জাতীয়

সৌদি আরবে ২ বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: জবাবদিহিতা ও বিস্তারিত জানতে সৌদি রাষ্ট্রদূতকে তলব করল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

ঢাকা, ১৮ অক্টোবর – সৌদি আরবে তথাকথিত ‘অনৈতিক’ কাজের অভিযোগে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঘটনায় কূটনৈতিক অঙ্গনে তীব্র তোলপাড় শুরু হয়েছে। আকস্মিক এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর এবং আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের বিষয়টি নিয়ে তৈরি হওয়া ধোঁয়াশার মধ্যে এবার বড় পদক্ষেপ নিল ঢাকা। এ বিষয়ে সরকারের কড়া অবস্থান ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাইতে বাংলাদেশে নিযুক্ত সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত ড. আবদুল্লাহ জাফর বিন আবিয়াহকে তলব করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

রোববার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সৌদি রাষ্ট্রদূতকে ডেকে এনে এই ঘটনার সার্বিক তথ্য, মামলা পরিচালনার ধরণ এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ না থাকার বিষয়টি জানতে চাওয়া হয়। মন্ত্রণালয়ের সচিব (পূর্ব ও পশ্চিম) মো. নজরুল ইসলাম সৌদি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে এই গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকটি পরিচালনা করেন।

কীভাবে ঘটেছিল ঘটনাটি?

সৌদি সরকারি সংবাদ সংস্থা সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ)-র তথ্যানুযায়ী, গত বুধবার দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দুই বাংলাদেশি নাগরিক—নজরুল ইসলাম ও সিথি আখতারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি নিশ্চিত করে।

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গালফ নিউজের খবর অনুযায়ী, মক্কার একটি মসজিদে তথাকথিত অনৈতিক ও অশালীন কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার অভিযোগে তাদের আটক করেছিল স্থানীয় নিরাপত্তা বাহিনী। পরবর্তীতে শরীয়াহ আইনের ‘তাআজির’ (বিচারকের স্বেচ্ছাধীন শাস্তি দেওয়ার এখতিয়ার) ধারায় আদালতের নির্দেশে তাদের এই চূড়ান্ত দণ্ড দেওয়া হয়।

কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও প্রশ্নাতীত বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে চরম অসন্তোষ (গভীর বিশ্লেষণ)

মক্কার মাটিতে সংঘটিত এই ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ও মানবাধিকার সচেতন মহলে তোলপাড় শুরু হয়। অপরাধের মাত্রা বা সত্যতা যা-ই হোক না কেন, যেভাবে গোপনে বিচার ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, তা নিয়ে বেশ কিছু গুরুতর আইনি প্রশ্ন উঠেছে:

কনস্যুলার এক্সেস ও তথ্য না দেওয়া: আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক নিয়ম অনুযায়ী, বিদেশে কোনো নাগরিক বড় অপরাধে অভিযুক্ত বা আটক হলে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসকে অবহিত করা বাধ্যবাধকতা। অথচ এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দূতাবাসকে কেন আগে থেকে কিছু জানানো হয়নি, তা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ: অভিযুক্তরা নিজেদের নির্দোষ প্রমাণের জন্য কোনো আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ পেয়েছিলেন কি না, কিংবা বিচারপ্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ছিল—তা নিয়ে বড় ধরনের ধোঁয়াশা রয়েছে।

বিদেশে প্রবাসীদের সুরক্ষা ও সরকারের আইনি ভূমিকা: খবর পাওয়ার পর বাংলাদেশ সরকারের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ কী ছিল এবং দূতাবাস এ ব্যাপারে কোনো আইনি সহায়তা দেওয়ার সময় পেয়েছিল কিনা, তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনমনে নানা প্রশ্ন উঠছিল। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই সাম্প্রতিক পদক্ষেপ মূলত সেই উত্তর খোঁজারই একটি অংশ।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কড়া বার্তা

সৌদি রাষ্ট্রদূতকে ডেকে পাঠিয়ে বাংলাদেশ সরকার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের যেকোনো আইনি প্রক্রিয়ায় কনস্যুলার সহায়তা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। রাষ্ট্রদূতের কাছে এ সংক্রান্ত মামলা, তদন্ত প্রতিবেদন এবং রায় সংক্রান্ত বিস্তারিত নথি হস্তান্তরের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

আমাদের মতামত: প্রবাসীদের অধিকার ও সরকারের দায়িত্ব

বিদেশের মাটিতে দেশের ভাবমূর্তি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নিজ দেশের নাগরিকের আইনি ও মানবিক অধিকার নিশ্চিত করাও সমভাবে জরুরি। বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে দূতাবাসকে না জানানো আন্তর্জাতিক ভিয়েনা কনভেনশনের চেতনার পরিপন্থী। এ ঘটনায় কঠোর কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই ভবিষ্যতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সুনির্দিষ্ট আইনি সুরক্ষার পথ তৈরি করতে হবে।

এনএন/ ১৮ অক্টোবর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language