এবং কমিউনিটিতে পরিচিত মুখ হিসেবে সামনে এনেছে। তার প্রচারণাকে কেন্দ্রীয় লিবারেল শিবিরও গুরুত্ব দিচ্ছে, যা এই আসনের কৌশলগত গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করে। ফলে তার সম্ভাব্য জয় শুধু একটি আসন বৃদ্ধির প্রশ্ন নয়; এটি দেখাবে কার্নির উত্থান মাঠপর্যায়ের জনসমর্থনেও কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে।

ভবিষ্যতের বড় প্রশ্ন এখন উপনির্বাচনের ফলের ওপর নির্ভর করছে। লিবারেলরা যদি অন্তত একটি আসন পায়, তবে সংসদে তাদের অবস্থান শুধু আরও শক্তিশালী হবে না; ২০২৯ পর্যন্ত স্থিতিশীলভাবে সরকার পরিচালনার পথও খুলে যাবে। সে ক্ষেত্রে কনজারভেটিভদের জন্য চাপ আরও বাড়বে। কারণ তারা তখন শুধু সংখ্যায় পিছিয়ে থাকবে না; এমন এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হবে, যেখানে লিবারেলরা নিজেদের জাতীয় স্থিতিশীলতার প্রধান দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ পাবে।

তথ্যসূত্র:
Reuters (৮ এপ্রিল ২০২৬)
Liberal Party of Canada (৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)
Elections Canada (এপ্রিল ২০২৬)


Back to top button
🌐 Read in Your Language