
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ঘোষণা দিয়েছেন, যে জিনিস কানাডা নিজে তৈরি করতে পারে, তা বিদেশ থেকে কিনে আনার দিন শেষ। একসময় কথাটি হয়তো রাজনৈতিক স্লোগান বলেই মনে হতো। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্কনীতির লড়াইয়ে কথাটি এখন অটোয়ার নতুন অর্থনৈতিক দর্শনে পরিণত হয়েছে।
সেই দর্শনের নতুন উদাহরণ দেখা গেল অন্টারিওর থান্ডার বে-তে। শহরটির পুরোনো রেলকারখানার দেয়াল কথা বলতে পারলে কানাডার শিল্প-ইতিহাসের অনেক গল্পই হয়তো শোনা যেত। একসময় এখানে তৈরি হয়েছে স্ট্রিটকার, রেলকোচ ও বাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই একই কারখানা থেকে বের হয়েছিল ১,৪০০টির বেশি হকার হারিকেন যুদ্ধবিমান। প্রায় পাঁচ হাজার কানাডিয়ান শ্রমিক সেখানে কাজ করতেন। ব্রিটেনের আকাশ রক্ষার লড়াইয়ে ব্যবহৃত যুদ্ধবিমান তৈরির সেই কারখানাই এত বছর পর আবার হয়ে উঠছে কানাডার শিল্প পুনর্জাগরণের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
বৃহস্পতিবার সেই ঐতিহাসিক কারখানায় দাঁড়িয়েই কার্নি ঘোষণা দেন, VIA Rail-এর নতুন যাত্রীবাহী বহর এবার কানাডাতেই তৈরি হবে। আপাতদৃষ্টিতে এটি রেলব্যবস্থা আধুনিকায়নের একটি বড় উদ্যোগ। কিন্তু কার্নির ঘোষণার তাৎপর্য তার চেয়েও অনেক বেশি। দীর্ঘদিন পর কানাডা আবার নিজের শিল্পক্ষমতার দিকে ফিরে তাকাচ্ছে এবং বলছে, দেশের প্রয়োজন মেটাতে দেশের কারখানাকেই আগে কাজে লাগাতে হবে।
ফেডারেল সরকার VIA Rail-এর নতুন দূরপাল্লার, আঞ্চলিক ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের বহর তৈরি এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের বড় উদ্যোগ নিয়েছে। নকশা ও প্রকৌশলের কাজ হবে কুইবেকের সাঁ-ব্রুনো-দ্য-মন্তারভিলে, মূল কাঠামো তৈরি হবে লা পোকাতিয়েরে এবং চূড়ান্ত সংযোজন হবে থান্ডার বে-তে। প্রকল্পটি অন্টারিও ও কুইবেকে প্রায় ৭০০ সরাসরি কর্মসংস্থান সৃষ্টি বা ধরে রাখবে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরবরাহকারী, প্রকৌশলী, কারিগরি কর্মী ও উৎপাদন খাতের মাধ্যমে এর সুফল আরও বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে পড়বে কানাডার অর্থনীতিতে।
কয়েক বছর আগের ছবিটি ছিল ভিন্ন। VIA Rail-এর কুইবেক সিটি-উইন্ডসর করিডরের নতুন ট্রেনগুলো সরবরাহ করেছিল সিমেন্স কানাডা, কিন্তু সেগুলো তৈরি হয়েছিল ক্যালিফোর্নিয়ার স্যাক্রামেন্টোতে। কানাডিয়ানরা নতুন ট্রেন পেয়েছিলেন, কিন্তু উৎপাদনের সঙ্গে যে কর্মসংস্থান, দক্ষতা, সরবরাহব্যবস্থা ও শিল্প অভিজ্ঞতা তৈরি হয়, তার বড় অংশ কানাডার বাইরে থেকে গিয়েছিল। কার্নি সেই সমীকরণটাই বদলাতে চাইছেন।
থান্ডার বে-র ঘোষণা কোনো বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নয়। গত কয়েক মাসে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো পাশাপাশি রাখলে একটি বড় ছবি ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে ওঠে। কার্নি সরকার এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো দাঁড় করাতে চাইছে, যেখানে কানাডার সরকারি অর্থ কানাডার শিল্প, উদ্ভাবন, শ্রমিক ও সম্পদকে আরও শক্তিশালী করবে। এই নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাম ‘Buy Canadian’।
সরকারের বক্তব্য, কানাডাকে নিজেরই সবচেয়ে ভালো গ্রাহক হতে হবে। কৌশলগত সরকারি ক্রয়ে এখন কানাডিয়ান সরবরাহকারী এবং কানাডায় তৈরি পণ্য ও সেবাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শুধু একটি পণ্য কোথায় তৈরি হয়েছে, সেটিই নয়, কানাডায় কতটা মূল্য সংযোজন হয়েছে, গবেষণা ও উন্নয়নের কতটা দেশে হয়েছে এবং প্রযুক্তি ও মেধাস্বত্বের কতটা কানাডায় থাকছে, সেসবও বিবেচনায় আনা হচ্ছে।
বড় প্রতিরক্ষা ও নির্মাণ প্রকল্পে কানাডিয়ান ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও কাঠ ব্যবহারের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে সরকারি ক্রয় এখন আর শুধু কম দামে পণ্য কেনার প্রক্রিয়া নয়। সেটিকে দেশীয় শিল্পের বাজার তৈরি, কর্মসংস্থান ধরে রাখা এবং নতুন উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলার হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করা হচ্ছে।
এই পরিবর্তনের প্রভাবও ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে। Buy Canadian নীতির পরিধি বাড়ানোর ফলে আগের তুলনায় অনেক বেশি ফেডারেল ক্রয় কানাডিয়ান মূল্য সংযোজনের বিবেচনার আওতায় আসছে। অর্থাৎ করদাতার অর্থ দিয়ে সরকার যখন কিছু কিনবে, তখন সেই ব্যয়ের কতটা কানাডার অর্থনীতির ভেতরে থেকে যাচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। একই চিন্তা দেখা যাচ্ছে গাড়িশিল্পে।
কানাডার অটোমোটিভ খাত প্রায় পাঁচ লাখ কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত এবং দীর্ঘদিন ধরে দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পভিত্তি। ফেব্রুয়ারিতে ঘোষিত নতুন অটোমোটিভ কৌশলে আগামী প্রজন্মের গাড়ি কানাডাতেই তৈরি করার লক্ষ্য সামনে আনা হয়েছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি, অটোমেশন, সংযুক্ত গাড়ি, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে গাড়িশিল্পের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
লক্ষ্য শুধু বর্তমান কারখানাগুলো টিকিয়ে রাখা নয়। কানাডা চায় ভবিষ্যতের গাড়ি তৈরির প্রযুক্তি, গবেষণা, প্রকৌশল দক্ষতা এবং সরবরাহব্যবস্থার বড় অংশও দেশে গড়ে উঠুক। গাড়ির ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও যন্ত্রাংশ থেকে শুরু করে সফটওয়্যার ও প্রযুক্তি পর্যন্ত যত বেশি মূল্য সংযোজন কানাডায় থাকবে, অর্থনীতিতে তার সুফলও তত বেশি থাকবে।
এখানে কানাডার আরেকটি বড় সুবিধা রয়েছে। দেশটির বিভিন্ন মুক্তবাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে ৫১টি দেশের দেড়শ কোটির বেশি ভোক্তার বাজারে বিশেষ প্রবেশাধিকার রয়েছে। ফলে কানাডায় উৎপাদনের লক্ষ্য শুধু দেশের বাজার মেটানো নয়। এখান থেকে বিশ্ববাজারে পৌঁছানোর সুযোগও বিশাল।
আরেকটি বড় পরিবর্তন ঘটছে কানাডার মাটির নিচের সম্পদ ঘিরে। নিকেল, লিথিয়াম, গ্রাফাইট, তামা, জার্মেনিয়াম ও অ্যান্টিমনিসহ আধুনিক শিল্প, ডিজিটাল প্রযুক্তি, ব্যাটারি, প্রতিরক্ষা ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে প্রয়োজনীয় বহু গুরুত্বপূর্ণ খনিজের বিশাল সম্ভার রয়েছে কানাডায়। এখন লক্ষ্য শুধু মাটি থেকে সেই সম্পদ তুলে অন্য কোথাও পাঠিয়ে দেওয়া নয়। খনি থেকে প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ থেকে উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদন পর্যন্ত যতটা সম্ভব কাজ দেশে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এ জন্য খনি অঞ্চলে রাস্তা, বিদ্যুৎ ও পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়ন, নতুন প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র গড়ে তোলা এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ প্রকল্পে সরকারি সহায়তা বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ কানাডা শুধু সম্পদের মালিক হয়ে থাকতে চায় না, সেই সম্পদকে ঘিরে উচ্চমূল্যের শিল্পও নিজের দেশে গড়ে তুলতে চায়।
প্রতিরক্ষা খাতেও শুরু হয়েছে একই ধরনের পরিবর্তন। চলতি বছর কানাডা তার প্রথম পূর্ণাঙ্গ প্রতিরক্ষা শিল্প কৌশল চালু করেছে। এর লক্ষ্য শুধু সামরিক বাহিনীর জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনা নয়। প্রতিরক্ষা খাতে বিপুল সরকারি ক্রয়কে ব্যবহার করে কানাডার নিজস্ব প্রযুক্তি, কারখানা, গবেষণা, দক্ষ কর্মী ও সরবরাহব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা।
পরিকল্পনাটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী। আগামী এক দশকে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কানাডিয়ান প্রতিরক্ষা রপ্তানি ৫০ শতাংশ বাড়ানো এবং ফেডারেল প্রতিরক্ষা ক্রয়ের বড় অংশ কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। জাহাজ নির্মাণ, মহাকাশ, বিমান, যোগাযোগ প্রযুক্তি, স্থলযান ও আধুনিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জামে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও এর অংশ।
এখানেই কার্নির অর্থনৈতিক দর্শনের মূল বৈশিষ্ট্যটি ধরা পড়ে। তিনি শুধু আজকের প্রয়োজন মেটানোর জন্য পণ্য কিনতে চাইছেন না। সরকারি অর্থের প্রতিটি বড় ব্যয়ের সঙ্গে আগামী দিনের কারখানা, দক্ষতা, প্রযুক্তি এবং কর্মসংস্থান কীভাবে তৈরি করা যায়, সেই হিসাবটিও সামনে আনছেন।
একইভাবে একটি খনিজ শুধু মাটি থেকে তুলে বিক্রি করলে তার অর্থনৈতিক সম্ভাবনার একটি অংশই পাওয়া যায়। কিন্তু সেই খনিজ কানাডায় প্রক্রিয়াজাত হয়ে ব্যাটারি, সেমিকন্ডাক্টর, গাড়ি কিংবা উন্নত প্রযুক্তির অংশ হয়ে উঠলে তার সঙ্গে দেশে যুক্ত হয় কারখানা, কর্মসংস্থান, গবেষণা এবং নতুন জ্ঞান।
মার্ক কার্নির নতুন অর্থনৈতিক দর্শনটির শক্তি সম্ভবত সেখানেই। কানাডার হাতে সম্পদ আছে, দক্ষ শ্রমিক আছে, প্রযুক্তি আছে, গবেষণা আছে, বিশ্ববাজারে প্রবেশের সুযোগও আছে। এখন লক্ষ্য, এই শক্তিগুলোকে এক জায়গায় এনে কাজে লাগানো। কার্নির ঘোষণা তাই পরিষ্কার, যে জিনিস কানাডায় তৈরি করা যায়, তা কানাডাতেই তৈরি হবে।
তথ্যসূত্র:
Prime Minister of Canada
CanadaBuys
FAQ
১. VIA Rail-এর নতুন কতগুলি রেলকার তৈরি হবে?
মোট ৩১৩টি নতুন প্রজন্মের যাত্রীবাহী রেলকার তৈরি হবে।
২. VIA Rail-এর নতুন ট্রেন কোথায় তৈরি হবে?
ডিজাইন ও প্রকৌশল হবে কুইবেকের সাঁ-ব্রুনো-দ্য-মন্তারভিলে, মূল কাঠামো তৈরি হবে লা পোকাতিয়েরে এবং চূড়ান্ত সংযোজন হবে অন্টারিওর থান্ডার বে-তে।
৩. এই প্রকল্পে কত টাকা বিনিয়োগ করছে কানাডা?
ফেডারেল সরকার ৪.৭ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার বিনিয়োগ করছে।
৪. নতুন VIA Rail রেলকার কবে পরিষেবায় আসবে?
প্রথম নতুন রেলকার ২০৩১ সালের মধ্যে পরিষেবায় আসার কথা। পুরো ৩১৩-গাড়ির বহর ২০৩৫ সালের মধ্যে পরিষেবায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।
৫. প্রকল্পে কত কর্মসংস্থান হবে?
সরকারের হিসাবে অন্টারিও ও কুইবেকে প্রায় ৭০০টি সরাসরি কর্মসংস্থান তৈরি বা ধরে রাখা যাবে।
৬. ‘Buy Canadian’ নীতির সঙ্গে প্রকল্পটির সম্পর্ক কী?
নীতিটির লক্ষ্য সরকারি ক্রয়ে কানাডিয়ান সংস্থা, কর্মী, পণ্য ও সরবরাহশৃঙ্খলকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া। VIA Rail-এর নতুন রেলকার প্রকল্পে ৯০০-র বেশি কানাডিয়ান সরবরাহকারীর নেটওয়ার্ক ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।







