দক্ষিণ এশিয়া

সামরিক সমীকরণ নাকি ক্ষমতার রূপরেখা? পাকিস্তানকে ভাঙার নেপথ্যে সেনাপ্রধান আসিম মুনির

পাকিস্তানে নতুন প্রদেশ তৈরির বিতর্ক ও ইমরান খানকে ঘিরে রাজনৈতিক সংকট
ইমরান খানকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই পাকিস্তানে নতুন প্রদেশ ও প্রশাসনিক ইউনিট তৈরির বিতর্ক তীব্র হয়েছে।

ইসলামাবাদ, ০৬ অক্টোবর – সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের কারাবাস ও তাঁর সমর্থকদের তীব্র রাজপথের আন্দোলনকে ঘিরে যখন কাঁপছে পাকিস্তান, ঠিক তখনই পর্দার আড়ালে আঁকা হচ্ছে ক্ষমতার নতুন চিত্রনাট্য। একদিকে রাজধানী ইসলামাবাদ অবরুদ্ধ করার রাজনৈতিক লড়াই, অন্যদিকে নেপথ্যে চলছে দেশটির দীর্ঘদিনের শাসনকাঠামো ও ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র আমূল বদলে দেওয়ার এক মহা পরিকল্পনা।

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে সবসময় প্রভাব বিস্তার করে আসা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর শীর্ষে থাকা ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবার হাত দিয়েছেন দেশটির প্রথাগত প্রাদেশিক বিন্যাসে। প্রস্তাবিত পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে পাকিস্তানের বর্তমান চারটি প্রদেশ ভেঙে তৈরি হতে পারে একাধিক ছোট ছোট প্রদেশ।

কিন্তু এটি কি কেবলই প্রশাসনিক দক্ষতার সংস্কার, নাকি দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী রাজনৈতিক রাজপরিবারগুলোকে একঘেয়ে ক্ষমতার পথ থেকে সরিয়ে দেওয়ার ছক?

১. মূল নিশানায় পাঞ্জাব ও সিন্ধুর রাজনীতি

পাকিস্তানের রাজনীতি ও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু মূলত চারটি প্রদেশ, যার মধ্যে পাঞ্জাব ও সিন্ধু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ:

পাঞ্জাব: প্রায় ১২ কোটি ৮০ লাখ জনসংখ্যার এই প্রদেশটি দীর্ঘদিন ধরে শরীফ পরিবারের (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ ও মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজ) মূল রাজনৈতিক ভিত্তি।

সিন্ধু: সাবেক প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি ও বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারির ভুট্টো পরিবারের (পিপিপি) প্রধান শক্তিকেন্দ্র।

খাইবার পাখতুনখাওয়া (KPK): বন্দি নেতা ইমরান খানের পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)-এর প্রভাববলয়।

প্রদেশগুলো ছোট ছোট প্রশাসনিক ইউনিটে ভাগ করা হলে প্রভাবশালী পরিবারের একক আঞ্চলিক কর্তৃত্ব ভেঙে পড়বে। স্থানীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ছড়িয়ে পড়লেও কার্যত কেন্দ্রীয় ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ আরও বেশি চলে যাবে সামরিক ও কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের হাতে।

২. সংস্কার বনাম ক্ষমতার খেলা: দুই পক্ষের যুক্তি

প্রশাসন ও সমর্থকদের যুক্তি:

অতিরিক্ত বড় আয়তনের কারণে লাহোর বা করাচির মতো কেন্দ্র থেকে দূরবর্তী এলাকার শাসনকার্য সঠিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয় না।

জমি-জমা সংক্রান্ত বিরোধ মেটাতে কিংবা মৌলিক সরকারি সুবিধা পেতে সাধারণ মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভ্রমণ করতে হয়। প্রদেশ ছোট হলে দুর্নীতি কমবে এবং স্থানীয় সরকার শক্তিশালী হবে।

সমালোচকদের মূল আশঙ্কা:

এটি প্রশাসনিক সহজীকরণের আড়ালে একধরনের ‘পলিটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’।

নতুন প্রদেশ মানেই বিপুল নতুন পদ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও নতুন অবকাঠামোগত ব্যয়। অর্থনৈতিক সংকটে ভোগা পাকিস্তানের জন্য এই সিদ্ধান্ত পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলতে পারে।

৩. ইমরান খান ফ্যাক্টর ও সেনাবাহিনী

সম্প্রতি ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে পিটিআই সমর্থকদের হাজার হাজার মানুষের মিছিল ও রাজধানীমুখী যাত্রা সামলাতে সরকারকে দুই হাজারের বেশি কনটেইনার দিয়ে রাস্তা বন্ধ করতে হয়েছে।

ইমরান খান কারাগারে থাকা সত্ত্বেও তাঁর জনপ্রিয়তা সেনাবাহিনীর জন্য সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ। অন্যদিকে, সংবিধানে বড় পরিবর্তন এনে নতুন ‘ফেডারেল কনস্টিটিউশনাল কোর্ট (FCC)’ গঠন করার পর সেনাপ্রধানের এই নতুন পদক্ষেপকে রাজপথ ও আদালতের রাজনীতি দুটোকেই একযোগে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

৪. আইনি ও সাংবিধানিক জটিলতা

পরিকল্পনাটি মুখে বলা সহজ হলেও বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন:

পাকিস্তানের বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী, কোনো প্রদেশ ভাগ করতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রাদেশিক পরিষদের দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩) সংখ্যাগরিষ্ঠতার অনুমোদন প্রয়োজন।

পাঞ্জাবে ক্ষমতাসীন দল সাময়িক ছাড় দিতে রাজি হলেও সিন্ধু প্রদেশে পিপিপি এটিকে তাদের অস্তিত্বের হুমকি মনে করছে। ইতিমধ্যে সিন্ধু বিধানসভায় প্রদেশ ভাগের বিরুদ্ধে একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবও পাস করা হয়েছে।

অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ গন্তব্য

গত সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানে মূল্যস্ফীতি ১০.৩ শতাংশে পৌঁছেছে। ঋণের বোঝা আর আন্তর্জাতিক চাপ সামলে দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বেসামরিক নেতৃত্ব ব্যর্থ হচ্ছে—সামরিক নেতৃত্বের এমন একটি ধারণাই এই পুনর্গঠন পরিকল্পনার মূল চালিকাশক্তি।

ইমরান খানের রাজনৈতিক প্রভাব এবং সিন্ধুর পিপিপির তীব্র প্রতিরোধের মুখে আসিম মুনিরের এই বড় বাজি শেষ পর্যন্ত সফল হবে, নাকি এটি পাকিস্তানকে নতুন কোনো রাজনৈতিক সংকটের দিকে ঠেলে দেবে—সেটাই এখন দেখার বিষয়।

এনএন/ ০৬ অক্টোবর ২০২৬




FAQ

পাকিস্তানে কি নতুন প্রদেশ তৈরি হয়ে গেছে?

না। ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত নতুন প্রদেশ তৈরির কোনও চূড়ান্ত বাস্তবায়ন হয়নি। বিষয়টি রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিতর্কের পর্যায়ে রয়েছে।

নতুন প্রদেশ তৈরির দাবি কে সামনে এনেছেন?

২০২৬ সালের জুলাইয়ে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি নতুন প্রদেশ বা প্রশাসনিক ইউনিট তৈরির বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে ঐকমত্যের আহ্বান জানান।

সিন্ধু কেন নতুন প্রদেশ তৈরির বিরোধিতা করছে?

সিন্ধু প্রাদেশিক পরিষদ প্রদেশটির বর্তমান ভৌগোলিক অখণ্ডতা বজায় রাখার পক্ষে সর্বসম্মত অবস্থান নিয়েছে।

আসিম মুনির কি পাকিস্তানকে নতুন প্রদেশে ভাগ করার পরিকল্পনা করেছেন?

এমন ব্যক্তিগত পরিকল্পনার কোনও নির্ভরযোগ্য সরকারি ঘোষণা পাওয়া যায়নি। সামরিক প্রতিষ্ঠানের বৃহত্তর প্রশাসনিক পুনর্গঠন-সংক্রান্ত অবস্থান নিয়ে আলোচনা থাকলেও বিষয়টিকে সরাসরি আসিম মুনিরের ব্যক্তিগত পরিকল্পনা বলা উচিত নয়।

নতুন প্রদেশ তৈরি করতে কি সাংবিধানিক অনুমোদন প্রয়োজন?

হ্যাঁ। প্রদেশের সীমানা পরিবর্তন বা নতুন প্রদেশ তৈরির ক্ষেত্রে পাকিস্তানের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট পরিষদগুলিতে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা গুরুত্বপূর্ণ।

Back to top button
🌐 Read in Your Language