জাতীয়

হামের থাবায় দেশে ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭ জনের মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১৩২৭

ঢাকা, ১৪ অক্টোবর – স্বাস্থ্যখাতে টিকাদানের বহুমুখী উদ্যোগের কথা বলা হলেও দেশজুড়ে যেন কিছুতেই থামছে না মরণঘাতী হামের ভয়াল থাবা। বিশেষ করে শিশুদের মাঝে ছড়িয়ে পড়া এই সংক্রামক ব্যাধি প্রতিদিন কেড়ে নিচ্ছে তাজা প্রাণ। একদিকে হাসপাতালগুলোর শিশু ওয়ার্ডে আইসোলেশন বেডের তীব্র সংকট, অন্যদিকে আক্রান্ত স্বজনদের বুকফাটা হাহাকারে ভারী হয়ে উঠেছে চারপাশ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে হাম পরিস্থিতির এক অত্যন্ত আশঙ্কাজনক চিত্র— গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে আরও ৭ জনের, আর নতুন করে হাসপাতালে শয্যাশায়ী হয়েছেন ১ হাজার ৩২৭ জন রোগী!

ইন-ডেপথ অ্যানালিসিস: পরিস্থিতির কতটা ভয়াবহতায় আমরা দাঁড়িয়ে?

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে একটি গভীর সংকট ও উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে ওঠে। গত মার্চ মাস থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাব এখন সারা দেশে এক বিশাল জনস্বাস্থ্য বিপর্যয় তৈরি করেছে:

সহস্রাধিক প্রাণহানি: চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে হাম ও হামের উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,১৭৭ জনে। এর মধ্যে ল্যাব টেস্টে নিশ্চিতভাবে হামে মারা গেছেন ১০৪ জন এবং হামের উপসর্গ বা লক্ষণ নিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ১ হাজার ৭৩ জন।

২৪ ঘণ্টার ভৌগোলিক ও বিভাগওয়ারি চিত্র: গত একদিনে কেবল ঢাকা বিভাগেই হামের উপসর্গ নিয়ে সর্বোচ্চ ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া ময়মনসিংহ ও বরিশাল বিভাগে ১ জন করে মোট ৭ জনের প্রাণহানির তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

সংক্রমণের লাগামহীন জোয়ার: প্রতিদিনের সংক্রমণের হার অত্যন্ত চড়া। গত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ১৯৯ জনের শরীরে নতুন করে হামের উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে। এর ফলে মোট সন্দেহভাজন সংক্রমণের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ২ লাখ ৮ হাজার ৫৭০ জনে। পাশাপাশি, গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছেন ১২৮ জন, যার ফলে মোট নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ৮৪০ জনে।

হাসপাতাল ও সুস্থতার পরিস্থিতি: গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৮৫ হাজার ৩৯০ জন রোগী। এর মধ্যে চিকিৎসাসেবা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ লাখ ৭৭ হাজার ৬৯৮ জন, তবে প্রতিদিন নতুন রোগীর চাপে চিকিৎসকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে: “হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি বায়ুবাহিত ভাইরাসজনিত রোগ। যদি শিশুদের সঠিক সময়ে এবং পূর্ণ মাত্রায় টিকা না দেওয়া হয়, তবে এই রোগ দ্রুত মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে পুষ্টিহীনতা ও নিউমোনিয়ার মতো মারাত্মক জটিলতা যুক্ত হয়ে শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।”

সাধারণ মানুষের জন্য জরুরি সতর্কতা: লক্ষণ দেখলে কী করবেন?

চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, সামান্য অবহেলা বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। তাই নিচের লক্ষণগুলো দেখা মাত্রই সতর্ক হোন:

প্রধান লক্ষণসমূহ: প্রচণ্ড জ্বর, চোখ লাল হওয়া, সর্দি-কাশি এবং সারা গায়ে বা মুখের ভেতর লালচে গুটি/র‍্যাশ (Rashes) ভেসে ওঠা।

আইসোলেশন বা আলাদা রাখা: পরিবারে বা আশপাশে কোনো শিশুর মধ্যে এই লক্ষণ দেখা গেলে তাকে দ্রুত অন্যান্য সুস্থ শিশু ও সদস্য থেকে আলাদা রাখুন।

দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া: ঘরে বসে নিজস্ব টোটকা না করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে বা রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। পর্যাপ্ত তরল খাবার ও পুষ্টি নিশ্চিত করুন।

সরকারের পক্ষ থেকে সম্প্রতি লাখ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার বড় উদ্যোগ নেওয়া হলেও, মাঠপর্যায়ে এখনো বহু শিশু অরক্ষিত রয়ে যাওয়ার কারণেই এই দীর্ঘমেয়াদি প্রাদুর্ভাব কাটছে না। দ্রুত শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠন ও জোরালো টিকাদান অভিযান না চালালে এই পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে।

এনএন/ ১৪ অক্টোবর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language