আইন-আদালত

হাইকোর্টে রিট নিষ্পত্তি বেড়েছে, ব্যক্তিস্বার্থের রিট বন্ধে মামলার চাপ কমবে: অ্যাটর্নি জেনারেল

হাইকোর্ট

ঢাকা, ১৯ সেপ্টেম্বর- সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে চলতি বছরে নতুন রিট মামলা দায়েরের তুলনায় মামলা নিষ্পত্তির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিচারিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা গেলে এবং ব্যক্তিস্বার্থ বা ব্যক্তিগত বিরোধ নিয়ে রিট করা বন্ধ হলে মামলার চাপ আরও অনেক কমে আসবে বলে মনে করেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, বর্তমান প্রধান বিচারপতি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই আদালতে শৃঙ্খলা আনার চেষ্টা করছেন। বিচারিক শৃঙ্খলাুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত প্রথম তিন মাসে হাইকোর্টে নতুন রিট মামলা দায়ের হয় ৪ হাজার ১১২টি। একই সময়ে নিষ্পত্তি হয় ২ হাজার ২১৩ প্রতিষ্ঠা করা গেলে রিট মামলার সংখ্যা কমে আসবে। তাঁর দৃষ্টিতে, আদালতে শৃঙ্খলা থাকলে মানুষ প্রকৃতপক্ষে ন্যায়বিচার পায়।

সুপ্রিম কোর্টের গণসংযোগ কর্মকর্তা শফিকুল ইসলামের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরুতে হাইকোর্টে রিট মামলার সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২৭ হাজার ৯৬০টি। জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত প্রথম তিন মাসে হাইকোর্টে নতুন রিট মামলা দায়ের হয় ৪ হাজার ১১২টি। একই সময়ে নিষ্পত্তি হয় ২ হাজার ২১৩টি রিট মামলা।

এরপর ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত হাইকোর্টে নতুন রিট মামলা দায়ের হয় ৪ হাজার ৭২৯টি। তবে এই তিন মাসে হাইকোর্টে রিট মামলা নিষ্পত্তি হয় ৯ হাজার ৫৯০টি। অর্থাৎ এ সময়ে নতুন রিট মামলা দায়েরের তুলনায় নিষ্পত্তির হার ছিল দ্বিগুণ। জুনের শেষে হাইকোর্টে বিচারাধীন রিট মামলার সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ ২৪ হাজার ৯৯৯টি।

হাইকোর্টে লক্ষাধিক রিট মামলা বিচারাধীন থাকার বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, অনেক ক্ষেত্রে পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশনের (জনস্বার্থ মামলা) নামে ব্যক্তিস্বার্থে রিট মামলা করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্যই থাকে আত্মপ্রচার। অনেকেই রিট মামলা করার সঙ্গে সঙ্গে গণমাধ্যমের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে যান। বিষয়টি অনাকাঙ্ক্ষিত।

তিনি বলেন, আমাদের সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায় হাইকোর্টের জন্য মানা বাধ্যতামূলক। আইনের অনেক বিষয় ইতোমধ্যে আপিল বিভাগ নির্ধারণ করে দিয়েছেন—হাইকোর্ট কোন মামলাগুলো গ্রহণ করতে পারবেন এবং কোনগুলো পারবেন না। যেমন, প্রাইভেট ব্যাংকের বিরুদ্ধে কোনো রিট পিটিশন চলে না। সুপ্রিম কোর্টের অসংখ্য রায়ে বিষয়টি বলা থাকলেও বিভিন্ন সময়ে হাইকোর্টের বিভিন্ন বেঞ্চ প্রাইভেট ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে রিট পিটিশন গ্রহণ করছেন এবং আদেশ দিচ্ছেন। এর ফলে একটি বিচারিক বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে। এই বিশৃঙ্খলার জায়গাটি যদি শৃঙ্খলার মধ্যে আনা যায়, তাহলে রিট মামলার সংখ্যা কমবে।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, তিনি আরেকটি প্রবণতা লক্ষ্য করছেন, যেখানে ব্যক্তিগত বিরোধ নিয়ে রিট করা হচ্ছে। যেমন—জমি দখল, জমির সীমানা, বিল-বাঁওড় নিয়ে সরাসরি হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করা হচ্ছে। অথচ ব্যক্তিগত বিরোধ নিয়ে সরাসরি হাইকোর্টে রিট পিটিশন চলে না। আইন অনুযায়ী, এ ধরনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিকে নিম্ন আদালতে গিয়ে মামলা করে প্রতিকার চাইতে হয়। কিন্তু প্রচলিত এই পদ্ধতি অনেকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি হাইকোর্টে এসে মামলাগুলো করছেন। ফলে হাইকোর্টে রিট মামলার সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্টে পাঁচ ধরনের রিট করার সুযোগ রয়েছে। এগুলো হলো—

রিট অব হেবিয়াস করপাস: কোনো ব্যক্তিকে আইনগত কারণ ছাড়া আটকে রাখা হলে হেবিয়াস করপাস রিট করা যায়। এ ক্ষেত্রে বেআইনিভাবে আটক বা গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে আদালতে হাজির করার জন্য হাইকোর্ট নির্দেশ দিতে পারেন।

রিট অব ম্যান্ডামাস: কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের আইন অনুযায়ী যে কাজ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সেটি না করলে হাইকোর্ট ওই কাজ করার নির্দেশ দিতে পারেন।

রিট অব সার্টিওরারি: বিচারিক আদালত বা ট্রাইব্যুনাল আইনবহির্ভূতভাবে কোনো আদেশ দিলে হাইকোর্ট সেই আদেশ বাতিল করতে পারেন।

রিট অব প্রহিবিশন: বিচারিক আদালত বা ট্রাইব্যুনাল তাদের আইনগত ক্ষমতার বাইরে কোনো মামলা শুনতে শুরু করলে হাইকোর্ট তাদের ওই কার্যক্রম বন্ধ করার নির্দেশ দিতে পারেন।

রিট অব কো-ওয়ারেন্টো: কেউ আইনগত যোগ্যতা ছাড়া কোনো সরকারি পদে থাকলে এই রিটের মাধ্যমে হাইকোর্ট তার ওই পদে থাকার বৈধতা যাচাই করেন।

মহিউদ্দিন ফারুক বনাম বাংলাদেশ মামলার রায়ের মধ্য দিয়েই মূলত বাংলাদেশে জনস্বার্থে রিট মামলার আইনগত ভিত্তি তৈরি হয়। ঐতিহাসিক ওই মামলার রায়ে বলা হয়, জনস্বার্থের জন্য ক্ষতিকর কোনো ঘটনায় সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়েও যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আইনি প্রতিকার চেয়ে হাইকোর্টে জনস্বার্থে রিট মামলা করতে পারেন। এরপর থেকেই দেশে জনস্বার্থে রিট মামলা ভিন্ন মাত্রা পায়।

গত কয়েক দশকে হাইকোর্টে জনস্বার্থে করা বিভিন্ন রিট মামলায় বহুমাত্রিক সাফল্য এসেছে। রিট মামলায় হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের মাধ্যমেই দেশের নদীগুলো ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

এর পাশাপাশি দেশের অনেক নদ-নদী থেকে দখলদার উচ্ছেদ, অবৈধ ইটভাটা বন্ধ এবং পাহাড় কাটা রোধ হয়েছে হাইকোর্টে করা রিট মামলার রায় বা আদেশের মাধ্যমে। এছাড়া জনস্বাস্থ্য ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা, দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারকে মানবিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং নারী-শিশু ও প্রান্তিক মানুষের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষায়ও রিট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অনেক সময় হাইকোর্টে একজন ব্যক্তির করা রিটের রায় বা আদেশের সুফল দেশের হাজারো মানুষ ভোগ করেন।

এস এম/ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

 

Back to top button
🌐 Read in Your Language