সিঙ্গুর মামলায় বড় রায়, টাটাকে ৭৬৬ কোটি টাকা দিতে হবে রাজ্যকে

কলকাতা, ৩১ অক্টোবর – টাটা মোটরসকে ৭৬৫.৭৮ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে। সিঙ্গুরে ন্যানো কারখানা বন্ধের প্রেক্ষিতে তিন সদস্যের আরবিট্রাল ট্রাইব্যুনাল এই নির্দেশ দিয়েছে বলে জানিয়েছে টাটা গোষ্ঠী। তাদের দাবি, ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে ১১ শতাংশ হারে রাজ্য সরকারকে সুদও দিতে হবে। যদিও বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, সরকারের তরফে এই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য আইনি পথ খোলা আছে।
সোমবার ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জে একটি বিবৃতি দিয়ে টাটার তরফে বলা হয়েছে, “২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর তিন সদস্যের আরবিট্রাল ট্রাইব্যুনালে সিঙ্গুরে অটোমোবাইল কারখানা মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। সর্বসম্মত ভাবে ট্রাইবুনাল, টাটা মোটরসকে ৭৬৫.৭৮ কোটি টাকা দিতে বলেছে। সেই সঙ্গে, ২০১৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে পুরো ক্ষতিপূরণ পুনরুদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত ১১ শতাংশ হারে সুদ দিতে বলা হয়েছে।”
এ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য শিল্পোন্নয়ন নিগমের কর্পোরেট কমিউনিকেশনের প্রধান সোমদত্তা বসুর সঙ্গে আনন্দবাজার অনলাইন যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ‘‘এ বিষয়ে আমাদের কাছে কোনও তথ্য নেই।’’
উল্লেখ্য, ২০০৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতায় আসার পরে সিঙ্গুরে ন্যানো প্রকল্পের ঘোষণা করেছিলেন বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। সেই মতো রাজ্য সরকার সিঙ্গুরে জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু করে। কিন্তু, অনেকেই জমি দিতে অস্বীকার করেন। সেই অনিচ্ছুক চাষিদের পাশে দাঁড়িয়ে বিষয়টি নিয়ে আন্দোলনে নামে সেই সময়কার বিরোধী দল তৃণমূল। ধারাবাহিক সেই আন্দোলনের জেরে অনেক টানাপড়েনের পর টাটা গোষ্ঠী এ রাজ্য থেকে তাদের ন্যানো প্রকল্প তুলে নেয়। বস্তুত, ২০১১ সালে এই সিঙ্গুর আন্দোলনে ভর করেই রাজ্যের মসনদে বসার পথ প্রশস্ত করেছিলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তৃণমূল সরকারের প্রথম কাজই ছিল সিঙ্গুরের অনিচ্ছুক চাষিদের জমি ফেরত দিতে আইন তৈরি করা। মমতার মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে প্রথম সিদ্ধান্ত ছিল এটাই।
টাটা গোষ্ঠীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশের খবর প্রসঙ্গে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম আনন্দবাজার অনলাইনকে বলেন, ‘‘রাজ্যের বেকারদের স্বপ্ন ভাঙার পেনাল্টি দিতে হচ্ছে। শুধু ওই টাকা নয়। সঙ্গে ১১ শতাংশ সুদও দিতে হবে। অঙ্কটা দাঁড়াবে ১৬০০ কোটি টাকার বেশি।’’ তাঁর সংযোজন, এমনিতেই রাজ্য সরকারকে ধারদেনা করে চলতে হচ্ছে। তার পর এই টাকাও মেটাতে হবে।’’ সেলিম আরও বলেন, ‘‘যে ধ্বংসলীলা সিঙ্গুরে হয়েছিল, তার জন্য তৃণমূল যেমন দায়ী, তেমনই দায়ী বিজেপি। এখনও সেই সব ছবি খুললে দেখা যাবে মমতার পাশে লালকৃষ্ণ আডবাণী এবং রাজনাথ সিংহদের দেখা যাবে।’’
অন্য দিকে, এই প্রসঙ্গে রাজ্য বিজেপির মুখ্য মুখপাত্র শমীক ভট্টাচার্য বলেন, বিজেপি নীতিগত ভাবে বলপূর্বক কৃষিজমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে। যে পরিস্থিতি সেদিন সিঙ্গুরে তৈরি হয়েছিল, যখন জমির চরিত্র বদল গিয়ে সেখানে আর চাষ করা সম্ভব ছিল না। আমাদের তৎকালীন রাজ্য সভাপতি সত্যব্রত মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সঙ্গে দেখা করেন। আমাদের প্রস্তাব ছিল সুনির্দিষ্ট। আমরা বলেছিলাম, যে ভাবে আপনারা জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া চালিয়ে নিয়ে গেলেন, তার বিরোধিতা করছি আমরা। কিন্তু যখন কনস্ট্রাকশন শুরু হয়ে গিয়েছে, তখন আপনাদের উচিত, জমির বাজারমূল্যের চেয়ে অন্তত তিন গুণ টাকা জমিমালিকদের দেওয়া। পরিবার পিছু এক জনের যে কোনও একটি চাকরি সুনিশ্চিত করুন।’’ শমীক আরও বলেন, ‘‘তৃণমূলের হঠকারী আন্দোলন এবং সিপিএমের অদূরদর্শিতা একটি চরম শিল্প সম্ভাবনার মৃত্যু ঘটিয়ে দিয়েছিল। যেখানে একটি আন্তর্জাতিক মানের অটোমোবাইল হাব তৈরি হতে পারত, সেখানে এখন শ্মশানের শান্তি বিরাজ করছে। ভুল বার্তা গিয়েছে দেশ এবং দেশের বাইরের শিল্পপতিদের কাছে। আজ যে ক্ষতিপূরণ দাবি করা হচ্ছে টাটার পক্ষ থেকে, এটা আইনগত বিষয়। কী ভাবে রাজ্য সরকার একে ‘ট্যাকল’ করবে, তারা জানে। কারণ, তৃণমূল তখন আবির খেলেছিল। ভিকট্রি সাইন দেখিয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রী তখন সর্ষের বীজ ছড়িয়েছিলেন। কিন্তু মানুষ শেষমেশ চোখে সর্ষেফুল দেখতে পেয়েছেন।’’
সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা অনলাইন
আইএ/ ৩১ অক্টোবর ২০২৩









