দক্ষিণ এশিয়া

ইরান থেকে জেট ফুয়েল আনতে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে ভুয়া কাগজ ব্যবহার করেছে মিয়ানমার

জেট ফুয়েল আনতে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে ভুয়া কাগজ ব্যবহার করেছে মিয়ানমার

নেপিডো, ২৬ অক্টোবর-মার্কিন সরকারের কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক নজরদারি এড়িয়ে সামরিক জান্তা নিয়ন্ত্রিত মিয়ানমার কীভাবে ইরান থেকে বিমানের জ্বালানি বা জেট ফুয়েল আমদানি করে চলেছে, তা নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স। বিভিন্ন নথি, উপগ্রহের ছবি ও আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণ করে তৈরি এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জালিয়াতির একটি জটিল চিত্র উঠে এসেছে। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ডিজেল আমদানির ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে মিয়ানমার কোটি কোটি ডলারের ইরানি বিমানের জ্বালানি সংগ্রহ করেছে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল, দেশটির ভেতরে নিয়মিত বিমান হামলা চালিয়ে বিদ্রোহীদের দমন এবং সাধারণ বেসামরিক মানুষের ওপর দমন-পীড়ন অব্যাহত রাখা।

প্রতিবেদনে পাওয়া নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা ‘রিফ’ নামের একটি বড় তেলবাহী জাহাজ প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার ব্যারেল জ্বালানি নিয়ে মিয়ানমারের জলসীমায় নোঙর করে। জাহাজটির চালান বৈধ দেখাতে যেসব কাগজপত্র ব্যবহার করা হয়েছিল, সেগুলো ছিল সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও সাজানো। মিয়ানমারভিত্তিক জ্বালানি খাতের মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান ‘ডায়নামিক ওয়েভ’ থাইল্যান্ডের ‘তাওয়ান-ওয়েল ট্রেডিং’-এর সঙ্গে একটি চুক্তি করে। সেখানে দেখানো হয়, মিয়ানমার দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে প্রায় ১ কোটি ৫৮ লাখ মার্কিন ডলার মূল্যের ডিজেল আমদানি করছে।

তবে পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘ভোর্টেক্সা’র তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ওই সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকা ও মিয়ানমারের মধ্যে জ্বালানি তেল বাণিজ্যের এমন কোনো বৈধ লেনদেনের নির্দিষ্ট রেকর্ড ছিল না। অন্যদিকে, ‘সিনম্যাক্স ইন্টেলিজেন্স’-এর উপগ্রহভিত্তিক নজরদারি ও বিশ্লেষণে নিশ্চিত হওয়া যায়, ‘রিফ’ নামের ট্যাঙ্কারটি প্রকৃতপক্ষে ইরানের বন্দর আব্বাস থেকে যাত্রা করে বঙ্গোপসাগর পেরিয়ে মিয়ানমারে প্রবেশ করেছিল। জাহাজটিতে ডিজেলের পরিবর্তে বিমানের জ্বালানি বহন করা হচ্ছিল।

আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে তৈরি হওয়া সংকট কাটাতে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকার নিজেই এই জালিয়াতির পুরো প্রক্রিয়ায় সরাসরি মধ্যস্থতা ও সহযোগিতা করেছে। জাহাজটি বন্দরে পৌঁছানোর কয়েক দিন আগে, ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর মিয়ানমারের বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত একটি গোপন সরকারি চিঠি জারি করা হয়। জান্তা সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন সার্ভার থেকে ফাঁস হওয়া ওই চিঠিটি পরে ‘জাস্টিস ফর মিয়ানমার’ নামের একটি মানবাধিকার সংগঠনের হাতে আসে। চিঠিতে দেখা যায়, দেশটির নিয়ন্ত্রক সংস্থা স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিল, আসা জ্বালানির চালানের কাগজপত্রে ‘জেট ফুয়েল’-এর পরিবর্তে মিথ্যা পরিচয় হিসেবে ‘ডিজেল’ লিখতে হবে। পাশাপাশি, থাইল্যান্ডের প্রতিষ্ঠানটির পাওনা পরিশোধের সুবিধার্থে মিয়ানমারভিত্তিক জাতীয় জ্বালানিসংক্রান্ত যৌথ সংস্থাকে অর্থ ছাড়ের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যাংক অনুমোদনও দেওয়া হয়েছিল।

এই অনৈতিক বাণিজ্যের পেছনে একটি নির্দিষ্ট ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও সমন্বিত কৌশল কাজ করেছে। বিক্রয় চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, জ্বালানি আমদানির পুরো অর্থ থাইল্যান্ডের প্রাচীনতম ব্যাংক ‘সিয়াম কমার্শিয়াল ব্যাংক’ বা এসসিবিতে থাকা ‘তাওয়ান-ওয়েল ট্রেডিং’-এর একটি বিশেষ অ্যাকাউন্টে জমা দেওয়ার কথা ছিল ডায়নামিক ওয়েভের।

এর আগেও আন্তর্জাতিক তদারকি সংস্থা ও জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাইওয়ান ও এসসিবি ব্যাংকের নাম উঠে এসেছিল মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীকে অস্ত্র ও কৌশলগত সরঞ্জাম সরবরাহের অর্থ লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে। যদিও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ অতীতে দাবি করেছে, তারা অর্থ পাচারবিরোধী সব আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলে, তবে এই নির্দিষ্ট জ্বালানি চালান সম্পর্কে নতুন করে প্রশ্ন করা হলে সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষই ইতিবাচক জবাব দেয়নি।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ছিল না। বরং এটি ছিল ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত একটি সুপরিকল্পিত ব্যবস্থার অংশ। এর আগে ২০২৫ সালের মে মাসেও প্রায় ২ লাখ ২ হাজার ব্যারেল জ্বালানি আমদানির জন্য একই ধরনের আরেকটি সাজানো চুক্তি করা হয়েছিল। ওই চুক্তির মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ ডলার।

রয়টার্সের হাতে আসা ওই চুক্তির অর্থ পরিশোধসংক্রান্ত চালানে জ্বালানির রাসায়নিক ঘনত্বের যে সূচক উল্লেখ করা হয়েছিল, তা সাধারণ ডিজেলের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মেলে না। বরং তা বাণিজ্যিক ও সামরিক বিমানে ব্যবহৃত জ্বালানির বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিলে যায়। এ ছাড়া বিশ্ববাজারে ওই সময়ে ডিজেলের নির্ধারিত মূল্যের তুলনায় চালানে উল্লেখ করা দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি ছিল।

আন্তর্জাতিক তথ্য বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, ‘নোবেল’ নামের আরেকটি ট্যাঙ্কার ইরানের একটি বন্দর থেকে জ্বালানি নিয়ে মিয়ানমারের উদ্দেশে যাত্রা করার সময় নিজেদের সংকেতে গন্তব্য হিসেবে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরকে ভুয়া অবস্থান হিসেবে দেখিয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত জাহাজটি ইয়াঙ্গুন বন্দরে গিয়ে পৌঁছায়।

২০২১ সালে অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করার পর থেকেই দেশটি ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের মধ্যে রয়েছে। গত কয়েক বছরে সামরিক জান্তা নিজেদের শাসন টিকিয়ে রাখতে বিদ্রোহীদের দমনের অজুহাতে সাধারণ মানুষের ওপর নির্বিচারে শত শত বিমান হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এসব বিমান হামলায় ব্যবহৃত যুদ্ধবিমানগুলো সচল রাখার অন্যতম প্রধান উপকরণ ছিল তেহরান থেকে গোপনে আসা বিমানের জ্বালানি। সাম্প্রতিক এই অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মিয়ানমারের সামরিক জান্তার বিমান জ্বালানি খাতের ওপর ওয়াশিংটনের কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং ইরানের ওপর ব্যাপক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার ফাঁকফোকর ও ভুয়া বাণিজ্য চুক্তি ব্যবহার করে ইরানি জ্বালানি মিয়ানমারে পৌঁছানো বন্ধ করা যায়নি।

এস এম/ ২৬ অক্টোবর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language