সম্পাদকের পাতা

কানাডার পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহারে বাধ্য হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

নজরুল মিন্টো

কানাডার পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে চেয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর ধারণা ছিল, কানাডীয় পণ্য আমদানির খরচ বাড়িয়ে দিলে মার্কিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের দেশের পণ্য ব্যবহারে উৎসাহিত হবে। কিন্তু সেই নীতির কারণে এখন বিপাকে পড়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ ভোক্তারা। এমনকি ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টির নেতারাও নিজেদের নির্বাচনী এলাকায় শুল্কের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন। এই পরিস্থিতিতে কানাডার নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের ওপর আরোপিত ৫০ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ট্রাম্প। সিদ্ধান্তটি সীমিত হলেও এর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে।

গত ২৩ অক্টোবর শুক্রবার ট্রাম্প একটি নতুন আদেশে স্বাক্ষর করেন। এর ফলে কানাডা থেকে আমদানি করা ৯ শ্রেণির নির্দিষ্ট পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহার করা হচ্ছে। আগামী ৩০ অক্টোবর থেকে সিদ্ধান্তটি কার্যকর হবে। শুল্কমুক্তির আওতায় রয়েছে প্লাইউড, কয়েক ধরনের কাগজ ও কাগজজাত পণ্য, কৃষি ও শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত বিশেষ যন্ত্রপাতি, হিমায়ন সরঞ্জাম, পণ্য পরিবহনের বাক্স ও প্যাকেজিং সামগ্রী এবং তাজা ও শুকনো সামুদ্রিক শৈবাল। কানাডার উৎপাদক ও রপ্তানিকারকদের জন্য এটি স্বস্তির খবর। তবে আশা করা যায়, অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে অন্যান্য কানাডীয় পণ্যের ওপর থেকেও শুল্ক প্রত্যাহার করতে বাধ্য হবে।

কানাডার জাতীয় সংবাদপত্র দ্য গ্লোব অ্যান্ড মেইলের প্রতিবেদনে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মেইন অঙ্গরাজ্যের রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্সের ভূমিকা। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ট্রাম্প প্রশাসনকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে কানাডীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক তাঁর অঙ্গরাজ্যের কৃষি ও ব্যবসা খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। মেইনের ব্লুবেরি, আলু, আপেল ও সামুদ্রিক শৈবাল উৎপাদনকারীরা কানাডা থেকে আমদানি করা বিশেষ যন্ত্রপাতি ও প্যাকেজিং সামগ্রীর ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে ব্লুবেরি সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহৃত নির্দিষ্ট ধরনের বাক্সের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক কৃষকদের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিয়েছিল। অথচ এসব পণ্যের সমমানের মার্কিন বিকল্প সহজে পাওয়া যায় না।

এই বাস্তবতা ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্যনীতির একটি মৌলিক দুর্বলতা সামনে এনেছে। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি বহু দশক ধরে পরস্পরের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত যে একটি দেশের পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা বা বাড়তি শুল্ক আরোপ করলে তার প্রভাব অন্য দেশের উৎপাদনব্যবস্থায়ও পড়ে। দুই দেশের সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ ও প্রস্তুত পণ্য চলাচল করে। কোনো কোনো পণ্যের উৎপাদনপ্রক্রিয়ার বিভিন্ন পর্যায় সম্পন্ন হয় সীমান্তের দুই পাশে। এমন ব্যবস্থায় কানাডীয় পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ মানে শুধু বিদেশি রপ্তানিকারককে ক্ষতিগ্রস্ত করা নয়, মার্কিন উৎপাদনব্যবস্থার ব্যয়ও বাড়িয়ে দেওয়া।

যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা পণ্যের ওপর শুল্ক পরিশোধ করেন মার্কিন আমদানিকারকেরা। অতিরিক্ত এই ব্যয়ের একটি অংশ পণ্যের দাম বাড়িয়ে ক্রেতাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। ফলে কানাডার বিরুদ্ধে কঠোর বাণিজ্যনীতি গ্রহণের অর্থনৈতিক মূল্য দিতে হচ্ছে মার্কিন ব্যবসায়ী ও সাধারণ ভোক্তাদের।

এই শুল্ক প্রত্যাহারের সময়টিও বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তার মাত্র চার দিন আগে নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকর হচ্ছে। নির্বাচনে মেইন অঙ্গরাজ্যের সিনেট আসন ধরে রাখতে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়েছেন রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্স। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ট্রয় জ্যাকসন। কানাডার সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে মেইনের কৃষক ও ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই কলিন্সের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে শুধু বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে রিপাবলিকান পার্টির নির্বাচনী স্বার্থও জড়িত।

ট্রাম্প প্রশাসন কানাডার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান বজায় রাখলেও যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তবর্তী অঙ্গরাজ্যগুলোতে সেই নীতির বিরোধিতা বাড়ছে। মিশিগানের গাড়ি ও যন্ত্রাংশ উৎপাদন, মেইনের কৃষি ও বনজ শিল্পসহ বিভিন্ন অঞ্চলের কর্মসংস্থান কানাডার সঙ্গে বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল। এই পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের পাশাপাশি এসব অঙ্গরাজ্যের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, কৃষক সংগঠন ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা কানাডার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ট্রাম্পের শুল্কনীতির বিরুদ্ধে মার্কিন রাজনীতিতে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তার একটি চিত্র পাওয়া যায় সাম্প্রতিক জনমত জরিপেও। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস ও এনওআরসি সেন্টার ফর পাবলিক অ্যাফেয়ার্স রিসার্চের ১ অক্টোবর প্রকাশিত জরিপে অংশ নেওয়া ৬৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যের জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিগুলো নিয়ন্ত্রণের বাইরের কারণগুলোর চেয়ে বেশি দায়ী। এই ফলাফল থেকে বোঝা যায়, ট্রাম্পের অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ কতটা বিস্তৃত হয়েছে।

কানাডা অবশ্য একতরফাভাবে মার্কিন সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সরকার সেপ্টেম্বর মাসে প্রায় সমপরিমাণ মার্কিন পণ্যের ওপর ১৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পাল্টা শুল্ক আরোপ করে। এর মাধ্যমে অটোয়া জানিয়ে দেয়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী হলেও কানাডার অর্থনৈতিক স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে এমন সিদ্ধান্ত বিনা প্রতিবাদে গ্রহণ করা হবে না।

তবে নতুন সিদ্ধান্তে কানাডার জন্য স্বস্তির পাশাপাশি উদ্বেগের কারণও রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন একদিকে ৯ শ্রেণির পণ্যের ওপর শুল্ক প্রত্যাহার করেছে, অন্যদিকে নতুন কয়েক ধরনের কানাডীয় পণ্যকে ৫০ শতাংশ শুল্কের তালিকায় যুক্ত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে কার্পেট, রং, শ্যাম্পু, কোকো পাউডার, কাঠের কফিন, আইসক্রিমের কাঠি, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, ফ্রিজার, তিরন্দাজির সরঞ্জাম এবং ক্যানো। অর্থাৎ প্রশাসন সামগ্রিক শুল্কনীতি থেকে সরে আসেনি; বরং নির্দিষ্ট মার্কিন শিল্প ও নির্বাচনী এলাকার প্রয়োজন অনুযায়ী পণ্যের তালিকা পরিবর্তন করছে।

কয়েক মাস পরপর শুল্কের তালিকা পরিবর্তনের কারণে কানাডীয় রপ্তানিকারকদের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। আজ কোনো পণ্য শুল্কমুক্ত হলেও পরবর্তী সিদ্ধান্তে সেটি আবার শুল্কের আওতায় আসতে পারে। তাই সাময়িক শুল্ক প্রত্যাহারের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক নিশ্চয়তা প্রয়োজন।

আরেকটি বিষয় কানাডার জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি কানাডীয় বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোম্বার্ডিয়ারের বিরুদ্ধে মার্কিন বাজারে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কানসাসের আইনপ্রণেতাদের আপত্তির পর ট্রাম্প প্রশাসন সেই হুমকি প্রত্যাহার করেছে। বোম্বার্ডিয়ারের উইচিটা কারখানায় প্রায় দেড় হাজার মানুষ কাজ করেন। ফলে কানাডীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে মার্কিন কর্মসংস্থানও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ঘটনাটি প্রমাণ করে, কানাডীয় বিনিয়োগ ও উৎপাদনব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্যও কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সরকারের সামনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে অবশিষ্ট শুল্ক প্রত্যাহারের চেষ্টা চালানো এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে কানাডীয় পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ করা। এতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমবে।

ট্রাম্পের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত সম্পর্কে কানাডার যুক্তরাষ্ট্রবিষয়ক বাণিজ্যমন্ত্রী ডমিনিক লেব্লাঁ জানিয়েছেন, অটোয়া পরিবর্তনগুলো পর্যালোচনা করছে। তিনি একই সঙ্গে কানাডার স্বার্থের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং উভয় দেশের জন্য লাভজনক বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে গঠনমূলক ও আন্তরিকভাবে কাজ করার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন।

সব মিলিয়ে ৫০ শতাংশ শুল্ক আংশিক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত কানাডার জন্য ইতিবাচক অগ্রগতি। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও ব্যবসায়ী সমাজের একটি অংশ উপলব্ধি করতে শুরু করেছে, কানাডার সঙ্গে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখা তাদের নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থেও প্রয়োজন। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে মার্ক কার্নির সরকার দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক নিশ্চয়তা অর্জন করতে পারলে কানাডার অর্থনীতি আরও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছাতে পারে।

তথ্যসূত্র: The Globe and Mail; Reuters, The White House

Back to top button
🌐 Read in Your Language