মাল্টায় শ্রমশোষণ ও মানবপাচারে বাংলাদেশি ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার, ঠাঁই হলো কারাগারে

ভ্যালেটা, ০৪ অক্টোবর – ইউরোপের দ্বীপ রাষ্ট্র মাল্টায় বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট শ্রমিকদের মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে পাচার, শ্রমশোষণ ও বেতন না দিয়ে আধুনিক দাসত্বের মতো পরিস্থিতিতে বাধ্য করার অভিযোগে এক প্রবাসী বাংলাদেশি ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃত ৪১ বছর বয়সি ওই ব্যবসায়ীর নাম নাজমুল ইস্তিয়াক
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) তাকে মাল্টার আদালতে হাজির করা হলে আদালত জামিন আবেদন নাকচ করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে আসামির স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ফ্রিজ করার পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তায় ‘সুরক্ষা আদেশ’ জারি করা হয়েছে।
‘আমেরিকান ড্রিম’ দেখিয়ে প্রলোভন ও প্রতারণা
আদালতে প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে তুলে ধরা তথ্য অনুযায়ী, পুরো ঘটনাটি ছিল অত্যন্ত সংঘবদ্ধ একটি প্রতারণার জাল।
ভুয়ার প্রতিশ্রুতি: রেস্টুরেন্টে আকর্ষণীয় চাকরির লোভ দেখিয়ে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিকদের মাল্টায় নিয়ে আসা হয়।
বিনা বেতনে খাটানো: ভুক্তভোগীদের চার মাসেরও বেশি সময় ধরে ডিশওয়াশারসহ বিভিন্ন পদে খাটানো হলেও ১ সেন্টও বেতন দেওয়া হয়নি।
জোরপূর্বক স্বাক্ষর গ্রহণ: বেতন চাওয়ায় এক শ্রমিককে জোর করে ৩ মাসের ‘বিনা বেতনে ছুটি’র নথিসহ মোট ৩টি কাগজে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়।
ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অবস্থা: যে রেস্টুরেন্টে কাজের প্রলোভন দেওয়া হয়েছিল, সেটিও দিনের পর দিন বন্ধ রাখা হতো।
আদালতে আসামির বিরুদ্ধে যত গুরুতর অভিযোগ
ম্যাজিস্ট্রেট অ্যাবিগেইল ক্রিতিয়েনের বিচারিক প্যানেলে প্রসিকিউশন নাজমুল ইস্তিয়াকের বিরুদ্ধে একগুচ্ছ গুরুতর অভিযোগ উপস্থাপন করে:
মানবপাচার ও দাসত্ব: সেবা প্রদানের নামে মানুষ পাচার, দাসত্বের মতো পরিস্থিতিতে রাখা এবং জোরপূর্বক শ্রমে বাধ্য করা।
অর্থপাচার ও আত্মসাৎ: ভুক্তভোগীদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে প্রায় ১১,৬৪৬.৮৭ ইউরো আয় এবং প্রতারণার মাধ্যমে অতিরিক্ত ৫,০০০ ইউরো হাতিয়ে নেওয়া।
জালিয়াতি ও জবরদস্তি: সরকারি সংস্থা ‘জবসপ্লাস’ (Jobsplus)-কে অবহিত না করে অবৈধ নিয়োগ, মিথ্যা ঘোষণা ও ভুয়া নথি তৈরি।
নজরদারি ও বাধা: শ্রমিকদের শিক্ষা, অর্থ ও কর্মসংস্থানের স্বাধীনতায় মানসিক চাপ সৃষ্টি করে প্রবেশাধিকার সীমিত করা।
হাসপাতালে নাটকীয়তা ও জামিন নাকচের কারণ
মাল্টার মেলিয়েহায় নিজ রেস্টুরেন্ট থেকে গ্রেপ্তারের সময় নাজমুল ইস্তিয়াক বুকে ব্যথা ও উচ্চ রক্তচাপের অজুহাত দেন। পরবর্তীতে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়।
আদালতে আসামিপক্ষের আইনজীবী ইলেকট্রনিক ট্যাগ ও জামিনের আবেদন করলেও প্রসিকিউশনের তীব্র আপত্তিতে তা খারিজ হয়ে যায়।
প্রসিকিউশনের বক্তব্য: পরিদর্শক জন স্পিতেরি জানান, ভুক্তভোগীরা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছেন এবং বাংলাদেশি কমিউনিটিতে ইস্তিয়াকের ব্যাপক প্রভাব থাকায় তিনি সাক্ষীদের ভয়ভীতি দেখাতে পারেন। তদন্তকারীদের মতে, একজন নিয়োগকর্তা কর্তৃক শ্রমিকের ওপর এমন চরম মাত্রার নিয়ন্ত্রণ তারা আগে কখনো দেখেননি।
আদালতের রায়: সব দিক বিবেচনা করে ম্যাজিস্ট্রেট আসামির জামিন নাকচ করেন এবং ইস্তিয়াককে বিচার বিভাগীয় হেফাজতে (কারাগারে) পাঠানোর নির্দেশ দেন।
এনএন/ ০৪ অক্টোবর ২০২৬


