তাপদাহের কবলে বাংলাদেশ: ২০২৪-এর গরমে সাড়ে ৫ হাজার অপরিণত শিশুর জন্ম

ঢাকা, ০২ নভেম্বর – বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবের শিকার হয়ে বাংলাদেশে শিশু স্বাস্থ্যে নেমে এসেছে এক চরম বিপর্যয়. আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা জিরো কার্বন অ্যানালিটিকস (জেডসিএ)-এর একটি নতুন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক আতঙ্কজনক তথ্য. সংস্থাটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে দেশজুড়ে চলা তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ৫ হাজার ৫১৫টি বেশি অপরিণত শিশুর (Pre-term birth) জন্ম হয়েছে—যা স্বাভাবিকের চেয়ে ১১.৯ শতাংশ বেশি!
সোমবার (২ নভেম্বর) প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, মানুষের সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেই ওই সময় তাপদাহের সম্ভাবনা প্রায় ৪৫ গুণ বেড়ে গিয়েছিল. সেই চরম গরমে জন্ম নেওয়া প্রতি ১ হাজার শিশুর মধ্যে প্রায় ১৯টি শিশুই অকালেই ভূমিষ্ঠ হতে বাধ্য হয়েছে.
বিভাগভিত্তিক হিসাব: ঢাকা ও চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি, ময়মনসিংহে রেকর্ড ঝুঁকি
গবেষণার তথ্য বলছে, তাপদাহজনিত কারণে নির্ধারিত সময়ের আগে জন্ম নেওয়া মোট শিশুর ৪৭ শতাংশই ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের. তবে তাপমাত্রা ও ঝুঁকির বৃদ্ধির হারে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থায় ছিল ময়মনসিংহ বিভাগ.
ময়মনসিংহ: ২০২৪-এর এপ্রিলে এ বিভাগে স্বাভাবিকের চেয়ে ৩.৫৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি তাপমাত্রা ছিল. ময়মনসিংহে প্রতি হাজার জন্মে অতিরিক্ত ২৪টি অপরিণত শিশুর জন্ম হয়েছে (জাতীয় সর্বোচ্চ).
সিলেট: তাপদাহের প্রভাব তুলনামূলক কম থাকায় সিলেটে এই হার ছিল সবচেয়ে কম—প্রতি হাজারে ১৬টি.
অপরিণত জন্মের গাণিতিক বাস্তবতা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি:
গর্ভধারণের ৩৭ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগে শিশুর জন্ম হলে তাকে ‘অপরিণত জন্ম’ বলা হয়. চিকিৎসকদের মতে, এই ধরনের শিশুরা চরম মৃত্যুঝুঁকিতে থাকে এবং বাঁচলেও তাদের দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক ও স্নায়ুবিক জটিলতা দেখা দেয়.
২০২০ সালের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের সর্বোচ্চ (১৬.২%) অপরিণত শিশুর জন্ম হয়েছিল বাংলাদেশে, যেখানে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় গড় ছিল ১৩.২%.
চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞদের মতামত:
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল কর্মকর্তা ড. উম্মে হাফসা মাজুমদার এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইকবাল কবির জানান—তীব্র গরমে গর্ভবতী নারীদের অতিরিক্ত ঘাম ও পানিশূন্যতা দেখা দেয়. এতে রক্তে ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য নষ্ট হয়, গর্ভফুল বা প্লাসেন্টায় রক্তপ্রবাহ কমে যায় এবং শরীরের ভেতর প্রদাহের সৃষ্টি হয়ে সময়ের আগেই প্রসববেদনা শুরু হয়ে যায়. এর সঙ্গে যুক্ত দারিদ্র্য, রক্তস্বল্পতা ও ঘরের ভেতরের দুর্বল বাতাস চলাচলের মতো সামাজিক কারণগুলো ঝুঁকি দ্বিগুণ করে দেয়.
২০৫০ সালের পূর্বাভাস ও ভবিষ্যতের হুঁশিয়ারি:
জেডসিএ-এর জ্যেষ্ঠ গবেষক জোয়ান বেন্টলি-ম্যাককিউন সতর্ক করেছেন যে, আন্তর্জাতিকভাবে জলবায়ু অভিযোজন ব্যবস্থা আরও কঠোর না করা হলে ২০৪১ থেকে ২০৬০ সালের মধ্যে একটি স্বাভাবিক এপ্রিল মাসেই প্রায় ১,৫০০ অতিরিক্ত অপরিণত শিশুর জন্ম হতে পারে.
বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান নগণ্য হলেও এর সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে দেশের মা ও নবজাতকরা. গবেষক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা অবিলম্বে গর্ভকালীন চিকিৎসা সেবায় ‘তাপঝুঁকি শনাক্তকরণ’ যুক্ত করা, আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা উন্নত করা এবং মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবায় বাজেট ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর জোর দাবি জানিয়েছেন.
এনএন/ ০২ নভেম্বর ২০২৬







