জাতীয়

স্থগিত শেরপুর-৩ আসনে ৯ এপ্রিল ভোট: বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস

শেরপুর, ২ এপ্রিল – স্থগিত হওয়া শেরপুর-৩ আসনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে আগামী ৯ এপ্রিল। নির্বাচনকে ঘিরে প্রার্থীদের ব্যাপক প্রচারণায় উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে ভোটের মাঠ। ভোটারদের মনোযোগ আকর্ষণে নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন প্রার্থীরা। অন্যদিকে নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন। সারা দেশের মানুষের দৃষ্টি এখন এই আসনের দিকে নিবদ্ধ।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও ৩ ফেব্রুয়ারি জামায়াতে ইসলামী মনোনীত ও এগারো দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদলের মৃত্যুতে এই আসনের নির্বাচন স্থগিত করে কমিশন।

পরবর্তীতে নতুন তফসিল ঘোষণার পর যাচাইবাছাই শেষে বর্তমানে তিনজন প্রার্থী নির্বাচনি লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন। তারা হলেন বিএনপি মনোনীত মাহমুদুল হক রুবেল, জামায়াতে ইসলামী মনোনীত মাসুদুর রহমান মাসুদ এবং বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল বা বাসদ মার্কসবাদীর মিজানুর রহমান।

সরেজমিনে সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এবারের নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি এবং জামায়াতের মধ্যে। কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ। দিনরাত সমানতালে প্রার্থীদের প্রচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে পুরো নির্বাচনি এলাকা।

তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মাহমুদুল হক রুবেল এবার প্রচারণায় ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করেছেন। তিনি কেবল দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর নির্ভর না করে সপরিবারে মাঠে নেমেছেন। তার স্ত্রী, ছেলে ও মেয়ে আলাদাভাবে পথসভা করছেন এবং ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন। প্রায় দুই দশক পর আসনটি পুনরুদ্ধারে হক পরিবারের এই তৎপরতাকে নতুন রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা।

অন্যদিকে মাঠে জোরালো অবস্থানে রয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ও অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য মাসুদুর রহমান মাসুদ। তিনি প্রয়াত নুরুজ্জামান বাদলের ছোট ভাই। ভাইয়ের সামাজিক পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন।

সাধারণ ভোটারদের মতে, এখানে বিএনপি এবং জামায়াতের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে।

শেরপুর-৩ আসনের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৭৯ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত এখানে বিএনপির প্রবীণ নেতা প্রয়াত চিকিৎসক সেরাজুল হকের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। তার মৃত্যুর পর ১৯৯৪ সালে রাজনীতিতে আসেন তার ছেলে মাহমুদুল হক রুবেল। বাবার জনপ্রিয়তা কাজে লাগিয়ে তিনি ১৯৯৪, ১৯৯৫ ও ১৯৯৬ সালে টানা তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। কিন্তু ২০০৮ সালের নির্বাচনে রাজনৈতিক সমীকরণ পরিবর্তনের ফলে আসনটি বিএনপির হাতছাড়া হয়। দীর্ঘদিনের সেই হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে এবার জয়ের জন্য মরিয়া সাবেক সংসদ সদস্য রুবেল।

এবারের নির্বাচনে জয়ের লক্ষ্যে হক পরিবার নারীদের বিশাল ভোটব্যাংককে টার্গেট করেছে। এই আসনের মোট চার লাখ তেরো হাজার তিনশ সাতাত্তর জন ভোটারের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই নারী। এই নারী ভোটারদের সমর্থন আদায়ে বিএনপি প্রার্থীর স্ত্রী ফরিদা হক দীপা এবং মেয়ে রুবাইদা হক রিমঝিম বিভিন্ন পাড়া মহল্লায় উঠান বৈঠক করছেন। পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী ছেলে রাফিদুল হক তরুণ ও শিক্ষিত ভোটারদের আকৃষ্ট করতে প্রচারণায় সক্রিয় রয়েছেন। পারিবারিক এই অংশগ্রহণ সাধারণ ভোটার ও তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছে।

জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী মাহমুদুল হক রুবেল। তিনি জানান, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বন্যা ও করোনা মহামারির মতো দুর্যোগে তিনি সবসময় সাধারণ মানুষের পাশে ছিলেন। শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতী এলাকার প্রতিটি মানুষের সমস্যা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে তিনি অবগত।

তিনি অভিযোগ করেন, জামায়াতের কর্মীরা টাকার বিনিময়ে ভোট কেনার চেষ্টা করছে। প্রশাসন বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত এবং ইতিমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। তিনি আশা করেন প্রশাসন এসব ক্ষেত্রে কঠোর পদক্ষেপ নেবে।

অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থী মাসুদুর রহমান মাসুদ দাবি করেন, এই আসনটি তার প্রয়াত ভাইয়ের হাতে গড়া। এখানকার মানুষ এখন যথেষ্ট সচেতন, তারা পুরোনো রাজনৈতিক আশ্বাসে বিভ্রান্ত হবেন না। সাধারণ মানুষ চাঁদাবাজ ও অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে পরিত্রাণ চায় এবং জামায়াতে ইসলামীকে একটি নিরাপদ বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করছে। তিনি নির্বাচনে নিজেদের বিজয়ের বিষয়ে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

জামায়াতের নির্বাচনি পরিচালনা কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা ও জেলা সহকারী সেক্রেটারি গোলাম কিবরিয়া জানান, শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতী উপজেলার সতেরোটি ইউনিয়ন এবং একটি পৌরসভার চার লক্ষাধিক ভোটার তাদের ইশতেহারকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে তরুণ সমাজ জামায়াতের আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। তিনি তাদের বিরুদ্ধে চালানো অপপ্রচারের অভিযোগও তোলেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আসনে কোনো প্রার্থীর জন্যই জয়ের পথ খুব একটা মসৃণ নয়। জোটের সমীকরণ বদলে যাওয়ার কারণে জামায়াত প্রার্থী মাসুদুর রহমান মাসুদ বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছেন। জামায়াতের সুসংগঠিত কর্মী বাহিনী এবং সুনির্দিষ্ট ভোটব্যাংক বিএনপি প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেলের জন্য কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে।

জেলা নির্বাচন ও রিটার্নিং কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, শেরপুর-৩ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা চার লাখ তেরো হাজার তিনশ সাতাত্তর জন। দুটি উপজেলার সতেরোটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এই আসনে মোট একশ আঠাশটি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে গারো পাহাড় এলাকার বত্রিশটি কেন্দ্রকে দুর্গম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।

এনএন/ ২ এপ্রিল ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language