সম্পাদকের পাতা

কাশ্মিরি কন্যা শাবানা মাহমুদ কি ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন?

নজরুল মিন্টো

ব্রিটিশ ক্ষমতার কেন্দ্র আজ অদ্ভুতভাবে টালমাটাল। লন্ডনের টেমস নদীর তীরে ওয়েস্টমিনিস্টারের করিডরগুলো আজ শুধু পদশব্দে ভরা নয়, ভরা সন্দেহ, নতুন সমীকরণ, আর আসন্ন বদলের ইঙ্গিতে। ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের ভেতরে যে অস্থিরতা, তা কোনো একদিনের সংবাদচক্র নয়। এটি দীর্ঘদিন ধরে জমতে থাকা প্রশ্নের বিস্ফোরণ, যার কেন্দ্রে উঠে এসেছে একটি নাম, পিটার ম্যান্ডেলসন, এবং সেই নামের ছায়া গিয়ে পড়েছে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বের ওপর।

এই ঝড়ের কবলে পড়ে স্টারমারের অত্যন্ত বিশ্বাসভাজন চিফ অব স্টাফ মরগান ম্যাকসুইনি পদত্যাগ করেছেন। এরপর ডাউনিং স্ট্রিটের যোগাযোগ প্রধান টিম অ্যালানও পদ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। একের পর এক শীর্ষ কর্মকর্তার এই বিদায় স্টারমারের নেতৃত্বকে বাস্তব অর্থেই সংকটের মুখে দাঁড় করিয়েছে। রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে যে প্রধানমন্ত্রী স্টারমারের টিকে থাকার সম্ভাবনা এখন ৫০ শতাংশেরও কম। ঠিক এই সন্ধিক্ষণে লেবার পার্টির ভেতরেই বিকল্প নেতৃত্ব নিয়ে তৎপরতা বেড়েছে, আর সেই তালিকায় সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও শক্তিশালী নাম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন শাবানা মাহমুদ, দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত এক মুসলিম নারী, যিনি অভিবাসী পরিবারের সন্তান হয়ে ব্রিটেনের প্রাতিষ্ঠানিক সিঁড়ি বেয়ে ধাপে ধাপে ক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছেছেন।

ব্রিটিশ রাজনীতিতে বর্তমানে যে কম্পন অনুভূত হচ্ছে তার উৎস আটলান্টিক মহাসাগরের ওপারে যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত এপস্টাইন ফাইল। মার্কিন অর্থদাতা জেফরি এপস্টাইন, যার নাম জড়িয়ে আছে ভয়াবহ যৌন কেলেঙ্কারির সাথে। তার সঙ্গে ব্রিটেনের প্রভাবশালী নেতা পিটার ম্যান্ডেলসনের পুরনো সম্পর্ক এবং ২০০৮ এর আর্থিক অস্থিরতার সময় বাজার সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশের অভিযোগ সামনে আসার পর উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পরিস্থিতি। কিয়ার স্টারমার সরকার ম্যান্ডেলসনকে ওয়াশিংটনে ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন, যা এখন বুমেরাং হয়ে দেখা দিয়েছে। ফাঁস হওয়া ইমেলগুলোতে দেখা যাচ্ছে যে ম্যান্ডেলসন সরকারি অনেক সংবেদনশীল তথ্য এপস্টাইনকে সরবরাহ করেছিলেন।

এই প্রেক্ষাপটে ম্যান্ডেলসনকে ঘিরে নথি ও যোগাযোগ খতিয়ে দেখছে মেট্রোপলিটন পুলিশ, আর সরকারও নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে ক্রমবর্ধমান প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

এমতাবস্থায় শাবানা মাহমুদের উত্থানকে অনেকে দেখছেন সময়ের স্বাভাবিক ফল হিসেবে। লেবার পার্টি ২০২৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর তিনি বিচারমন্ত্রী ও লর্ড চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব নেন, আর ২০২৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বরের রদবদলে তাকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো স্পর্শকাতর দপ্তরের দায়িত্ব দেওয়া হয়। স্টারমারের নেতৃত্ব যখন জনমত, পার্টির অভ্যন্তরীণ ফ্র্যাকচার এবং প্রশাসনিক চাপের মধ্যে নড়বড়ে, তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শাবানা এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন, যেখান থেকে তিনি রাষ্ট্রের সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতাগুলো সরাসরি পরিচালনা করছেন।

শাবানা মাহমুদ কেবল একজন সফল রাজনীতিবিদ নন, তিনি ব্রিটিশ মুসলিম সম্প্রদায়ের এক অনন্য প্রতিনিধি। ১৯৮০ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বার্মিংহামের এক শ্রমিক পরিবারে তার জন্ম। তার বাবা মাহমুদ আহমেদ এবং মা জুবাইদার পারিবারিক শেকড় পাকিস্তানের আজাদ কাশ্মীর অঞ্চলে। শৈশবের একটি অংশ তিনি সৌদি আরবের তাইফ শহরে কাটান, যেখানে তার বাবা প্রকৌশল পেশায় কাজ করতেন। পরে যুক্তরাজ্যে ফিরে এসে তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের লিঙ্কন কলেজ থেকে আইনে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

রাজনীতিতে আসার আগে তিনি একজন তুখোড় ব্যারিস্টার হিসেবে সুনাম কুড়িয়েছেন। ২০১০ সালে বার্মিংহাম লেডিউড আসন থেকে তিনি যখন প্রথমবার পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হন, তখন তিনি নতুন এক রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করেন। রুশনারা আলী এবং ইয়াসমিন কোরেশীর সঙ্গে তিনিও ছিলেন যুক্তরাজ্যের প্রথম দফার নারী মুসলিম এমপিদের অন্যতম। গত দেড় দশকে তিনি শ্যাডো জাস্টিস সেক্রেটারি এবং শ্যাডো এডুকেশন সেক্রেটারির মতো দায়িত্ব পালন করে নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন।

শাবানা মাহমুদের রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো অভিবাসন বিষয়ে তার কঠোর অবস্থান। তিনি বারবার বলেছেন, যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাস কোনো জন্মগত অধিকার নয়, বরং নিয়ম, যোগ্যতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ একটি সুযোগ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তিনি এমন কিছু নীতিগত পরিবর্তনের পরিকল্পনা সামনে এনেছেন, যার মধ্যে স্থায়ী বসবাসের আবেদনযোগ্যতার সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে দশ বছর করার প্রস্তাবও আলোচনায় এসেছে। এই ধরনের প্রস্তাব নিয়ে স্বাস্থ্যখাত এবং অভিবাসী পরিবারগুলোর মধ্যে উদ্বেগের কথাও বিভিন্ন জরিপ ও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

এই সিদ্ধান্ত দলের ভেতরে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। লেবার পার্টির একাংশ মনে করে, এমন নিয়ম পরিবর্তন ব্রিটেনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে পারে এবং স্বাস্থ্য খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কর্মী সংকট বাড়াতে পারে। তবে শাবানা মাহমুদ বলেছেন, ডানপন্থী জনমত এবং রিফর্ম ইউকের মতো শক্তিগুলোর চাপ মোকাবিলা করে সাধারণ ভোটারদের আস্থা ধরে রাখতে হলে অভিবাসন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরানোর বার্তা দেওয়া জরুরি। তিনি নিজেকে অভিবাসী পরিবারের সন্তান হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ভেঙে পড়া অভিবাসন কাঠামোকে কার্যকর করতে গিয়ে তাকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।

শাবানা মাহমুদ বর্তমান দৌড়ে এগিয়ে থাকলেও তার পথ নিষ্কণ্টক নয়। লেবার পার্টির ভেতরে আরও কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা এই পদের দিকে নজর রাখছেন। ১. অ্যাঞ্জেলা রেনার: তিনি লেবার পার্টির বামপন্থী অংশের প্রিয় মুখ। যদিও ট্যাক্স বিতর্কে তাকে আগে পদত্যাগ করতে হয়েছিল, কিন্তু তৃণমূল কর্মীদের কাছে তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। ২. ওয়েস স্ট্রিটিং: স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি একজন দক্ষ বক্তা। তবে পিটার ম্যান্ডেলসনের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা এই মুহূর্তে তার জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ৩. এড মিলিব্যান্ড: দলের সাবেক প্রধান হিসেবে তার অভিজ্ঞতা অনেক বেশি। কিন্তু ২০১৫ সালের নির্বাচনে তার পরাজয়ের গ্লানি আজও অনেকে ভুলতে পারেননি। ৪. অ্যান্ডি বার্নহাম: ম্যানচেস্টারের মেয়র হিসেবে তিনি দারুণ সফল। কিন্তু পার্লামেন্টে আসন না থাকায় এই মুহূর্তে তার প্রধানমন্ত্রী হওয়া প্রায় অসম্ভব।

শাবানা মাহমুদের উত্থান কেবল ব্রিটিশ রাজনীতির একটি ক্ষমতার পালাবদল নয়, এটি একটি বড় ধরনের সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত। দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত এক মুসলিম নারী, যিনি বার্মিংহামের শ্রমজীবী বাস্তবতা থেকে অক্সফোর্ডের প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা পর্যন্ত নিজের সক্ষমতা দিয়ে পথ তৈরি করেছেন, এবং পরে সরকারের সবচেয়ে স্পর্শকাতর দপ্তরের দায়িত্ব পেয়েছেন, তার হাতে দেশের ভার যাওয়ার সম্ভাবনা ব্রিটেনের পরিচয় রাজনীতিতে নতুন এক অধ্যায় খুলে দিতে পারে।

তবে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের চাবি পাওয়া সহজ হবে না। দলের ভেতরের বিভেদ সামলানো, ভেটিং ও নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রশ্নে আস্থা ফেরানো, এবং অভিবাসন নীতিকে ঘিরে তৈরি হওয়া অসন্তোষ মোকাবিলা করা শাবানা মাহমুদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। স্টারমার যদি শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে না পারেন, তবে লেবার পার্টির ভেতরে এমন নেতৃত্বের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে যিনি একই সঙ্গে কঠোর রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব সামলাতে পারবেন। ওয়েস্টমিনিস্টারে এখন প্রতিটি আলোচনার কেন্দ্রে একটি প্রশ্নই ঘুরছে, শাবানা মাহমুদ কি পারবেন ব্রিটেনের প্রথম মুসলিম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ডাউনিং স্ট্রিটে প্রবেশ করতে? উত্তরটি হয়তো খুব শীঘ্রই ইতিহাসের পাতায় লেখা হবে।

তথ্যসূত্র:

AP News (১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)
The Guardian (১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)
Sky News (১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)
Financial Times (১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)


Back to top button
🌐 Read in Your Language