
বসন্তের হিমেল হাওয়ায় আজ স্কারবরোর আকাশ-বাতাস এক নতুন উন্মাদনায় মুখরিত। ভেসে বেড়াচ্ছে রাজনীতির নতুন সম্ভাবনার সুরও। ২২ মার্চ, রবিবার। আজ আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারনার যাত্রা শুরু করলেন ডলি বেগম। এই দিনটি কানাডার বহুসাংস্কৃতিক রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
কানাডার ফেডারেল রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ একটি আসন স্কারবরো সাউথ-ওয়েস্ট, যেখানে বহুসাংস্কৃতিক ভোটারদের রায় প্রায়ই বৃহত্তর জাতীয় প্রবণতার প্রতিফলন ঘটায়। সেই প্রেক্ষাপটে তিনবারের নির্বাচিত এমপিপি, অন্টারিও এনডিপির সাবেক ডেপুটি লিডার এবং দীর্ঘদিনের কমিউনিটি কর্মী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা এই নেত্রী এবার লিবারেল পার্টির প্রার্থী হয়ে ১৩ এপ্রিলের উপ-নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তাঁর এই যাত্রা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের ধারাবাহিকতা নয়, বরং এটি কানাডার মূলধারার রাজনীতিতে অভিবাসী নেতৃত্বের আরও গভীর অন্তর্ভুক্তির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

বার্চমাউন্ট ও ড্যানফোর্থ রোডের সংযোগস্থলে অবস্থিত তাঁর নির্বাচনী অফিসের উদ্বোধন যেন একটি রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চে পরিণত হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের তালিকাই এই প্রচারণার গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। পাবলিক সেফটি মন্ত্রী গ্যারি আনন্দসাঙ্গারি (এমপি, স্কারবরো-গিল্ডউড-রুজ পার্ক), আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মন্ত্রী মনিন্দর সিধু (এমপি, ব্র্যাম্পটন ইস্ট), পররাষ্ট্রবিষয়ক পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি রব অলিফ্যান্ট (এমপি, ডন ভ্যালি ওয়েস্ট), নারী ও জেন্ডার সমতা বিষয়ক মন্ত্রী রিচি ভালদেজ (এমপি, মিসিসাগা-স্ট্রিটসভিল), করিম বার্ডেসি (এমপি, পার্কডেল-হাই পার্ক), লেসলি চার্চ (এমপি, টরন্টো-সেন্ট পলস), জেনিফার ম্যাককিভি (এমপি, অ্যাজাক্স, পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি, হাউজিং অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার), সিমা আচান (এমপি, ওকভিল ওয়েস্ট), সালমা জাহিদ (এমপি, স্কারবরো সেন্টার), নাথানিয়েল আরস্কিন স্মিথ (এমপি, বিচেস-ইস্ট ইয়র্ক), ক্রিস্টিনা টেসার ডার্কসেন (এমপি, মিল্টন ইস্ট), এবং জেমস ম্যালোনি (এমপি, এটবিকোক-লেকশোর) সহ একঝাঁক প্রভাবশালী নেতার উপস্থিতি স্পষ্ট করে দেয় যে লিবারেল পার্টির উচ্চপর্যায়ে ডলি বেগমের প্রার্থীতাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।

এই সমাবেশের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক ছিল এর বৈচিত্র্য, যা বিভিন্ন কমিউনিটির অংশগ্রহণে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাংলাদেশি কমিউনিটির পাশাপাশি শ্রীলঙ্কান, ভারতীয়, পাকিস্তানি, আফগান, আরব এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর নেতাদের উপস্থিতি দেখিয়েছে যে ডলি বেগমের জনপ্রিয়তা কোনো একক জাতিগোষ্ঠীতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তিনি হয়ে উঠেছেন এক বহুসাংস্কৃতিক বাস্তবতার প্রতিনিধিত্বকারী মুখ।
মৌলভীবাজারের মনু নদের পাড় থেকে উঠে আসা ডলি বেগমের রাজনীতিতে আগমন কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ে সোচ্চার ছিলেন। টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা শেষ করার পর তিনি কমিউনিটির বিভিন্ন সেবামূলক কাজের মাধ্যমে নজর কাড়েন। ২০১৮ সালে যখন তিনি প্রথমবার এমপিপি নির্বাচিত হন, তখন সেটি ছিল ইতিহাস। এরপর টানা তিনবার বিজয় এবং অন্টারিও এনডিপি-র ডেপুটি লিডার হিসেবে তাঁর ভূমিকা তাঁকে প্রজ্ঞা ও সাহসিকতার মূর্ত প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচনী এলাকাটি কানাডার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের এক অসাধারণ উদাহরণ। এখানে ইংরেজি ও ফরাসির পাশাপাশি বাংলা, তামিল, উর্দু, হিন্দি, ম্যান্ডারিন এবং আরবি ভাষাভাষী মানুষের বড় একটি অংশ বসবাস করে। বিশেষ করে বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য এই এলাকাটি একটি হৃদপিণ্ডের মতো। ডলি বেগম এই এলাকার প্রতিটি অলিগলি চেনেন, প্রতিটি মানুষের নাড়ির স্পন্দন বোঝেন, আর সেখানেই নিহিত রয়েছে তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি।
প্রচারণার প্রথম দিন থেকেই ‘ডোর নকিং’ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এটি কানাডার নির্বাচনী সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যেখানে প্রার্থীর বার্তা সরাসরি ভোটারের দরজায় পৌঁছে দেওয়া হয়। স্বেচ্ছাসেবীদের চোখেমুখে যে উদ্দীপনা এবং ভোটারদের প্রতিক্রিয়ায় যে আস্থার ছাপ দেখা গেছে, তা এই প্রচারণার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা সম্পর্কে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে। মাঠপর্যায়ের এই সক্রিয়তা স্পষ্ট করে দেয় যে প্রচারণাটি কৌশলগতভাবে সুসংগঠিত এবং লক্ষ্যভিত্তিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
আসন্ন এই নির্বাচন কেবল একটি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নয়। এটি এমন এক গল্প, যেখানে অভিবাসী সমাজের স্বপ্ন, সংগ্রাম ও সম্ভাবনা একসঙ্গে প্রতিফলিত হচ্ছে। অনুষ্ঠানে উপস্থিতদের আলোচনায় আজ একটিই প্রত্যাশা, একটিই আশাবাদ, আর তা হলো ডলি বেগম বিপুল ভোটে ফেডারেল নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে কানাডার কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন। সেই অর্জন কেবল তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য হিসেবেই বিবেচিত হবে না, বরং কানাডার মাটিতে অভিবাসী সমাজের, বিশেষ করে বাংলাদেশিদের জন্য, একটি ঐতিহাসিক বিজয় হিসেবে চিহ্নিত হবে।









