সম্পাদকের পাতা

নিউ ইয়র্ক সিটি মেয়র নির্বাচন ২০২৫: ব্যতিক্রমী ভোটপদ্ধতি ও শেষ সপ্তাহের সমীকরণ

নজরুল মিন্টো

যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ শহরে মেয়র নির্বাচন হয় একক ভোটে। একজন ভোটার একজন প্রার্থীকে বেছে নেন, এবং সর্বাধিক ভোট পাওয়া প্রার্থীই নির্বাচিত হন। কিন্তু নিউ ইয়র্ক সিটি এই প্রচলন থেকে ভিন্ন। এখানে চালু হয়েছে র‍্যাঙ্কড চয়েস ভোটিং বা সংক্ষেপে RCV পদ্ধতি। এতে একজন ভোটার সর্বোচ্চ পাঁচজন প্রার্থীকে পছন্দের ক্রমে র‍্যাঙ্ক করতে পারেন। প্রথম গণনায় যদি কেউ ৫০ শতাংশের বেশি ভোট না পান, তবে সর্বনিম্ন ভোট পাওয়া প্রার্থী বাদ পড়ে এবং তাঁর ভোট দ্বিতীয় বা তৃতীয় পছন্দ অনুযায়ী বাকি প্রার্থীদের মধ্যে বণ্টিত হয়। এই প্রক্রিয়া চলতে থাকে যতক্ষণ না কোনো প্রার্থী ৫০ শতাংশের সীমা অতিক্রম করেন।

এই পদ্ধতি ২০১৯ সালের গণভোটে অনুমোদনের পর ২০২১ সাল থেকে কার্যকর হয়। ফলে প্রার্থীদের জন্য শুধু নিজস্ব ভোটব্যাংকই যথেষ্ট নয়, অন্য প্রার্থীর সমর্থকদের দ্বিতীয় বা তৃতীয় পছন্দ হওয়াটাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বৈশিষ্ট্যের কারণে নিউ ইয়র্কের নির্বাচন অন্যান্য শহরের তুলনায় অনেক বেশি অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। কারণ প্রার্থীরা এখন প্রতিপক্ষের ভোটারদের কাছেও ইতিবাচকভাবে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন।

একক নজরে দেখে নিন প্রার্থীরা কে কোথায় দাঁড়িয়ে

জোহরান মামদানি (ডেমোক্র্যাট):
তরুণ নেতা জোহরান মামদানি মাত্র ৩৪ বছর বয়সে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মনোনয়ন পেয়েছেন। উগান্ডা-ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই প্রার্থী মুসলিম পিতা ও হিন্দু মাতার সন্তান। তিনি নিজেকে ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্ট ধারার রাজনীতিক হিসেবে উপস্থাপন করেন। তাঁর প্রচারের মূল ইস্যু হলো বাসস্থান সাশ্রয়, রেন্ট ফ্রিজ, গণপরিবহন, অভিবাসী অধিকার ও শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য মজুরি। গত জুনের প্রাইমারিতে সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুওমোকে হারিয়ে তিনি রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোড়ন তোলেন।

অ্যান্ড্রু কুওমো (স্বতন্ত্র):
নিউ ইয়র্কের সাবেক গভর্নর কুওমো ২০১১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন। যৌন হয়রানির অভিযোগে পদত্যাগের পর এবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন। অভিজ্ঞতা ও প্রশাসনিক দক্ষতা তাঁর বড় সম্পদ হলেও অতীত বিতর্ক তাঁর প্রচারণাকে দুর্বল করছে। শেষ সপ্তাহে তিনি নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার ইস্যুতে জোর দিচ্ছেন এবং সতর্ক করছেন যে, “মামদানি জিতলে ট্রাম্প শহর দখল করবে।” কুওমোর এই ভয়ভিত্তিক প্রচার ইতোমধ্যেই বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

কার্টিস স্লিওয়া (রিপাবলিকান):
গার্ডিয়ান এঞ্জেলস সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা এই প্রার্থী আইন-শৃঙ্খলা, গৃহহীনতা ও অপরাধ দমনের ইস্যুতে জোর দিচ্ছেন। ডেমোক্র্যাট অধ্যুষিত শহরে তাঁর জয়ের সম্ভাবনা সীমিত হলেও RCV পদ্ধতিতে তাঁর সমর্থকদের দ্বিতীয় ও তৃতীয় পছন্দ ভোট কোথায় যাবে, তা ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রভাবশালী সমর্থন
শেষ সপ্তাহে বড় আলোচনার বিষয় ছিল যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের হাউস মাইনরিটি লিডার হাকিম জেফ্রিজের প্রকাশ্য সমর্থন। এর আগে নিউ ইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোকুল, কংগ্রেসওমেন আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কোর্তেজ এবং ওয়ার্কিং ফ্যামিলিজ পার্টি মামদানির পাশে দাঁড়িয়েছে। এখনো সমর্থন ঘোষণা করেননি সিনেট মাইনরিটি লিডার চাক শুমার, যদিও সূত্রগুলো বলছে তাঁর সমর্থনও শিগগিরই আসতে পারে।

আগাম ভোট: রেকর্ড অংশগ্রহণ
নিউ ইয়র্ক বোর্ড অব ইলেকশনস জানিয়েছে, প্রথম দিনেই ৭৯ হাজার ৪০৯ জন ভোট দিয়েছেন, যা ২০২১ সালের তুলনায় প্রায় পাঁচগুণ বেশি। বরোভিত্তিক সংখ্যায় ম্যানহাটন শীর্ষে, এরপর ব্রুকলিন, কুইন্স, ব্রঙ্কস ও স্ট্যাটেন আইল্যান্ড। দুই দিনের শেষে মোট ভোটার উপস্থিতি ১ লাখ ৬৪ হাজারের বেশি। এই সংখ্যা প্রমাণ করছে যে ভোটারদের আগ্রহ এবার আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। তরুণ, সংখ্যালঘু এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত ভোটাররা বিশেষভাবে সক্রিয়, যারা সাধারণত পরিবর্তনমুখী প্রার্থীর প্রতি ইতিবাচক মনোভাব দেখান।

সর্বশেষ জরিপ ও ভোটার প্রবণতা
কুইনিপিয়াক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, মামদানি ৪৩ শতাংশ সমর্থন পেয়ে এগিয়ে আছেন। কুওমো পেয়েছেন ৩৩ শতাংশ এবং স্লিওয়া প্রায় ১৪ শতাংশ। বাকিরা এখনো সিদ্ধান্তহীন। জরিপকারীদের মতে, এই ভোটারদের সিদ্ধান্ত এবং দ্বিতীয়-তৃতীয় পছন্দের বণ্টনই চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ করবে।

অন্যদিকে কুওমো শিবির দাবি করছে, শেষ মুহূর্তে নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার ইস্যু তাঁদের পক্ষে পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে। রিপাবলিকান-ঘেঁষা গণমাধ্যমগুলো এই ভয়ভিত্তিক বার্তাকে জোরালোভাবে প্রচার করছে। নিউ ইয়র্ক পোস্টের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২৬ শতাংশেরও বেশি নিউ ইয়র্কার বলেছেন, যদি মামদানি জিতে যান, তাঁরা শহর ছাড়ার কথা ভাববেন। মামদানি শিবির এই ধরনের সংবাদকে বিভ্রান্তিমূলক আখ্যা দিয়ে বলছে, “এটি পরিবর্তন-ভীত রাজনীতির পুরনো কৌশল।”

মূল ইস্যু ও বিতর্ক
ভাড়া ও বাসস্থান এখনো নির্বাচনের প্রধান ইস্যু। কুওমো অভিযোগ করছেন, মামদানির “চরম বাম” নীতি শহরের ভাড়া নিয়ন্ত্রণে বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে। মামদানি পাল্টা বলছেন, রেন্ট লবির প্রভাবেই শহরের বাসিন্দারা ন্যায্য বাসস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। তিনি রেন্ট ফ্রিজ ও বাসস্থান স্থিতিশীলতা কার্যকর করার অঙ্গীকার করেছেন।

পরিচয় ও ধর্মীয় রাজনীতিও এই নির্বাচনে প্রভাব ফেলছে। রিপাবলিকান প্রচারণায় মাঝে মাঝে ইসলামোফোবিক মন্তব্য শোনা যাচ্ছে, যা নিয়ে ডেমোক্র্যাট শিবির বলছে এটি মূল সামাজিক ইস্যুগুলো থেকে দৃষ্টি সরানোর কৌশল। মামদানি বরাবরই বলেছেন, তাঁর জন্য শহরের নাগরিকত্বই মুখ্য, ধর্ম বা বর্ণ নয়।

নির্বাচন পদ্ধতির কৌশল ও সম্ভাব্য ফল
RCV পদ্ধতিতে প্রথম পছন্দে কেউ ৫০ শতাংশ না পেলে পরবর্তী পছন্দের ভোটগুলো ক্রমানুসারে যোগ হয়। ফলে দ্বিতীয় ও তৃতীয় পছন্দের ভোটই অনেক সময় জয়-পরাজয়ের ব্যবধান গড়ে দেয়। স্লিওয়ার ভোটারদের দ্বিতীয় পছন্দ হিসেবে কুওমো কিছু বাড়তি সুবিধা পেতে পারেন, তবে কেন্দ্র-বাম ভোটারদের দ্বিতীয় পছন্দ হিসেবে মামদানির শক্তিও কম নয়। এই হিসাবেই নিউ ইয়র্কের র‍্যাঙ্কড চয়েস ভোটিং এখন এক কৌশলগত প্রতিযোগিতার মঞ্চে পরিণত হয়েছে।

প্রার্থীদের শেষ বার্তা
মামদানি তাঁর সমর্থকদের উদ্দেশে বলেছেন, “আমি এমন এক নিউ ইয়র্ক গড়তে চাই যেখানে প্রতিটি মানুষ বাসস্থান, কাজ ও মর্যাদার নিশ্চয়তা পাবে।” মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স তাঁর সমর্থনে মন্তব্য করেছেন, “মামদানি নিউ ইয়র্কের পরিশ্রমী মানুষের বিবেকের প্রতিনিধিত্ব করছেন।”

কুওমো তাঁর শেষ প্রচারে বলছেন, “এই শহরের নেতৃত্ব অভিজ্ঞ হাতে থাকতে হবে।” একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করছেন, “যদি শহর চরমপন্থার হাতে যায়, ট্রাম্পপন্থীরা সেটি দখল করবে।” অন্যদিকে স্লিওয়া আইনশৃঙ্খলা ও অপরাধ দমনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে রক্ষণশীল ভোটারদের দ্বিতীয় পছন্দ হিসেবে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন।

উপসংহার: পরিবর্তনের সম্ভাবনা
২০২৫ সালের নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচন কেবল নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রতিযোগিতা নয়, বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনর্গঠনের একটি পরীক্ষা। যদি জোহরান মামদানি বিজয়ী হন, তবে শহর পাবে ইতিহাসে প্রথম মুসলিম ও দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত নগরনেতাকে। তাঁর বিজয় হবে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সামাজিক ন্যায়ের এক প্রতীকী অধ্যায়। অন্যদিকে যদি কুওমো শেষ রাউন্ডে পাল্টে দেন, তবে সেটিও হবে র‍্যাঙ্কড চয়েস ভোটিং ব্যবস্থার এক শিক্ষণীয় উদাহরণ।

যেভাবেই শেষ হোক, ৪ নভেম্বরের রাত নিউ ইয়র্কের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।


Back to top button
🌐 Read in Your Language