
ঢাকা, ৪ জানুয়ারি – দীর্ঘদিন ধরে দেশে ডলারের সংকট চলছে। এ সংকট মোকাবিলায় যথাসময়ে রপ্তানি আয় দেশে আনার ওপর জোর দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর অংশ হিসেবে চলতি অর্থবছরের রপ্তানির তথ্য চেয়ে ব্যাংকগুলোতে চিঠি পাঠানো হয়েছে। জুলাই থেকে নভেম্বর এ ৫ মাসের রপ্তানি সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য তিন দিনের মধ্যে পাঠাতে বলা হয়েছে চিঠিতে।
এর আগে গত আগস্টে ব্যাংকগুলোতে চিঠি পাঠিয়ে অপ্রত্যাবাসিত রপ্তানি আয়ের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, সঠিক সময়ে রপ্তানি আয় দেশে আনা গেলে বাজারে বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য বাড়বে। এ কারণে ব্যাংকগুলোতে তদারকি বাড়িয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, দেশে ডলার সংকট প্রকট হওয়ার পর গভর্নরের নির্দেশ আমদানির পাশাপাশি রপ্তানির তথ্যও নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। কী পরিমাণ রপ্তানি হয়েছে এবং এর বিপরীতে কী পরিমাণ অপ্রত্যাবাসিত থাকছে সেটা জানতেই এ চিঠি পাঠানো হয়েছে।
ব্যাংকগুলোর তথ্য পাঠানোর পরই প্রকৃত অবস্থা জানা সম্ভব হবে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭৩১ কোটি ১২ লাখ ডলার। এটি গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১০ দশমিক ৫৮ শতাংশ বেশি। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের চিঠিতে ৫ মাসের তথ্য চাওয়া হয়েছে। এজন্য নির্দিষ্ট ছকও সংযুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। এ পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) পণ্য রপ্তানি হয়েছে ২ হাজার ১৯৪ কোটি ৬০ লাখ ডলার। এটি গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১০ দশমিক ৮৯ শতাংশ বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে রপ্তানির তথ্যও নিয়মিত তদারকি করা হয়ে থাকে। এর অংশ হিসেবে এ চিঠি পাঠানো হয়ে থাকতে পারে। এ ছাড়া বেশ কিছুদিন ধরে আমদানির তথ্যও নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, বন্দর থেকে পণ্য রপ্তানির পরপরই তা বাংলাদেশ ব্যাংকের ড্যাশ বোর্ডে রিপোর্ট করতে হয়। রিপোর্টিংয়ের ১২০ দিনের মধ্যে রপ্তানি মূল্য দেশে আনার নিয়ম রয়েছে। এ হিসাবে গত জুলাই ও আগস্টের রপ্তানি আয় স্বাভাবিক নিয়মে ডিসেম্বরের মধ্যেই দেশে আসার কথা। এ দুই মাসে পণ্য রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৮৫৯ কোটি ডলার। অন্যদিকে, রপ্তানি আয় দেশে আসার ৩০ দিনের মধ্যে রপ্তানি বিল নগদায়নের নির্দেশনা রয়েছে। বর্তমান রপ্তানি বিল নগদায়নে প্রতি ডলারে ১০১ টাকা পাচ্ছেন রপ্তানিকারকরা।
নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য রপ্তানির বিপরীতে দেশে যে পরিমাণ অর্থ আসার কথা, অনেক ক্ষেত্রেই তার ব্যত্যয় ঘটছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত জুন পর্যন্ত দেশে আসেনি প্রায় ১২৮ কোটি মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি প্রায় ১২ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা। মোট ৬৩ হাজার বিলের বিপরীতে এ আয় অপ্রত্যাবাসিত রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭ হাজার ৭০০ কোটি টাকা পূর্ণ এবং ৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা আংশিক মেয়াদোত্তীর্ণ। এ সময় পর্যন্ত প্রায় ৫৫ কোটি ২৫ লাখ ডলারের বিল স্বাভাবিক নিয়মে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা। স্বাভাবিক নিয়মে মেয়াদোত্তীর্ণ ৫৫ কোটি ২৫ লাখ ডলারের মধ্যে ২৮ কোটি ২২ লাখ ডলার ২০২০ সাল ও তার পরবর্তী কয়েক মাসের। বাকি ২৭ কোটি ৩ লাখ ডলার মেয়াদোত্তীর্ণ হয় ২০২১ সাল ও তার পরবর্তী কয়েক মাসে।
এ বিষয়ে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, এগুলো সহজে আদায়যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও আদায় করা হচ্ছে না কিংবা আদায় করা যাচ্ছে না। করোনা পরিস্থিতি উন্নতি হওয়ার পরও এখন পর্যন্ত আদায় না হওয়ার বিষয়টি অনভিপ্রেত। দীর্ঘ সময় ধরে এ অর্থ অপ্রত্যাবাসিত থাকার বিষয়ে ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকেও যৌক্তিক কোনো কারণ উপস্থাপন করা হয়নি। আবার অপ্রত্যাবাসিত রপ্তানির বিপরীতে নগদ সহায়তা পেতে আইনি কোনো সমস্যা না থাকায় রপ্তানিকারকদের এসব আয় দেশে আনার ক্ষেত্রে তেমন আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। ফলে রপ্তানি মূল্য পাচার তথা বাণিজ্যভিত্তিক অর্থপাচারের সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই এসব অর্থ আদায়ে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ আবশ্যক।
বৈদেশিক বাণিজ্যের আড়ালে দেশ থেকে অর্থপাচারের ঘটনা নতুন নয়। কেউ রপ্তানির মূল্য কম দেখিয়ে, কেউ আবার বিদেশ থেকে রপ্তানির মূল্য দেশে না এনে অর্থপাচার করছেন। আবার আমদানির মূল্য বেশি দেখিয়েও অর্থপাচার হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের গ্লোবাল ফিন্যানশিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) ২০২০ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর প্রায় ৭৯ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়।
এদিকে রপ্তানি আয় দেশে না এলেও সরকারের নগদ সহায়তা ও রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের (ইডিএফ) ঋণ ঠিকই তুলে নিচ্ছেন রপ্তানিকারকরা। এর মধ্য দিয়ে সরকারের নগদ সহায়তা ও ইডিএফ ঋণের অপব্যবহার হচ্ছে।
সূত্র: আমাদের সময়
আইএ/ ৪ জানুয়ারি ২০২৩









