গণতন্ত্রের নবযাত্রা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির পালাবদল: একটি পর্যালোচনা

ঢাকা, ২৭ ফেব্রুয়ারি – নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় মনে হচ্ছে, গণতন্ত্র পুনরায় কার্যকর হতে শুরু করেছে। দীর্ঘদিনের অবরুদ্ধ শাসনতন্ত্র মুক্তি লাভ করেছে এবং প্রশাসন তার নৈতিক শক্তি ফিরে পেয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিশেষ করে পুলিশ তাদের হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছে। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা বিশেষ করে সরকারি দলের নেতা-কর্মীদের আচরণের মধ্যে দৃশ্যমান। অতীতে নির্বাচনের পর বিজয়ী দলের নেতা-কর্মীদের একাংশের বেপরোয়া কর্মকাণ্ড জনমনে ভীতির সঞ্চার করত, কিন্তু এবার সেই চিত্রের ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে।
জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সেই জনগণের ওপরই যখন বিজয়ী দলের মাঠপর্যায়ের কর্মীরা নির্যাতন চালায়, তখন গণতন্ত্র প্রহসনে রূপ নেয় এবং সুশাসনের পথ রুদ্ধ হয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারি দল যে সংযত আচরণ ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিচ্ছে, তা প্রশংসার দাবি রাখে। গণতন্ত্রের স্বার্থে ভালো কাজের প্রশংসা এবং মন্দ কাজের গঠনমূলক সমালোচনা—উভয়ই জরুরি। সমালোচকদের শত্রু মনে না করে বরং সমালোচনা সহ্য করার শক্তি ও সাহস ক্ষমতাসীনদের থাকতে হবে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গত সাড়ে পাঁচ দশকেও গণতন্ত্র শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারেনি, যার পেছনে দলগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিগত সীমাবদ্ধতা দায়ী। ১৯৭১ সালে শেখ মুজিবুর রহমান সর্বস্তরের বাঙালির নেতা হয়ে উঠলেও পরবর্তী সময়ে দলীয়করণের প্রভাবে জাতীয় ঐক্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় চরমপন্থি কমিউনিস্ট, ন্যাপ ও ছাত্র ইউনিয়ন আলাদাভাবে যুদ্ধ করলেও মুজিব বাহিনী গঠনের মাধ্যমে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে একধরনের শীতল দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে জাতীয় সরকারের দাবি উপেক্ষিত হওয়া এবং ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার অপব্যবহার রাজনীতিতে চরমপন্থা ও বিভেদ ডেকে আনে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান কেবল কোটাবিরোধী আন্দোলনের ফল নয়, বরং এটি ২০১৩ সাল থেকে চলমান গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামেরই চূড়ান্ত পরিণতি। বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নেতৃত্বে দীর্ঘ এই সংগ্রামে ড. কামাল হোসেন, আ স ম আবদুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোট সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। এই আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থী ও জনগণের অংশগ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত, যেখানে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির কোনো দৃশ্যমান ভূমিকা ছিল না।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কালে ড. ইউনূস ও তাঁর প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ছাত্রদের আন্দোলনকে পুঁজি করে সমন্বয়কদের উপদেষ্টা পরিষদে অন্তর্ভুক্ত করা এবং সংবিধান পাশ কাটিয়ে দীর্ঘমেয়াদি এনজিও ধাঁচের সরকার ব্যবস্থা কায়েমের চেষ্টা সমালোচিত হয়েছে। সংবিধান ও সাংবিধানিক রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হয়ে জাতীয় ঐক্যের পরিবর্তে বিভাজন তৈরির অভিযোগও রয়েছে ওই সময়ের সরকারের বিরুদ্ধে। তবে শেষ পর্যন্ত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন জাতিকে একটি শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি থেকে মুক্তি দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার গণতন্ত্রের পথ সুগম করতে কাজ করে যাচ্ছে। তবে গণতন্ত্রবিরোধী শক্তির ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সরকারকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র একে অপরের পরিপূরক—এই সত্যকে ধারণ করে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তিগুলোর মধ্যে ঐক্য বজায় রাখা জরুরি।
এসএএস/ ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬









