বলিউড

শূন্য থেকে শিখরে: কোটি টাকার সম্পদ রেখে না ফেরার দেশে নানা পাটেকার

মুম্বাই, ০৮ অক্টোবর – ভারতীয় চলচ্চিত্রের অনন্য ও অসামান্য প্রতিভা নানা পাটেকারের প্রয়াণে বিনোদন জগতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। মুম্বাইয়ের গ্ল্যামার ও চাকচিক্যময় দুনিয়ায় তিনি কখনোই তথাকথিত প্রথাগত সুপুরুষ কিংবা বাণিজ্যিক ‘সুপারস্টার’ হওয়ার পেছনে দৌড়াননি। তীব্র অভিনয় দক্ষতা, ধারালো সংলাপ চয়ন আর নীতিবান ব্যক্তিত্ব দিয়ে নিজেকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের এক অপরাজেয় কিংবদন্তিতে পরিণত করেছিলেন তিনি।

স্বজনপ্রীতি কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠিত পারিবারিক সংযোগ ছাড়াই সম্পূর্ণ নিজের মেধা, অদম্য জেদ ও কঠোর পরিশ্রমকে সম্বল করে শূন্য থেকে শুরু করেছিলেন জীবনের পথচলা। জীবনের শুরুতে চরম দারিদ্র্যের মুখোমুখি হওয়া এই বর্ষীয়ান অভিনেতা নিজের জীবদ্দশায় যে অসীম ভালোবাসা ও আনুমানিক ৬০ থেকে ৮০ কোটি রুপির স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ রেখে গেছেন, তা এক অনন্য জীবনসংগ্রামের গল্প স্মরণ করিয়ে দেয়।

কৈশোরের চরম দারিদ্র্য ও ৮ কিলোমিটার হেঁটে উপার্জন

বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে নানা পাটেকার নিজের শৈশব ও কৈশোরের ভয়াবহ আর্থিক কষ্টের কথা খোলাখুলি তুলে ধরেছিলেন। বাবার ব্যবসার বিপর্যয়ে পুরো পরিবার যখন তীব্র সংকটে পড়ে, তখন মাত্র ১৩ বছর বয়স থেকেই তাকে জীবিকার তাগিদে কাজে নামতে হয়। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় প্রতিদিন স্কুল শেষ করে তিনি চুনাভাট্টি এলাকায় আট কিলোমিটার পথ হেঁটে যেতেন। সেখানে পোস্টার রঙ করার কাজ করে মাসে উপার্জন করতেন মাত্র ৩৫ রুপি, আর বিনিময়ে মিলত দিনে মাত্র একবেলার খাবার। অনাহার ও চরম অনিশ্চয়তার সেই মানসিক চাপ তার চিন্তাভাবনায় সারাজীবনের জন্য গভীর ছাপ ফেলে গিয়েছিল।

রুপালি পর্দায় উত্থান ও বিপুল প্রতিপত্তি

১৯৭৮ সালে ‘গমন’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে অভিনয় জগতে তার অভিষেক ঘটে। সময়ের ব্যবধানে তিনি এমন এক অভিনেতায় পরিণত হন, যাকে ছাড়া ভারতীয় সিনেমা অসম্পূর্ণ। ‘পারিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘অগ্নি সাক্ষী’, ‘আব তাক ছাপ্পান’, ‘নটসম্রাট’ কিংবা ‘ওয়েলকাম’—প্রতিটি চলচ্চিত্রেই তিনি নিজের আলাদা চিহ্ন রেখে গেছেন। ক্যারিয়ারের শেষদিকের বছরগুলোতে তিনি ছবিপ্রতি ৩ কোটি রুপি পর্যন্ত পারিশ্রমিক নিতেন। পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ব্র্যান্ড পার্টনারশিপ থেকেও বিপুল অঙ্কের রাজস্ব অর্জিত হতো।

বিলাসবহুলতার ভিড়ে ১.৫ কামরার ঘর ও অনাড়ম্বর জীবন

কোটি কোটি টাকার সম্পদ তৈরি হলেও নানা পাটেকারের জীবনযাত্রায় কখনোই তার প্রভাব পড়েনি। মুম্বাইয়ের আন্ধেরিতে মাত্র ৭৫০ বর্গফুটের একটি সাধারণ ফ্ল্যাটে বহু বছর কাটানো, গোয়ায় একটি বাড়ি রাখা এবং পুনের খড়কওয়াসলার কাছে ২৭ একরের খামারবাড়িতে নিজে প্রথাগত কৃষিকাজে যুক্ত থাকা ছিল তার সরলতার নিদর্শন। গাড়ির বহরেও তিনি সাধারণ মহিন্দ্রা জিপ, স্করপিও এবং অডি কিউ৭-এর বাইরে অতি-বিলাসিতা পছন্দ করতেন না। এমনকি দেড় কোটি রুপি মূল্যের বিলাসবহুল গাড়ি কেনার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে সেই অর্থ সংকটে পড়া দুস্থ কৃষকদের সহযোগিতায় বণ্টন করে দেওয়ার নজিরও তিনি গড়েছেন।

দারিদ্র্য থেকে সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেও নানা পাটেকার তার শিকড়কে কখনো ভুলেননি। তার রেখে যাওয়া কোটি কোটি টাকার সম্পদ এবং সবচেয়ে মূল্যবান হিসেবে রেখে যাওয়া তার অনবদ্য সৃষ্টিগুলো আজীবন দর্শক ও ভক্তদের হৃদয়ে অমলিন হয়ে থাকবে।

এনএন/ ০৮ অক্টোবর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language