উত্তর আমেরিকা

জ্বালানি সংকট সামাল দিতে ১৪ কোটি ব্যারেল ইরানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলল যুক্তরাষ্ট্র

ওয়াশিংটন, ২১ মার্চ – ইরানের সঙ্গে সামরিক সংঘাত শুরুর মাত্র তিন সপ্তাহের মাথায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে প্রবল চাপে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে অর্থনৈতিক নেতিবাচক প্রভাব এড়াতে শেষ পর্যন্ত এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওয়াশিংটন।

তারা শত্রু দেশ ইরানের প্রায় ১৪ কোটি ব্যারেল তেলের ওপর থেকে সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। বর্তমানে সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় থাকা এই বিপুল পরিমাণ তেল যাতে ভারত, জাপান, থাইল্যান্ড এবং ভিয়েতনামের মতো মার্কিন মিত্র দেশগুলো সহজেই ক্রয় করতে পারে, মূলত সেই উদ্দেশ্যেই এই ছাড় দেওয়া হচ্ছে। হোয়াইট হাউসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী প্রায় অচল হয়ে পড়েছে এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

এ কারণেই তারা এমন একটি অনাকাঙ্ক্ষিত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যম পলিটিকো তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে যুক্তরাষ্ট্র এর আগে তাদের কৌশলগত রিজার্ভ থেকে কয়েক কোটি ব্যারেল তেল সরবরাহ করেছিল। একইসঙ্গে রাশিয়ার তেলের ওপর থেকে কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করা এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর মতো উদ্যোগও নেওয়া হয়।

তবে এসব পদক্ষেপ দাম কমাতে খুব একটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ১১২ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে, যা গত সাড়ে তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ রেকর্ড। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারেও পেট্রোলের দাম ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি গ্যালন প্রায় ৪ ডলারে পৌঁছেছে। এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সমুদ্রপথে ভাসমান ইরানি তেল আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ করা ছাড়া ট্রাম্প প্রশাসনের হাতে অন্য কোনো কার্যকর বিকল্প ছিল না।

মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট এই পদক্ষেপকে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র একটি অংশ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, এই তেল ব্যবহার করে বিশ্ববাজারে দাম কমানোর পাশাপাশি উল্টো তেহরানের কৌশলের বিরুদ্ধেই একে মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে কাজে লাগানো হবে। তবে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের এই সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে কিছুটা অস্বস্তিকর বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

কারণ একসময় বারাক ওবামা প্রশাসনের করা ইরান চুক্তির তীব্র সমালোচনা করেছিলেন ট্রাম্প। অথচ এখন পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি নিজেই পরোক্ষভাবে ইরানকে তেল বিক্রির সুযোগ করে দিচ্ছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবশ্য যুক্তি দেওয়া হচ্ছে যে, এই তেল শেষ পর্যন্ত হয়তো চীনই কিনে নিত। তাই মার্কিন মিত্ররা এটি কিনতে পারলে তাদের জ্বালানি সরবরাহ অন্তত নিশ্চিত হবে। বাজার বিশেষজ্ঞরা অবশ্য কিছুটা ভিন্ন মত পোষণ করছেন।

তাদের মতে, এই ১৪ কোটি ব্যারেল তেল দিয়ে বিশ্ববাজারের মাত্র দেড় দিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব, যা বর্তমান দীর্ঘমেয়াদী সংকটের তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল। ইউরেশিয়া গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক গ্রেগরি ব্রু মনে করেন, এই তেলের মজুদ দ্রুত শেষ হয়ে গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করবে। তখন ওয়াশিংটনকে হয়তো বাধ্য হয়ে সাধারণভাবেই ইরানের তেলের ওপর থেকে সমস্ত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার মতো কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হবে।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র টেলর রজার্স গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সামরিক লক্ষ্য অর্জিত হওয়ার পর তেলের দাম দ্রুত স্বাভাবিক পর্যায়ে নেমে আসবে। প্রয়োজনে পরিস্থিতি মোকাবিলায় আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে এই মূল্যবৃদ্ধিকে খুব বড় কোনো সমস্যা হিসেবে দেখছেন না।

তিনি একে যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট একটি সাময়িক সংকট হিসেবেই বিবেচনা করছেন। এদিকে জ্বালানি সংকট সামাল দিতে প্রশাসনের একটি বিশেষ নীতি নির্ধারক দল গ্রীষ্মকালীন জ্বালানি ব্যবহারের ওপর কিছু পরিবেশগত নিয়মনীতি শিথিল করার কথা ভাবছে।

তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, যতদিন পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত না হচ্ছে, ততদিন বিশ্ব অর্থনীতিতে এই অস্বস্তিকর প্রভাব অব্যাহত থাকবে।

এ এম/ ২১ মার্চ ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language