
উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের শহরগুলোতে গত কয়েক দশক ধরে একটি দৃশ্য ক্রমেই বেশি চোখে পড়ছে। তা হলো রাস্তা, পাবলিক পার্ক কিংবা ফুটপাত দখল করে শত শত মানুষের দলবদ্ধ প্রার্থনা। বিশেষ করে জুমার নামাজে এই দৃশ্য এখন পরিচিত চিত্র হয়ে উঠেছে। একসময় এটিকে পশ্চিমা বিশ্বের বহুত্ববাদ ও ধর্মীয় সহনশীলতার প্রতীক হিসেবে দেখা হতো, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় নাগরিকদের প্রাত্যহিক জীবনে এক ধরণের অস্বস্তি ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সেই বিতর্কই এখন নতুন তীব্রতা পেয়েছে কানাডার কুইবেক প্রদেশে, যেখানে সরকার আইন করে রাস্তা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রার্থনার ব্যবস্থাকে নতুন সীমার মধ্যে আনছে। এই পদক্ষেপ কেবল একটি আইনি পরিবর্তন নয়; বরং ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নাগরিক শৃঙ্খলার সীমানা পুনর্নির্ধারণের এক বলিষ্ঠ ইঙ্গিত।
সিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২ এপ্রিল ২০২৬ কুইবেক সরকার Bill 94-কে কেন্দ্র করে একটি ঐতিহাসিক ও কঠোর পদক্ষেপ সামনে আনে। কুইবেক ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির নথি অনুযায়ী, আইনটি ৩০ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে চূড়ান্ত আইনগত অনুমোদন পায়। দ্য কানাডিয়ান প্রেসের সূত্রে জানা গেছে, এই আইনের মাধ্যমে জনসমক্ষে, অর্থাৎ রাস্তা, ফুটপাত বা পার্কে, অনুমতি ছাড়া দলবদ্ধ প্রার্থনার ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের প্রার্থনা কক্ষও সরিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কুইবেকের প্রিমিয়ার ফ্রাঁসোয়া লেগল্ট স্পষ্ট জানিয়েছেন, “রাস্তা বা পাবলিক পার্ক প্রার্থনার জায়গা নয়; এটি নাগরিকদের চলাচলের জায়গা।” সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এই পদক্ষেপ তাদের প্রতিষ্ঠিত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রনীতিরই ধারাবাহিকতা, যার লক্ষ্য জনপরিসরকে ধর্মীয় প্রভাব থেকে আলাদা রাখা।
এই আইনের প্রভাব নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে ঘিরে। কারণ জনসমক্ষে দলবদ্ধ নামাজ এবং প্রার্থনার স্থানসংক্রান্ত প্রশ্নটি বাস্তবে তাদের সঙ্গেই বেশি দৃশ্যমানভাবে যুক্ত। কানাডায় গত দুই দশকে মুসলিম জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, কানাডায় বর্তমানে প্রায় ১৮ লাখ মুসলমান বসবাস করেন, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫ শতাংশ। টরন্টো, মন্ট্রিয়ল এবং ক্যালগারির মতো বড় শহরগুলোতে তাদের উপস্থিতি আরও বেশি দৃশ্যমান। ফলে ধর্মীয় স্বাধীনতা, সুবিধা প্রদান, এবং জনপরিসর ব্যবহারের প্রশ্নটি আর প্রান্তিক কোনো আলোচনা নয়; এটি এখন বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমানের সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখের কাছাকাছি। নিউ ইয়র্ক, মিশিগান এবং টেক্সাসে তাদের উপস্থিতি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ফলে জনসমক্ষে ধর্মীয় প্রকাশ, কমিউনিটি পরিসর, এবং প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করার প্রশ্নটি সেখানেও বহুদিন ধরেই রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার অংশ হয়ে আছে।
এই বড় জনগোষ্ঠীর জন্য ইবাদতের উপযুক্ত স্থানের চাহিদাও ক্রমে বাড়ছে। কোথাও পর্যাপ্ত মসজিদ বা ইনডোর প্রার্থনার স্থান নেই, কোথাও আবার বিশেষ দিনে অতিরিক্ত সমাগম সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। সেই বাস্তবতায় কখনও কখনও জনপরিসর ব্যবহারের নজির দেখা যায়। কিন্তু সেখান থেকেই স্থানীয় নাগরিকদের সঙ্গে অসুবিধা, অস্বস্তি এবং সংঘাতের প্রশ্ন সামনে আসে।
দীর্ঘদিন ধরে উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলো ধর্মীয় অনুশীলনের জন্য বিভিন্ন ধরনের সুবিধা দিয়ে আসছে। এর মধ্যে রয়েছে আলাদা প্রার্থনার স্থান। অনেক এয়ারপোর্ট, শপিং মল এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আলাদা প্রার্থনা কক্ষ, অর্থাৎ Multi-faith room, বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়া নিউ ইয়র্ক বা হ্যামট্রাম্যাকের মতো কিছু শহরে মাইকে আজান দেওয়ার অনুমতিও দেওয়া হয়েছে। স্কুল, হাসপাতাল এবং জেলখানায় হালাল খাবারের ব্যবস্থাও রাখা হয়। অনেক কর্মক্ষেত্রে নামাজের জন্য স্বল্প সময়ের বিরতি দেওয়ার রীতিও দেখা যায়। অর্থাৎ পশ্চিমা সমাজ বহু ক্ষেত্রেই ধর্মীয় অনুশীলনের জন্য একটি নমনীয় পরিসর তৈরি করেছে। কিন্তু সেই পরিসরের সীমা কোথায়, এখন বিতর্ক মূলত সেখানেই।
জনপরিসরের ব্যবহার ঘিরেই এই বিতর্ক সবচেয়ে বেশি তীব্র হয়ে উঠেছে। টরন্টো বা লন্ডনের মতো শহরগুলোতে ব্যস্ত ফুটপাত দখল করে নামাজ পড়ার ফলে সাধারণ পথচারী, ছোট শিশুদের ট্রলিতে নিয়ে বাজারে আসা নারী, হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী এবং বয়স্ক মানুষের চলাচলে গুরুতর বিঘ্ন ঘটে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে ধর্মীয় আবেগকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পৌর বিধি (By-law) লঙ্ঘনের অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও বলেছেন, দোকানের সামনের ফুটপাত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় তাদের ব্যবসায় ক্ষতি হয়। আবার রাজনৈতিক প্রতিবাদ, ধর্মীয় সমাবেশ এবং জনসমক্ষে দৃশ্যমান উপস্থিতি একসঙ্গে মিশে গেলে সমালোচকদের একাংশ সেটিকে কেবল ধর্মীয় অধিকার হিসেবে নয়, বরং “ধর্মীয় শক্তি প্রদর্শন” হিসেবেও দেখছেন। এ কারণেই এই বিতর্ক এখন শুধু বিশ্বাসের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; এটি পৌর বিধি, চলাচল-সুবিধা, যানপ্রবাহ, এবং আইনের সমান প্রয়োগের প্রশ্নেও রূপ নিয়েছে।
ইউরোপেও এই দৃশ্যপট দ্রুত পাল্টাচ্ছে। ফ্রান্সে ২০১১ সাল থেকেই রাস্তায় নামাজ পড়া আইনত নিষিদ্ধ। প্যারিসের রাস্তায় হাজার হাজার মানুষের নামাজের দৃশ্য সে সময় ফরাসি ধর্মনিরপেক্ষতা বিতর্কে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। বর্তমানে যুক্তরাজ্যেও জনসমক্ষে ধর্মীয় আয়োজন, খোলা আকাশের নিচে প্রার্থনা সমাবেশ নিয়ে রাজনৈতিক আপত্তি বাড়ছে। কিছু রাজনৈতিক দল ট্রাফালগার স্কয়ারের মতো জায়গায় এ ধরনের আয়োজনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছে। তাদের মতে, এসব আয়োজন নাগরিকদের ব্যক্তিগত স্বস্তিতে ব্যাঘাত ঘটায়।
কানাডার সবচেয়ে জনবহুল শহর টরন্টোতেও এই বিতর্ক এখন ক্রমেই দৃশ্যমান। নগরীর ব্যস্ততম মোড়গুলোতে জুমার নামাজের সময় যখন শত শত মানুষ ফুটপাতের বড় অংশ জুড়ে দাঁড়ান, তখন সাধারণ পথচারীদের জন্য চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে। পার্কিংও একটি বড় সমস্যা, কারণ অনেকে অবৈধভাবে গাড়ি পার্ক করে নামাজে যোগ দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ড্যানফোর্থের বাংলা টাউন এলাকার ফুটপাতে চেয়ার, টেবিল ও মাইক ব্যবহার করে মসজিদ উন্নয়নের জন্য চাঁদা তোলার দৃশ্যও দেখা গেছে। বিষয়টির ধর্মীয় সংবেদনশীলতার কারণে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো যথাযথ ব্যবস্থা নিতে দ্বিধা করে। ফলে অন্য ধর্মাবলম্বী ও সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে ‘আইনের দ্বিমুখী প্রয়োগ’ নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে। অনেক নাগরিক মনে করেন, রাস্তায় ক্রীড়া বা রাজনৈতিক ইভেন্টের জন্য যেমন অনুমতি লাগে, ধর্মীয় ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
কুইবেকের এই আইন একটি সতর্কবার্তা। ধর্মীয় স্বাধীনতা সমাজের মৌলিক মূল্যবোধের অংশ, কিন্তু সেই স্বাধীনতা যদি অন্যের নাগরিক অধিকার বা চলাচলের স্বাধীনতার সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, তবে রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করতেই পারে। তাই প্রশ্নটি এখন কেবল ধর্মীয় অধিকারের নয়; বরং কীভাবে ধর্মীয় অনুশীলন এমনভাবে সংগঠিত করা যায়, যাতে স্থানীয় আইন, জনপরিসরের শৃঙ্খলা এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবন অক্ষুণ্ন থাকে।
এই পরিস্থিতিতে আবেগ নয়, প্রয়োজন বাস্তবসম্মত সমাধান। মসজিদের ভেতরে পর্যাপ্ত জায়গা না হলে কয়েক ধাপে জামাতের আয়োজন করা যেতে পারে। তা ছাড়া বিকল্প ইনডোর স্পেস ভাড়া করা কিংবা সিটির অনুমতি নিয়ে সুশৃঙ্খলভাবে ব্যবস্থা করাও হতে পারে কার্যকর সমাধান। মনে রাখতে হবে, জনসমক্ষে নিয়মবহির্ভূত আচার পালন দীর্ঘমেয়াদে ‘ইসলামোফোবিয়া’ বা বিদ্বেষ বাড়িয়ে দিতে পারে। একটি বৈচিত্র্যময় সমাজে রাষ্ট্রীয় নিরপেক্ষতা এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ভারসাম্য বজায় রাখাই হোক আগামী দিনের সভ্য পথচলা।
তথ্যসূত্র:
CTV News / The Canadian Press (২ এপ্রিল ২০২৬)
National Assembly of Québec (৩০ অক্টোবর ২০২৫)
Al Jazeera (European Public Prayer Ban History)









