বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিকের পরও সেই রহস্যময় কান্না: বাবা হোর্হে মেসির প্রয়াণে উন্মোচিত হলো লিওর বুকের গভীর ক্ষত!

বুয়েনোস আইরেস, ৮ আগস্ট – ফুটবল বিশ্বকাপের জমকালো মঞ্চে যেকোনো ফুটবলারের স্বপ্ন থাকে হ্যাটট্রিক করে জয়ের আনন্দে মেতে ওঠার। আলজেরিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জয়ে তিন-তিনটি গোল করে দলকে জেতানোর পর হাসার কথা ছিল লিওনেল মেসির। কিন্তু সেই রাতে গোলের পরপরই মাঠে হঠাৎ হাঁটু গেড়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। সারা বিশ্ব সেদিন মেসির এই কান্নার পেছনে ফুটবলের কোনো আবেগ বা চাপকে দায়ী ভেবেছিল।
তবে সেই রহস্যময় কান্নার আড়ালে যে ছিল একজন সন্তানের বুকে চেপে রাখা পাহাড়সম কষ্ট এবং গুরুতর অসুস্থ বাবাকে হারানোর নিঃশব্দ ভয়—তা আজ সত্য হয়ে সামনে এলো। আর সেই ছায়াসঙ্গী বাবা হোর্হে মেসি (৬৮) শুক্রবার রাতে আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরের একটি মেডিকেল ক্লিনিকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। পরিবারের পক্ষ থেকে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিশ্বকাপ চলাকালেই হোর্হে মেসির শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটতে থাকে। দেশের জার্সির দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে মেসি যখন মাঠে লড়ছিলেন, মন পড়েছিল রোজারিওর হাসপাতালের আইসিইউতে।
আলজেরিয়ার বিপক্ষে ৩ গোল করার পর প্রথম গোলটি উদযাপনের সময়ই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি মেসি। ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরা কান্নার কারণ জানতে চাইলে ভারাক্রান্ত কণ্ঠে মেসি শুধু বলেছিলেন, “এই কান্না ফুটবলের কোনো কারণে নয়। আমি এখন জীবনযাত্রার অত্যন্ত কঠিন ও জটিল কিছু দিনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।”
পরবর্তীতে মেসি পরিবার বিবৃতি দিয়ে হোর্হের চিকিৎসাধীন থাকার তথ্য নিশ্চিত করে। বিশ্বকাপ মিশন শেষ হওয়া মাত্রই কোনো উদযাপন না করে বাবার পাশে থাকতে তাড়াহুড়ো করে রোজারিও ছুটে গিয়েছিলেন সর্বকালের সেরা এই ফুটবলার।
লিওনেল মেসির মহাতারকা হয়ে ওঠার গল্পে হোর্হে মেসি কেবল বাবা ছিলেন না, ছিলেন প্রথম কোচ, পরম বন্ধু ও প্রধান প্রতিনিধি (এজেন্ট)। বার্সেলোনার শৈশব থেকে শুরু করে ইন্টার মায়ামি পর্যন্ত প্রতিটি সিদ্ধান্তের নেপথ্যে ছিলেন হোর্হে।
এক স্মৃতিচারণে মেসি নিজেই বলেছিলেন, “ছোটবেলা থেকেই আমার বাবার অনুমোদন সবসময় প্রয়োজন হতো। প্রতিটা ম্যাচ শেষ হওয়ার পর আমি অধীর আগ্রহে তাকে জিজ্ঞেস করতাম, ‘বাবা, আমি আজ কেমন খেলেছি?'”
মাঠের কোটি কোটি সমর্থকের হাততালি মেসির কাছে যতটা না মূল্যবান ছিল, তারচেয়েও বেশি মূল্যবান ছিল বাবার মুখের একটি প্রশংসার হাসি।
হোর্হে মেসির প্রয়াণে মেসির শৈশবের ক্লাব নিউয়েলস ওল্ড বয়েজ (Newell’s Old Boys) গভীর শোক প্রকাশ করে জানিয়েছে: “লিওনেলের ফুটবলের অবিস্মরণীয় পথচলার প্রতিটি পদক্ষেপে হোর্হের নিরব সঙ্গ, পরম স্নেহ ও পেছন থেকে সঠিক নেতৃত্ব দেওয়া ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর অবদান ফুটবল ইতিহাস চিরকাল স্মরণ রাখবে।”
বিশ্বকাপে বহু রেকর্ড, গোল আর ট্রফি জিতেছেন মেসি। তবে আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে আকাশের দিকে তাকিয়ে চোখের পানি ফেলা সেই মুহূর্তটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম মানবিক অধ্যায় হয়ে থাকবে—যার নেপথ্যে ছিলেন তাঁর সবচেয়ে প্রিয় মানুষ, বাবা হোর্হে মেসি।
এনএন/ ৮ আগস্ট ২০২৬









