দেশভাগের পর প্রথমবার আসাম থেকে ঢাকার পথে সরাসরি মালবাহী জাহাজ

ঢাকা, ০৬ অক্টোবর-১৯৪৭ সালে ভারতভাগের পর প্রথমবারের মতো ভারতের আসাম থেকে আন্তর্জাতিক নৌপথে সরাসরি ঢাকার উদ্দেশ্যে মালবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। সোমবার আসামের ডিব্রুগড় জেলার ব্রহ্মপুত্র নদের বগিবিল টার্মিনাল থেকে ৫৪০ মেট্রিক টন মিথানলবোঝাই একটি বার্জ ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। এর মাধ্যমে প্রায় ৭০ বছর ধরে বন্ধ থাকা ডিব্রুগড়ের ঐতিহাসিক নদীবন্দর ও নৌপথ আবার চালু হলো।
ভারতের কেন্দ্রীয় বন্দর, নৌপরিবহন ও জলপথমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জাহাজটির যাত্রা উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে একাধিক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও বিধায়ক উপস্থিত ছিলেন। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অনুষ্ঠানে যুক্ত হন।
নমরূপের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন আসাম পেট্রো-কেমিক্যালস লিমিটেডের (এপিসিএল) উৎপাদিত মিথানল নিয়ে বার্জটি ঢাকার পানগাঁও বন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর জাতীয় জলপথ-২ ব্যবহার করে জাহাজটি প্রায় ৭৬৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে পৌঁছাবে। এরপর ইন্দো-বাংলাদেশ প্রোটোকল রুট (আইবিপিআর) ধরে ঢাকার নারায়ণগঞ্জে যাবে। ডিব্রুগড়ের বগিবিল থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত জাহাজটিকে মোট ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হবে।
উত্তর-পূর্ব ভারতের পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে ব্রহ্মপুত্র নদ বাণিজ্যিক করিডোর হিসেবে কতটা অর্থনৈতিক ও ব্যবহারিক সম্ভাবনা রাখে, এই পরীক্ষামূলক যাত্রার মাধ্যমে সেটিই যাচাই করা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে সর্বানন্দ সোনোয়াল বলেন, তাদের দাদু-ঠাকুরমারা ডিব্রুগড় ঘাটে স্টিমারের বাঁশির শব্দ শুনে বড় হয়েছেন। ৭০ বছর ধরে সেই বাঁশি বন্ধ ছিল, জাহাজ চলাচলও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এখন ডিব্রুগড় থেকে আবার বিশ্বের উদ্দেশ্যে একটি জাহাজ রওনা হয়েছে। তার ভাষায়, নদী কখনো তাদের হতাশ করেনি, নদীপথ পুনরুজ্জীবিত করতে যে বিষয়টির অভাব ছিল তা হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
তিনি আরও বলেন, নমরূপে উৎপাদিত আসামের নিজস্ব পণ্য এখন আসামের নদীপথ ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাজারে যাচ্ছে। উত্তর-পূর্ব ভারত আর প্রান্তিক কোনো এলাকা নয়, বরং এটি এখন ভারতের পূর্বমুখী বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। এটি প্রথম যাত্রা হলেও শেষ নয়।
ঐতিহাসিকভাবে ডিব্রুগড় একসময় পূর্ব ভারতের অন্যতম ব্যস্ত নদীবন্দর ছিল। ১৮৫৬ সালের মধ্যেই তৎকালীন ক্যালকাটা, বর্তমান কলকাতা, থেকে সরকারি স্টিমার ডিব্রুগড়ে পৌঁছাত। ১৮৮২ সালে ডিব্রুগড় স্টিমার ঘাট থেকে ‘ডিব্রু-সাদিয়া রেলওয়ে’র কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯১৩ সালের দিকে আসামের চা, কাঠ ও যাত্রী পরিবহনের জন্য প্রতিদিন ব্রহ্মপুত্র নদ দিয়ে ডিব্রুগড়ে স্টিমার চলাচল করত।
তবে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর এই নৌযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে আসামের পণ্য কলকাতায় পাঠাতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে পরিবহন করতে হতো। পরে ১৯৫০ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে ডিব্রুগড়ের নদীগর্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৯৫৪ সালে ডিব্রুগড় ঘাট থেকে নিয়মিত বুকিং বন্ধ হয়ে যায়। রেলপথে চা পরিবহন শুরু হওয়ার পর ১৯৫৬ সালের ১৫ অক্টোবর ঘাটটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর আন্তঃসীমান্ত নদীবাণিজ্যও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রথম নদীবাণিজ্য প্রোটোকল স্বাক্ষরিত হয়। ১৯৮৮ সালে সাদিয়া থেকে ধুবড়ি পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র নদের ৮৯১ কিলোমিটার অংশকে ‘জাতীয় জলপথ-২’ ঘোষণা করা হয়। তবে এই জলপথে নিয়মিত কার্গো সেবা শুরু হতে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। ওই সময় পান্ডু থেকে ধুবড়িতে সিমেন্ট পরিবহন শুরু হয়।
সর্বানন্দ সোনোয়াল জানান, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ডিব্রুগড়কে তার ঐতিহ্যবাহী সম্মান ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বগিবিল টার্মিনাল, কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন কমপ্লেক্স এবং ‘জলবাহক’ প্রকল্পের আওতায় নিয়মিত কার্গো সেবা চালুর মাধ্যমে শহরটিকে আন্তর্জাতিক মানের অবকাঠামো দেওয়া হচ্ছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই নৌপথে বাণিজ্যিক কার্যক্রম আরও গতি পেয়েছে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে টাটা স্টিলের একটি বার্জ বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে পান্ডুতে পৌঁছায়। ২০২৩ সালে নদীভিত্তিক প্রমোদতরী ‘এমভি গঙ্গা বিলাস’ বারাণসী থেকে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ডিব্রুগড়ে যায়। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বগিবিল প্যাসেঞ্জার ও কার্গো টার্মিনাল উদ্বোধন করা হয়। একই বছরের ডিসেম্বরে চালু করা হয় ‘জলবাহক’ কার্গো প্রণোদনা কর্মসূচি।
ভারতের বন্দর, নৌপরিবহন ও জলপথ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ভারতের জাতীয় জলপথে যেখানে মাত্র ১৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন পণ্য পরিবহন হতো, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ২১৮ মিলিয়ন মেট্রিক টনে পৌঁছেছে। বর্তমানে উত্তর-পূর্ব ভারতের জলপথ উন্নয়নে ৬৮ বিলিয়ন রুপি, প্রায় ৭৭ কোটি মার্কিন ডলার, বিনিয়োগ করা হচ্ছে। এর মধ্যে জাতীয় জলপথ-২-এর উন্নয়ন, পান্ডুতে জাহাজ মেরামত কারখানা নির্মাণ এবং পান্ডু বন্দরের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার কাজ রয়েছে।
সোনোয়াল বলেন, নদীপথে প্রতি টন পণ্য পরিবহন করলে কম জ্বালানি ব্যবহার হয় এবং মহাসড়কে ট্রাকের চাপও কমে। আঞ্চলিক জলপথ সংযোগ বাড়াতে ভারত এখন বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে। এই ঐতিহাসিক নৌযাত্রায় ইনল্যান্ড ওয়াটারওয়েজ অথরিটি অব ইন্ডিয়া (আইডব্লিউএআই), আসাম পেট্রো কেমিক্যালস, কোচিন ব্যাংকার্স প্রাইভেট লিমিটেড এবং বাংলাদেশের সহযোগী অংশীদারেরা যৌথভাবে অংশ নিয়েছে।
এস এম/ ০৬ অক্টোবর ২০২৬







