সম্পাদকের পাতা

অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে আরও ক্ষমতা চায় কানাডার দুই প্রদেশ

নজরুল মিন্টো

কানাডায় অভিবাসনের সিদ্ধান্ত নেবে কে? অটোয়ায় বসে কেন্দ্রীয় সরকার, নাকি যে প্রদেশে অভিবাসীরা বসবাস করবেন, সেখানকার সরকার? প্রশ্নটি নতুন নয়। কিন্তু এবার তা নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর চাপ বাড়তে শুরু করেছে। আলবার্টার গণভোটে অভিবাসন ব্যবস্থায় প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতা বাড়ানোর পক্ষে রায় আসার পর একই দাবি তুলেছে সাসকাচুয়ান ও নিউফাউন্ডল্যান্ড অ্যান্ড ল্যাব্রাডর। দুই প্রদেশই চায়, তাদের শ্রমবাজারে কেমন কর্মীর প্রয়োজন, কতজন অভিবাসী আসবেন এবং কাদের স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ দেওয়া হবে, এসব সিদ্ধান্তে প্রাদেশিক সরকারের ভূমিকা আরও বাড়ুক। কানাডার অভিবাসননীতি যখন বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন প্রদেশগুলোর এই দাবি প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সরকারের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

সাসকাচুয়ানের প্রিমিয়ার স্কট মো মনে করেন, কানাডার সব প্রদেশের অভিবাসন চাহিদা এক নয়। যে ধরনের কর্মী সাসকাচুয়ানের প্রয়োজন, অন্টারিও কিংবা আটলান্টিক অঞ্চলের প্রদেশগুলোর প্রয়োজন তার থেকে আলাদা হতে পারে। অথচ অভিবাসীর সংখ্যা ও বিভিন্ন কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় কেন্দ্রীয় পর্যায়ে। এতে স্থানীয় শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে অভিবাসননীতির সামঞ্জস্য বজায় রাখা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।

গত ২২ অক্টোবর সাসকাচুয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্কট মো অভিবাসন ব্যবস্থায় প্রদেশগুলোর অধিকতর অংশগ্রহণের পক্ষে অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। তাঁর মতে, অভিবাসনের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক প্রয়োজনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। নতুন অভিবাসী কানাডায় এসে চাকরি ও পেশাগত উন্নতির সুযোগ পেলে শুধু তাঁর পরিবারই উপকৃত হবে না, স্থানীয় ব্যবসা, সমাজ ও সামগ্রিক অর্থনীতিও লাভবান হবে।

সাসকাচুয়ানের এই দাবি অবশ্য সাম্প্রতিক কোনো উদ্যোগ নয়। ২০২২ সালের জুলাই মাসেই প্রাদেশিক সরকার কেন্দ্রের কাছে একটি বিস্তারিত প্রস্তাব দিয়েছিল। এর নাম ছিল ‘সাসকাচুয়ান ইমিগ্রেশন অ্যাকর্ড’। প্রস্তাবে কুইবেকের মতো অভিবাসন বিষয়ে অধিকতর ক্ষমতা চাওয়া হয়। এর মধ্যে ছিল প্রদেশে আগত অভিবাসীদের মনোনয়নে বাড়তি কর্তৃত্ব, পারিবারিক অভিবাসনের ক্ষেত্রে ভূমিকা, নতুন অভিবাসীদের পুনর্বাসন ও প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় অর্থ বরাদ্দ এবং প্রদেশের জনসংখ্যার অনুপাতে নির্দিষ্টসংখ্যক অভিবাসী মনোনয়নের নিশ্চয়তা।

এখানে কুইবেকের প্রসঙ্গটি গুরুত্বপূর্ণ। কানাডার অন্য প্রদেশগুলোর তুলনায় কুইবেকের অভিবাসন ব্যবস্থায় বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে। ১৯৯১ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির মাধ্যমে প্রদেশটি অর্থনৈতিক অভিবাসী বাছাই ও অভিবাসনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে ব্যাপক কর্তৃত্ব পায়। সাসকাচুয়ান এখন এই বিশেষ ব্যবস্থার আদলে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী অভিবাসননীতি পরিচালনার সুযোগ চাইছে।

অন্যদিকে নিউফাউন্ডল্যান্ড অ্যান্ড ল্যাব্রাডরের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। কানাডার পূর্ব উপকূলের এই প্রদেশে জনসংখ্যার বয়স বৃদ্ধি, বিভিন্ন পেশায় শ্রমিকের ঘাটতি এবং ছোট শহর ও গ্রামীণ জনপদে কর্মী ধরে রাখা দীর্ঘদিনের সমস্যা। ফলে অভিবাসীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কর্মীদের আকৃষ্ট করা এবং তাঁদের স্থায়ীভাবে বসবাসে উৎসাহিত করাও প্রদেশটির গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।

২০২২ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে নিউফাউন্ডল্যান্ড অ্যান্ড ল্যাব্রাডর যে অভিবাসন চুক্তি করে, তাতে অভিবাসী পরিকল্পনা, নির্বাচন ও প্রাদেশিক মনোনয়নসংক্রান্ত দায়িত্ব ভাগাভাগির ব্যবস্থা রয়েছে। তবে প্রদেশটি এখন অভিবাসনসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে আরও কার্যকর ভূমিকা চাইছে। বিশেষ করে স্থানীয় নিয়োগকর্তাদের চাহিদা এবং প্রদেশের জনসংখ্যাগত বাস্তবতার সঙ্গে কেন্দ্রীয় নীতির সমন্বয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

চলতি বছরের ১ এপ্রিল থেকে নিউফাউন্ডল্যান্ড অ্যান্ড ল্যাব্রাডর কানাডার ফেডারেল, প্রাদেশিক ও আঞ্চলিক অভিবাসনমন্ত্রীদের ফোরামের প্রাদেশিক ও আঞ্চলিক পক্ষের সহসভাপতিত্বের দায়িত্বও পালন করছে। তিন বছর মেয়াদি এই দায়িত্বের সুবাদে জাতীয় অভিবাসননীতি নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে প্রদেশটি।

এই বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে আলবার্টার ১৯ অক্টোবরের গণভোট। বিচ্ছিন্নতার প্রশ্নে প্রদেশটির অধিকাংশ ভোটার কানাডার সঙ্গে থাকার পক্ষে অবস্থান নিলেও অভিবাসনসংক্রান্ত কয়েকটি প্রস্তাবে অল্প ব্যবধানে সমর্থন পাওয়া গেছে। বিশেষ করে অভিবাসীর সংখ্যা টেকসই পর্যায়ে নামিয়ে আনা, অর্থনৈতিক অভিবাসনকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব ভোটারদের সমর্থন পেয়েছে। ২২ অক্টোবর পর্যন্ত প্রকাশিত অনানুষ্ঠানিক ফলাফলে অভিবাসনসংক্রান্ত প্রস্তাবগুলোতে প্রায় ৫৪ থেকে ৫৮ শতাংশ ভোটার সমর্থন জানিয়েছেন।

আলবার্টার প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথ এই ফলাফলকে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে নতুন করে আলোচনার ভিত্তি হিসেবে দেখছেন। তিনি জানিয়েছেন, তাঁর সরকার কুইবেকের আদলে অভিবাসনসংক্রান্ত বিশেষ চুক্তির প্রস্তাব তৈরি করছে। স্মিথের যুক্তি, একটি প্রদেশের অর্থনৈতিক চাহিদা, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং সরকারি সেবার সক্ষমতা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট প্রাদেশিক সরকারই সবচেয়ে ভালো ধারণা রাখে। তাই অভিবাসনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তাদের আরও ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন।

তবে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এখনই আলবার্টাকে কুইবেকের সমপর্যায়ের ক্ষমতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেননি। গত ২১ অক্টোবর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এমন চুক্তির সম্ভাবনা একেবারে নাকচও করেননি। একই সঙ্গে মনে করিয়ে দিয়েছেন, কুইবেকের ভাষা ও সংস্কৃতিগত স্বাতন্ত্র্যের কারণে প্রদেশটির সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে।

কার্নির বক্তব্য, তাঁর সরকার ইতিমধ্যে অভিবাসন ব্যবস্থাকে টেকসই পর্যায়ে ফিরিয়ে আনার কাজ শুরু করেছে। প্রদেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং কানাডার অর্থনীতি ও সমাজ কতজন নতুন অভিবাসীকে গ্রহণ করতে পারবে, সেই বাস্তবতা বিবেচনা করেই ভবিষ্যৎ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হবে। তবে অভিবাসীর সংখ্যা টেকসই পর্যায়ে রাখার সিদ্ধান্ত থেকে সরকার সরে আসবে না।

এদিকে কানাডার অভিবাসন ব্যবস্থায় প্রদেশগুলোর ভূমিকা একেবারেই সীমিত নয়। প্রভিন্সিয়াল নমিনি প্রোগ্রামের মাধ্যমে প্রতিটি অংশগ্রহণকারী প্রদেশ নিজস্ব শ্রমবাজারের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ কর্মী ও অন্যান্য যোগ্য ব্যক্তিকে স্থায়ী বসবাসের জন্য মনোনয়ন দিতে পারে। কিন্তু সেই মনোনয়নের সংখ্যা কেন্দ্রীয় সরকারের বরাদ্দের ওপর নির্ভরশীল। প্রাদেশিক মনোনয়ন পেলেও স্থায়ী বসবাসের অনুমতি দেওয়ার চূড়ান্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকে।

কোনো প্রদেশে দক্ষ কর্মীর চাহিদা থাকলেও কেন্দ্রীয় বরাদ্দের সীমাবদ্ধতার কারণে প্রয়োজনীয়সংখ্যক অভিবাসীকে মনোনয়ন দেওয়া সম্ভব হয় না। গত ২৩ জুন অটোয়ায় অনুষ্ঠিত ফেডারেল, প্রাদেশিক ও আঞ্চলিক অভিবাসনমন্ত্রীদের বৈঠকেও বিষয়টি গুরুত্ব পায়। সেখানে প্রাদেশিক প্রতিনিধিরা প্রভিন্সিয়াল নমিনি প্রোগ্রাম এবং আটলান্টিক ইমিগ্রেশন প্রোগ্রামের আওতায় পর্যাপ্ত অভিবাসী গ্রহণের সুযোগ বাড়ানোর দাবি জানান।

প্রদেশগুলোর হাতে অধিকতর ক্ষমতা দেওয়া হলে কানাডায় ইতিমধ্যে অবস্থানরত আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও অস্থায়ী বিদেশি কর্মীদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ ও কৃষিসহ প্রয়োজনীয় খাতে কর্মরত ব্যক্তিরা উপকৃত হতে পারেন। তবে কোন পেশার কর্মীরা অগ্রাধিকার পাবেন, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট প্রদেশের শ্রমবাজারের চাহিদার ওপর।

অভিবাসন নিয়ে এই টানাপোড়েনের মধ্যে বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টিও প্রদেশগুলোর ক্ষমতা বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। দলের নেতা পিয়েরে পলিয়েভ মনে করেন, অভিবাসীর সংখ্যা নির্ধারণে প্রাদেশিক সরকারগুলোর আরও ক্ষমতা থাকা উচিত। কারণ, নতুন অভিবাসীদের স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও অন্যান্য সরকারি সেবার বড় অংশের দায়িত্ব প্রদেশগুলোকেই বহন করতে হয়।

এদিকে ২০২৭ থেকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত কানাডার নতুন অভিবাসন লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণার প্রস্তুতি চলছে। নতুন পরিকল্পনায় প্রদেশগুলোর দাবির কতটা প্রতিফলন ঘটবে, তা নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। তবে প্রদেশগুলোর ক্ষমতা বাড়ানো হলেও অভিবাসীর মোট সংখ্যা বাড়বে কি না, সেটি নির্ভর করবে কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর।

কানাডার অভিবাসননীতি এখন এক জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি। একদিকে আবাসনসংকট, চিকিৎসাসেবার ওপর চাপ এবং কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগের কারণে অভিবাসীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের দাবি উঠছে। অন্যদিকে বিভিন্ন প্রদেশ প্রয়োজনীয় কর্মীর অভাবে সমস্যায় পড়ছে। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারগুলো কীভাবে সমঝোতায় পৌঁছায়, তার ওপর নির্ভর করছে কানাডার আগামী দিনের অভিবাসননীতির অনেক কিছু।

তথ্যসূত্র: The Globe and Mail, Immigration, Refugees and Citizenship Canada (IRCC)

Back to top button
🌐 Read in Your Language