সম্পাদকের পাতা

ফ্লোরিডায় বাংলাদেশি নারী ইয়াসমিন আততায়ীর হাতে নিহত

নজরুল মিন্টো

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের ফোর্ট মায়ার্স শহরটি সাধারণত পর্যটকদের কাছে পরিচিত একটি শহর। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল, সকালের একটি মর্মান্তিক ঘটনা শহরটির বাংলাদেশি কমিউনিটিকে গভীর শোকে আচ্ছন্ন করে। ড. মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র বুলেভার্ড ও হাইল্যান্ড অ্যাভিনিউয়ের মোড়ে অবস্থিত শেভরন গ্যাস স্টেশনে কর্মরত ছিলেন বাংলাদেশি নারী ইয়াসমিন। দিনের শুরুতে ঘটে যাওয়া আকস্মিক সহিংসতায় কেবল তাঁর জীবনই নিভে যায়নি, থেমে গেছে প্রায় ১২ বছর ধরে প্রবাসে গড়ে তোলা সংগ্রাম, শ্রম আর পরিবারকেন্দ্রিক স্বপ্নের পথও।

বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় সকাল প্রায় ৭টা ১৪ মিনিটে ঘটনাটি ঘটে। গ্যাস স্টেশনটির কর্মচাঞ্চল্য স্বাভাবিক ছিল। সিসিটিভি ফুটেজ ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার সূত্রপাত হয় স্টেশনের বাইরে পার্কিং লটে। সেখানে ৪০ বছর বয়সী রলবার্ট জোয়াকিনকে একটি গাড়ির উইন্ডশিল্ড (সামনের কাঁচ) ভারী হাতুড়ি দিয়ে ভাঙচুর করতে দেখা যায়।

গাড়ির কাঁচ ভাঙার শব্দ শুনে ইয়াসমিন সম্ভবত পরিস্থিতি দেখতে স্টেশনের ভেতর থেকে বাইরে আসেন। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, তিনি গাড়িটির কাছে পৌঁছানোর পরই জোয়াকিন তাঁর দিকে এগিয়ে আসে এবং মাথায় হাতুড়ি দিয়ে একের পর এক আঘাত করে। আকস্মিক এই হামলায় ইয়াসমিন মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। জরুরি সেবাকর্মীরা দ্রুত সেখানে পৌঁছালেও অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়।

সন্দেহভাজন ব্যক্তি প্রকাশ্যে ইয়াসমিনকে পিটিয়ে হত্যা করে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। দুপুর দেড়টা পর্যন্ত সে পলাতক থাকলেও পরে বিকেলে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। হামলাকারী রলবার্ট জোয়াকিন একজন হাইতিয়ান বংশদ্ভূত ব্যক্তি। জানা গেছে, ঘটনার আগের দিন তিনি স্টোরে থাকা একটি এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলতে গিয়ে ব্যর্থ হন। এ নিয়ে ইয়াসমিনের সঙ্গে তার বাকবিতণ্ডা হয়। ইয়াসমিন তাকে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বললে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে হুমকি দিয়ে চলে যান। পরদিন ভোরে ইয়াসমিন হঠাৎ দেখতে পান, এক ব্যক্তি তাঁর গাড়িতে হাতুড়ি দিয়ে ভাঙচুর করছে। তিনি বাইরে বের হলে ওই ব্যক্তি তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং হাতুড়ি দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করতে থাকে। প্রত্যক্ষদর্শীরা সঙ্গে সঙ্গে 911 নম্বরে ফোন করে পুলিশকে জানায়। ফোর্ট মায়ার্স পুলিশ (FMPD) ঘটনাস্থলে এসে ইয়াসমিনকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জোয়াকিন হত্যার দায় স্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে। পুলিশের রেকর্ড অনুযায়ী, জোয়াকিন ওই এলাকার একজন পরিচিত অপরাধী, যার বিরুদ্ধে অতীতেও সহিংস আচরণের অভিযোগ ছিল।

লি কাউন্টি জেল রেকর্ড অনুযায়ী, জোয়াকিনের বিরুদ্ধে হত্যা-সংক্রান্ত অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই হামলার পেছনে কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিগত শত্রুতা বা বর্ণবাদী উদ্দেশ্য ছিল কি না তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি লক্ষ্যহীন সহিংসতা কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।

নিহত ইয়াসমিনের শেকড় বাংলাদেশের লক্ষ্মীপুর জেলার চন্দ্রগঞ্জ থানার ১৮ নং কুশাখালী ইউনিয়নে। প্রায় ১২ বছর আগে পরিবারের সচ্ছলতার আশায় তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। ফ্লোরিডার এই গ্যাস স্টেশনে তিনি কয়েক বছর ধরে কাজ করছিলেন। তিনি ছিলেন একজন সিঙ্গেল মাদার। তাঁর দুই কন্যার মধ্যে এক মেয়ে ইউনিভার্সিটিতে পড়ে, আরেক মেয়ে সেখানকার আরেকটি দোকানে কাজ করে। তাঁর বড় ভাই মায়ামিতে থাকেন।

ফোর্ট মায়ার্স বাংলাদেশ কমিউনিটির সদস্যরা জানান, ইয়াসমিন ছিলেন অত্যন্ত পরোপকারী এবং শান্ত স্বভাবের। ভাষা ও সংস্কৃতির ভিন্নতা থাকলেও স্থানীয় গ্রাহকদের কাছে তিনি তাঁর অমায়িক ব্যবহার দিয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। ওই গ্যাস স্টেশনের সামনে স্থানীয়দের রাখা ফুল ও মোমবাতিই বলে দিচ্ছে তিনি কতটা প্রিয় ছিলেন।

এই হত্যাকাণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং গ্যাস স্টেশনে কর্মরত বাংলাদেশি অভিবাসীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে একা কাজ করা নারীদের নিরাপত্তা এখন বড় উদ্বেগের বিষয়। স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটি লিডাররা ফোর্ট মায়ার্স মেয়রের কাছে এই এলাকায় টহল বাড়ানোর এবং সিসিটিভি পর্যবেক্ষণে পুলিশের তদারকি জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।

বর্তমানে ইয়াসমিনের মরদেহ স্থানীয় কর্তৃপক্ষের হেফাজতে রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়াগত আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার অপেক্ষা চলছে। ফ্লোরিডার বাংলাদেশি সংগঠনগুলো ও স্থানীয় ইসলামিক সেন্টার তাঁর মরদেহ দ্রুত বাংলাদেশে পাঠানোর বিষয়ে কাজ করছে। তবে এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে ময়নাতদন্ত, তদন্ত এবং আদালত-সংক্রান্ত প্রক্রিয়ার কারণে কিছু সময় লাগতে পারে। এদিকে শুক্রবার জোয়াকিনকে আদালতে তোলা হয়। বিচারক তাকে কারাগারে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।

তথ্যসূত্র:
NBC2 News (এপ্রিল ২, ২০২৬)
ফোর্ট মায়ার্স পুলিশ বিভাগ (FMPD)
স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটি


Back to top button
🌐 Read in Your Language