সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে অস্থিরতা, দাম ছাড়াল ১০০ ডলার

তেহরান, ১৬ মার্চ – ইরান এবং ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সংঘাত তৃতীয় সপ্তাহে গড়ানোয় আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম গত রবিবার ২০২২ সালের জুলাই মাসের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ব্রেন্ট ক্রুডের দাম দুই দশমিক নয় শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৬ দশমিক ১২ ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে মার্কিন অপরিশোধিত তেলের দাম দুই দশমিক ছয় শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১০১ দশমিক ৫৩ ডলারে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন ইঙ্গিত দিয়েছে যে এই সংঘাত আরও কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে যা বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয় ইরানের নিয়ন্ত্রণাধীন গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই পথ দিয়ে তেলবাহী ট্যাঙ্কারের চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে দীর্ঘ সময় এই পথ বন্ধ থাকলে তেলের দাম আরও বেড়ে যেতে পারে। গত রবিবার একপর্যায়ে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছালেও পরে তা ১০০ ডলারের কাছাকাছি স্থিতিশীল হয়।
তেল সরবরাহে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক উদ্বেগ কমাতে যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেলবাহী জাহাজগুলোকে নিরাপদে বের করে আনতে মার্কিন নৌবাহিনী নিরাপত্তা দেবে। তবে এই মিশনের জন্য নৌবাহিনীকে পুরোপুরি প্রস্তুত করতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে বলে প্রশাসন স্বীকার করেছে। ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল এ দেওয়া এক পোস্টে মিত্র দেশগুলোর সহযোগিতা কামনা করেছেন যাতে সমন্বিত উদ্যোগে দ্রুত এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ খুলে দেওয়া যায়।
অন্যদিকে সংঘাতের মধ্যে ইরান হরমুজ প্রণালিতে সমুদ্র মাইন স্থাপন করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে এবং তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত তেল ও গ্যাস স্থাপনায় হামলার হুমকিও দিয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ওই এলাকায় বেশ কয়েকটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার হামলার শিকার হয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ আইল্যান্ডে বিমান হামলা চালালেও কৌশলগত কারণে দেশটির তেলক্ষেত্র সরাসরি ধ্বংস করা থেকে বিরত রয়েছে। জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। মেক্সিকো উপসাগরে ব্রিটিশ পেট্রোলিয়ামের একটি নতুন তেল প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং ক্যালিফোর্নিয়া উপকূলে বন্ধ থাকা কিছু তেলক্ষেত্র পুনরায় চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা তাদের জরুরি মজুত থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যা মার্চের শেষ নাগাদ বাজারে পৌঁছানোর আশা করা হচ্ছে। তেল সরবরাহে বিঘ্নের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়ছে। আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দেশটিতে গ্যাসোলিনের দাম গড়ে ২৪ শতাংশ বেড়ে গ্যালনপ্রতি তিন দশমিক ৭০ ডলারে পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন তেলের দাম বাড়ার ফলে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে যা খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে সার সরবরাহ ব্যাহত হলে বৈশ্বিক কৃষি উৎপাদনও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
এস এম/ ১৬ মার্চ ২০২৬









