
সপ্তসিন্ধু পাড়ি দিয়ে আসা এক অভিবাসী কন্যার গল্প যখন ব্রিটেনের একটি প্রাচীন শহরের প্রশাসনিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায় রচনা করে, তখন তা আর কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা হয়ে ওঠে এক অনুপ্রেরণার প্রতীক। যুক্তরাজ্যের পশ্চিম সাসেক্সের সমুদ্রতীরবর্তী শহর ওয়ার্থিং, যার পাথুরে সৈকতে আছড়ে পড়া ঢেউ দীর্ঘদিন ধরে ব্রিটিশ ঐতিহ্যের সাক্ষী। সেই শহরই ২০২২ সালের ২০ মে প্রত্যক্ষ করে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। প্রায় নয় দশকের প্রচলিত ধারা ভেঙে ওয়ার্থিংয়ের ইতিহাসে প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মেয়র হিসেবে শপথ নেন হেনা চৌধুরী। এটি কেবল ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং প্রবাসী প্রজন্মের সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
হেনা চৌধুরী মাত্র ১১ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে ব্রিটেনে পাড়ি জমান। প্রবাসজীবনের শুরুতে ভাষা ও নতুন সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার কঠিন চ্যালেঞ্জ তিনি ধৈর্য, অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে অতিক্রম করেন। বর্তমানে তিনি তিন ভাষায় পারদর্শী একজন কমিউনিটি ইন্টারপ্রেটার এবং মেডিকেল সেক্রেটারি হিসেবে কর্মরত। তার এই ভাষাগত দক্ষতা কেবল পেশাগত পরিসরেই তাকে এগিয়ে নেয়নি, বরং নানা সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে সংযোগ গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু হয়ে উঠেছে। তিনি ব্রিটেনের লেবার পার্টির সঙ্গেও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত। হেনা চৌধুরীর পৈতৃক নিবাস সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার নড়াইল গ্রামে। তার পিতা নুরুল ইসলাম এবং মাতা আঙ্গুরা বেগম।
তার রাজনৈতিক যাত্রার প্রথম বড় সাফল্য আসে ২০১৯ সালে। গাইসফোর্ড ওয়ার্ড থেকে লেবার পার্টির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি অভিজ্ঞ কনজারভেটিভ প্রার্থী ব্রায়ান টার্নারের মুখোমুখি হন। ১২১৩ ভোট পেয়ে তিনি বিজয় অর্জন করেন এবং দীর্ঘদিনের রক্ষণশীল প্রভাবের ধারায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করেন। ফল ঘোষণার পর তার সমর্থকদের উচ্ছ্বাস এবং হেনা চৌধুরীর আবেগঘন প্রতিক্রিয়া প্রবাসী কমিউনিটির মধ্যে আলোচিত হয়ে ওঠে।
রাজনীতির মাঠ হেনা চৌধুরীর জন্য কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। একজন দক্ষিণ এশীয় নারী হিসেবে তাকে নানাবিধ নেতিবাচক মন্তব্যের সম্মুখীন হতে হয়েছে। অনেকেই ভেবেছিলেন, রক্ষণশীল এই জনপদে একজন অভিবাসী নারী কি পারবেন পরিবর্তন আনতে? হেনা চৌধুরী তার কাজের মাধ্যমে সেই উত্তর দিয়েছেন। নির্বাচনের দিন টানা ১৫ ঘণ্টা ভোটকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থেকে তিনি প্রমাণ করেছিলেন তার একনিষ্ঠতা। তিনি চেয়েছিলেন, যে ভোটারই কেন্দ্রে আসুক, সে যেন তার প্রার্থীর মুখটি দেখতে পায়। এই যে দায়বদ্ধতা, এটাই তাকে সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীকে পরিণত করেছে।
রাজনীতির পথ হেনা চৌধুরীর জন্য সহজ ছিল না। একজন দক্ষিণ এশিয় অভিবাসী নারী হিসেবে তাকে নানাবিধ নেতিবাচক মন্তব্যের সম্মুখীন হতে হয়েছে। অনেকেই সন্দিহান ছিলেন, রক্ষণশীল এই জনপদে তিনি কতটা পরিবর্তন আনতে পারবেন। কিন্তু তিনি কাজের মাধ্যমেই সেই সংশয়ের জবাব দিয়েছেন। নির্বাচনের দিন দীর্ঘ সময় ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত থেকে তিনি ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখেন। এই আন্তরিকতা ও দায়বদ্ধতাই তাকে সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীকে পরিণত করেছে।
হেনা চৌধুরীর এই সাফল্যের পেছনে তার পরিবারের অবদান উল্লেখযোগ্য। দীর্ঘ ২৭ বছরের দাম্পত্য জীবনে তার স্বামী মিল্লাদ চৌধুরী কেবল ব্যক্তিগত জীবনে নয়, মেয়র কনসোর্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তাদের তিন সন্তান এবং তার মায়ের অনুপ্রেরণা তাকে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে। তিনি সমাজসেবামূলক কাজেও সক্রিয়, বিশেষ করে ‘ওয়েস্ট সাসেক্স মাইন্ড’, ‘সুপারস্টার আর্টস’ এবং ‘ওয়ার্থিং মেনক্যাপ’-এর মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থেকে মানসিক স্বাস্থ্য ও প্রতিবন্ধী মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছেন।
হেনা চৌধুরীর বিশ্বাস, অভিবাসীরা আলাদা কোনো গোষ্ঠী নয়; তারা বৃহত্তর সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মূলধারার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনই উন্নতির প্রধান পথ। তার মেয়র হওয়া ব্রিটিশ-বাংলাদেশি প্রজন্মের জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা বহন করে। তিনি দেখিয়েছেন, সততা, পরিশ্রম এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকলে নতুন পরিবেশেও নিজস্ব অবস্থান তৈরি করা সম্ভব।
হেনা চৌধুরী আজ কেবল ওয়ার্থিংয়ের একজন মেয়র বা কাউন্সিলর নন; তিনি অভিবাসী সমাজে এক অনুপ্রেরণার নাম। তার যাত্রা স্মরণ করিয়ে দেয়, শেকড়ের সঙ্গে সংযোগ বজায় রেখেও বিশ্বপরিসরে নিজের অবস্থান তৈরি করা সম্ভব। ব্রিটিশ রাজনীতিতে তার এই অগ্রযাত্রা একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জনসেবায় এগিয়ে আসতে উৎসাহিত করবে।
বি. দ্র.: এই প্রতিবেদনের তথ্য স্থানীয় কাউন্সিলের নথি, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং সংশ্লিষ্ট কমিউনিটি সূত্রের ভিত্তিতে সংগৃহীত।









