
সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাতের কঠোর আবহাওয়ার ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠে বহু বাংলাদেশি প্রবাসীর দিনযাপন। নির্মাণ সাইট, শপিং মল, গৃহকর্ম কিংবা কারখানার শ্রমনির্ভর কাজে তারা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পরিশ্রম করেন। এই জীবনে আয় সীমিত, ব্যয় নিয়ন্ত্রিত, আর স্বপ্নগুলো প্রায় সবই দেশে ফেলে আসা পরিবারের জন্য সংরক্ষিত। অনেকেই অস্বস্তিকর ও অস্থায়ী আবাসে থাকেন, ভালো খাবার এড়িয়ে চলেন, এমনকি অসুস্থ হলেও চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে সস্তা ওষুধে ভরসা করেন। কারণ তাদের কাছে প্রতিটি সঞ্চিত রিয়াল, দিনার বা দিরহাম মানে সন্তানের স্কুলের খরচ, মায়ের ওষুধ, কিংবা গ্রামের বাড়িতে টিকে থাকা একটি পরিবারের শ্বাসপ্রশ্বাস। বাইরে থেকে এই জীবনকে কেবল প্রবাসজীবন বলে মনে হতে পারে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে এটি এক কঠিন ত্যাগের অর্থনীতি, যেখানে মানুষ নিজের শরীর, স্বাচ্ছন্দ্য এবং স্বাস্থ্যকে বন্ধক রেখে পরিবারের ভবিষ্যৎ বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করে।
কিন্তু এই আত্মত্যাগের মহিমান্বিত গল্পের আড়ালেই লুকিয়ে আছে গাঢ় অন্ধকার, নির্মম এক বাস্তবতা। মরুভূমির ঐশ্বর্যময় শহরগুলোর ঝলমলে প্রান্তর, উঁচু অট্টালিকা আর বিলাসের আবরণ ভেদ করে ভেতরে ভেতরে গড়ে উঠেছে এক নিষ্ঠুর চক্র, যারা মানুষের শরীরকেও মুনাফার সামগ্রীতে পরিণত করেছে। এই বাণিজ্যের নাম অঙ্গ পাচার। এখানে কিডনি, লিভার, রক্ত, টিস্যু, সবকিছুরই দাম আছে, শুধু দাম নেই দরিদ্র মানুষের জীবনযন্ত্রণার। প্রতারণা, ভুয়া চিকিৎসা, জাল রিপোর্ট আর অসহায় মানুষকে ফাঁদে ফেলার সুপরিকল্পিত কৌশলে তারা কাজ করে যায়। তাদের প্রধান শিকার সেইসব বাংলাদেশি শ্রমিক, যারা ভাষা জানেন না, আইন বোঝেন না, বিদেশের কঠিন বাস্তবতায় একা, এবং মানুষের মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা হিংস্রতা কল্পনাও করতে পারেন না।
এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন সেই নিপীড়িত, নিভৃত প্রবাসীদের কাহিনি, যাদের শ্রমের সঙ্গে প্রতারণা জড়িয়ে গেছে, যাদের বিশ্বাসকে অস্ত্র বানানো হয়েছে, আর যাদের শরীরকে পণ্যে পরিণত করেছে এক নির্মম চক্র। এটি কেবল অঙ্গপাচারের গল্প নয়। এটি প্রবাসী অসহায়ত্ব, চিকিৎসা পেশার কিছু বিশ্বাসঘাতক মুখ, আন্তর্জাতিক দালালচক্র এবং রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার ফাঁক গলে হারিয়ে যাওয়া মানুষের গল্প। যে মানুষটি বিদেশে গিয়েছিলেন সংসার বাঁচাতে, অনেক ক্ষেত্রেই তাকেই ফিরতে হয়েছে ভাঙা শরীর, ভাঙা মন আর অসম্পূর্ণ জীবন নিয়ে।
দিনাজপুরের রফিকুল ইসলাম তেমনই একজন। সৌদির একটি নির্মাণ সাইটে কাজ করে তিনি ভেবেছিলেন পরিবারের ভাগ্য ফেরাবেন। কিন্তু দাম্মামের একটি তথাকথিত রুটিন স্বাস্থ্য পরীক্ষা তাঁর জীবনকে অন্যদিকে নিয়ে যায়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁকে বলা হয়েছিল লিভার পরীক্ষা করা হবে। এরপর তাঁকে অজ্ঞান করা হয়। জেগে উঠে তিনি দেখেন পেটে লম্বা সেলাই। ডাক্তার নাকি বলেছিলেন, তাঁর কিডনিতে টিউমার ছিল, তাই তা ফেলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তিনি কখনও জানতে পারেননি, কোন পরীক্ষায় এমন রোগ ধরা পড়ল, কে সম্মতি দিল, আর অপারেশন থিয়েটারের ভেতরে তাঁর শরীরে আসলে কী করা হয়েছিল।
কুমিল্লার মোখলেসুর রহমানের ঘটনাও একই রকম। ওমান থেকে তাঁকে দুবাই নেওয়ার কথা বলে একটি মরুভূমির সেফ হাউসে পনেরো দিন আটকে রাখা হয়। বলা হয়েছিল, তাঁর রক্তে সংক্রমণ রয়েছে, জরুরি পিউরিফিকেশন দরকার। বিদেশের মাটিতে অসহায় মানুষটি চিকিৎসার নামে যা বলা হয়েছিল, তাই মেনে নেন। পরে অভিযোগ ওঠে, অজ্ঞান করার পর তাঁর লিভারের একটি অংশ কেটে নেওয়া হয়। দেশে ফেরার পর তাঁর জীবন আর আগের জায়গায় ফিরে যায়নি। এখন তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত অবস্থায় অন্যের সহায়তার উপর নির্ভর করে বেঁচে আছেন।
অঙ্গপাচারের এই চক্র হঠাৎ করে কাজ করে না। এর পেছনে থাকে সুসংগঠিত প্রস্তুতি, ধাপে ধাপে ফাঁদ পাতা, আর প্রতিটি ধাপে লোভ ও প্রতারণার সমন্বয়। অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের বিদেশে পাঠানোর ভিসা, টিকিট, মেডিকেল ক্লিয়ারেন্স বা নিয়োগপত্রের খরচ দালালরা আগাম পরিশোধ করে দেয়। পরে সেই ঋণের বোঝা দেখিয়ে তাদের মানসিকভাবে দুর্বল করে ফেলা হয়। কোথাও চাকরির প্রলোভন, কোথাও বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, কোথাও উচ্চ বেতনের লোভ, কোথাও আবার কাজের অনুমতি নবায়নের অজুহাতে ক্লিনিকে নেওয়া হয়। এরপর ভুয়া পরীক্ষার রিপোর্ট তৈরি করা হয়, যেখানে দেখানো হয় কিডনি নষ্ট, লিভারে সমস্যা, রক্তে জটিল সংক্রমণ, কিংবা শরীরে এমন কিছু অসুখ ধরা পড়েছে যার জন্য জরুরি অস্ত্রোপচার দরকার। অসহায় শ্রমিক বুঝে উঠতে না উঠতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে যায় তাঁর শরীর নিয়ে।
চক্রটির কাছে মানুষ কোনো দিনই মুখ্য ছিল না, মুখ্য ছিল অর্থ। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি অঙ্গ অপসারণের পেছনে কমিশনের নির্দিষ্ট বণ্টন থাকত। দালাল, ক্লিনিককর্মী, টেকনিশিয়ান, ভুয়া রিপোর্ট প্রস্তুতকারী এবং কিছু অসাধু চিকিৎসাকর্মী মিলে গড়ে তুলেছিল একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক, যেখানে রোগীর শরীরকে দেখা হতো মুনাফার উৎস হিসেবে। একটি কিডনি বিক্রি হলেই মিলত ৫০ হাজার রিয়াল পর্যন্ত কমিশন। এই লোভই তাদের শিকারিতে পরিণত করত। একজন শ্রমিক হয়তো ভেবেছেন, তিনি চাকরির ফিটনেস টেস্ট দিচ্ছেন। অথচ একই সময়ে অন্য কোথাও হিসাব কষা হচ্ছিল তাঁর রক্তের গ্রুপ, টিস্যুর মিল, অঙ্গের উপযোগিতা এবং সম্ভাব্য বাজারমূল্য নিয়ে।
বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক অঙ্গবাজারে একটি কিডনির মূল্য দেড় লাখ থেকে দুই লাখ ডলার। এই কিডনিগুলো গোপন পথে হাতবদল হয়ে ইরাকের বসরা ঘুরে ইসরায়েল, তুরস্ক এবং ইউরোপের বিভিন্ন হাসপাতালে পৌঁছে যায়। লেনদেনের বড় অংশই সম্পন্ন হয় হুন্ডি বা হাওয়ালার মতো অনানুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থায়। কিন্তু এই বেচাকেনার নেপথ্যে কত কান্না, কত ভাঙন, কত নীরব শূন্যতা জমা হচ্ছে, তার কোনো হিসাব নেই। একটি মানুষের শরীর হারায় তার স্বাভাবিক শক্তি, একটি পরিবার হারায় তার উপার্জনক্ষম ভরসা, আর একটি জীবনের ওপর নেমে আসে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা।
কুয়েতে এই চক্রের প্রস্তুতিপর্ব হিসেবে পরিচিত ছিল আরও এক ঘৃণ্য কৌশল, যাকে ভেতরের মহলে অনেকে ব্লাড ফার্মিং বলে থাকেন। শ্রমিকদের ডাকা হতো রক্ত পরীক্ষা, পুষ্টি পরীক্ষা, ভিটামিন ইনজেকশন কিংবা রুটিন স্বাস্থ্যসেবার নামে। তাদের রক্ত সংগ্রহ করা হতো, কিন্তু তা চিকিৎসার জন্য নয়, বরং সম্ভাব্য টিস্যু ম্যাচিংয়ের জন্য। অভিযোগ অনুযায়ী, এইচএলএ টাইপিংয়ের মাধ্যমে ধনী ক্রেতাদের জন্য ‘পারফেক্ট ম্যাচ’ খোঁজা হতো। কোনো শ্রমিকের শরীর একবার ক্রেতার প্রয়োজনের সঙ্গে মিলে গেলে, তাকে ক্লিনিকে ভর্তির জন্য আরেকটি অজুহাত দাঁড় করানো হতো।
অনেক ক্ষেত্রেই শ্রমিকদের বলা হতো, নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা দরকার। কখনও বলা হতো, রক্ত ঘন হয়ে গেছে। কখনও বলা হতো, শরীরে ঘাটতি ধরা পড়েছে। আবার কাউকে বোঝানো হতো, কাজের অনুমতিপত্র নবায়নের আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক। এর পেছনে যে শিকার বাছাইয়ের প্রক্রিয়া চলছে, তা তাঁরা বুঝতে পারতেন না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের শব্দ, আরবি নথি, অপরিচিত ক্লিনিক, বিদেশি পরিবেশ এবং ভয়, সব মিলিয়ে তাঁরা এমন এক পরিস্থিতিতে পড়তেন, যেখান থেকে বেরিয়ে আসার পথ তাঁদের সামনে খোলা থাকত না।
অভিযোগ রয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন শহরের কিছু বেসরকারি ক্লিনিক, ডায়ালিসিস সেন্টার এবং অনিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্যকেন্দ্র এই অপরাধচক্রের জন্য নিরাপদ পরিকাঠামো তৈরি করে দিয়েছিল। কোথাও চাকরির মেডিকেল ক্লিয়ারেন্স, কোথাও মেডিকেল ট্যুরিজম, কোথাও বিশেষ সার্জিক্যাল সুবিধা, কোথাও আবার জরুরি পরীক্ষার নামে মানুষকে ভেতরে নেওয়া হতো। বাইরে থেকে সবকিছু নিয়মমাফিক মনে হতো। কাগজে সিল ছিল, রিপোর্ট ছিল, প্রেসক্রিপশন ছিল, হাসপাতালের বেডও ছিল। শুধু ছিল না রোগীর পূর্ণ সম্মতি, স্বাধীনতা, আর সত্য জানার অধিকার।
সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরের কিছু গোপন বেসরকারি ক্লিনিক ছিল এদের অপারেশন বেস। উদাহরণস্বরূপ, রিয়াদে সংঘটিত এক ঘটনায় অন্তত ১১ জন বাংলাদেশি শ্রমিকের কিডনি ও লিভার অপসারিত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদেরকে ভুয়া স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা চাকরির মেডিকেল ক্লিয়ারেন্সের নামে ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
এইভাবে মধ্যপ্রাচ্যের মরুপ্রান্তরে বিকশিত হয়েছে ‘অর্গান ট্যুরিজম’ নামক এক নিষ্ঠুর বাণিজ্য, যা শুধুমাত্র শ্রমিকদের দেহ নয়, চূর্ণ করে দিয়েছে সভ্যতার মানবিক বিবেক এবং নৈতিকতা। প্রতিটি কিডনির বিনিময়ে রচিত হচ্ছে এক একটি জীবন ধ্বংসের গল্প।
সৌদি সরকার ২০২২ সালে দেশজুড়ে অঙ্গপাচারের বিস্তার নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে একটি নতুন আইন প্রণয়ন করে। এই আইনের আওতায় বিমানবন্দরগুলোতে বিশেষ স্ক্যানার বসানো হয়, যাতে প্রবাসী শ্রমিকদের শরীরে অঙ্গ অপসারণের চিহ্ন আছে কি না তা যাচাই করা যায়। উদ্দেশ্য ছিল পাচারের শিকার ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং চক্রের গতিবিধি নজরে আনা। তবে মানবাধিকারকর্মীদের মতে, নজরদারি থাকলেও তার কার্যকারিতা, স্বচ্ছতা এবং বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে এখনো বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে।
এই অপরাধের ভয়াবহতা শুধু জীবিত শিকারদের গল্পে থেমে নেই। অনেক সময় দেখা গেছে, কোনো শ্রমিকের মৃত্যু হৃদরোগ, স্ট্রোক বা স্বাভাবিক শারীরিক জটিলতা হিসেবে জানানো হয়েছে। কিন্তু দেশে আসা মরদেহের পেটে, কোমরের পাশে বা পিঠে কাটা-ছেঁড়ার দাগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্বজনরা। তবু অধিকাংশ পরিবার শোকে ভেঙে পড়া অবস্থায় ময়নাতদন্তের কথা ভাবতে পারেন না। কেউ জানেন না আইনগত প্রক্রিয়া কী, কেউ ভয় পান জটিলতায় জড়াতে, কেউ ভাবেন মৃতদেহ নিয়ে বেশি টানাটানি অসম্মানজনক হবে। ফলে যে দাগগুলো একসময় বড় প্রমাণ হতে পারত, তা মাটির নিচে চাপা পড়ে যায় পরিবারের কান্নার সঙ্গে।
এই অঙ্গপাচার-সংক্রান্ত মামলাগুলোর বেশিরভাগই আদালতে টিকে না। প্রমাণের অভাব, শিকারদের ভাষাগত অক্ষমতা এবং প্রক্রিয়াগত জটিলতা এর প্রধান কারণ। অনেক সময় শিকাররা ইংরেজি বা আরবি ভাষা না জানায় তারা কী কাগজে সই করছেন, তাও বুঝতে পারেন না। এদিকে চক্রটি দিন দিন আরও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), টেলিগ্রাম চ্যানেল এবং ডার্ক ওয়েবভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করে তারা নিজেদের নেটওয়ার্ককে আরও অদৃশ্য করে তুলছে। এমনকি “Human Harvest” নামের একটি ডার্ক ওয়েবসাইটে “রেড বেরি” কোডওয়ার্ড ব্যবহার করে কিডনি বিক্রির বিজ্ঞাপনের কথাও বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে, যা এই আন্তর্জাতিক চক্রের বিস্তৃতি ও নৃশংসতার ধারণা দেয়।
এই ভয়াবহ অঙ্গ পাচার চক্রে জড়িত ছিল বাংলাদেশেরই কিছু নামধারী চিকিৎসক। চিকিৎসা পেশাকে পুঁজি করে, নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে তাঁরা অংশ নিয়েছেন মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে। গত কয়েক বছরে অন্তত ৯ জন বাংলাদেশি ডাক্তারের বিরুদ্ধে সৌদি আরব ও কুয়েতে কিডনি পাচার চক্রে জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে এবং তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
২০১৮ সালে জেদ্দার এক প্রাইভেট ক্লিনিকে কর্মরত ছিলেন ডা. শফিকুল ইসলাম। তাঁর বিরুদ্ধে ১৫টি অবৈধ কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্টে সরাসরি অংশ নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয়। আদালতের রায়ে তিনি চাকরিচ্যুত হন এবং ২০২৩ সালে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
দাম্মামে ২০২১ সালে ঘটেছিল আরেকটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা। ডা. রহিমুল্লাহ নামে এক চিকিৎসক “টিউমার অপসারণ”-এর নামে এক শ্রমিকের কিডনি কেটে নেন। এই অপরাধের পর তাঁর চিকিৎসা লাইসেন্স বাতিল হয় এবং এখন তিনি সৌদি কারাগারে বন্দি।
কুয়েতে ২০২০ সালে ধরা পড়েন ডা. সাইফুর রহমান, যিনি ২৩ জন শ্রমিকের ভুয়া মেডিকেল রিপোর্ট বানিয়ে তাদের অঙ্গ অপসারণের পথ সুগম করেছিলেন। আদালতের রায়ে তাঁকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
২০২২ সালে রিয়াদে ধরা পড়েন ডা. মো. আলী হোসেন, যিনি ‘অর্গান ট্যুরিজম’ নামক এক আন্তর্জাতিক চক্রে সক্রিয় ছিলেন। তাঁকে সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়।
২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি কারাগারে অঙ্গপাচার-সংশ্লিষ্ট অভিযোগে ৪২ জন বাংলাদেশি আটক রয়েছেন।
এদিকে, ২০২৪ সালের মার্চে কাতারের দোহায় একটি অবৈধ ডায়ালিসিস সেন্টার থেকে ৩ বাংলাদেশি নার্সসহ ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়। অভিযোগ, তারা শ্রমিকদের রক্ত পরীক্ষার নামে ‘ডিএনএ স্যাম্পল’ সংগ্রহ করে টিস্যু ম্যাচিং করত।
এই অঙ্গপাচার চক্রের বিরুদ্ধে গত কয়েক বছরে সৌদি আরব, কুয়েত এবং বাংলাদেশ তিনটি দেশই আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। তবে বাস্তবচিত্র বলছে, বিচারের তুলনায় বিচারহীনতার কাহিনি অনেক দীর্ঘ। সৌদিতে এই অপরাধে এখন পর্যন্ত পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, ৩৮ জনকে ১৫ থেকে ২৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে, আর শরিয়া আইনের আওতায় তিনজন অপরাধীর হাত কেটে দেওয়া হয়েছে। কুয়েতে দেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ ১৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ দিনার পর্যন্ত জরিমানা। সংখ্যাগুলো কঠোরতার ইঙ্গিত দেয়, কিন্তু তবু এই অপরাধ পুরোপুরি থামেনি।
বাংলাদেশে ২০১২ সালের মানব পাচার দমন আইন অনুযায়ী এই অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান থাকলেও এখনো পর্যন্ত কোনো ডাক্তারকে দেশে আইনি শাস্তি দেওয়া হয়নি। বিদেশ থেকে ফেরত আসা এসব অপরাধীর অনেকে ঘুষ দিয়ে আইনি ফাঁক গলে মুক্ত রয়েছেন বলে অভিযোগ আছে। কেউ কেউ আবার আলিশান ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার খুলে নির্বিঘ্নে পেশা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ক্ষতিপূরণের ক্ষেত্রেও বৈষম্য স্পষ্ট। সৌদি ও কুয়েত সরকার ভুক্তভোগীদের জন্য ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠন করলেও, বাস্তবে খুব অল্পসংখ্যক মানুষ সেই সহায়তা পেয়েছেন। বহু বাংলাদেশি শিকার অভিযোগ করেন, শারীরিকভাবে ভেঙে পড়ার পরও তাঁরা চিকিৎসা, পুনর্বাসন বা আর্থিক সহায়তা কোনোটিই পাননি। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কোনো ক্ষতিপূরণ এখনও বাস্তবায়ন হয়নি।
এই প্রক্রিয়ায় আইনি জটিলতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মাইগ্রেন্ট রাইটস নামক মানবাধিকার সংস্থার মতে, সৌদি আদালত থেকে ক্ষতিপূরণ পেতে গড়ে তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। এই দীর্ঘ অপেক্ষার প্রহরে আর্থিক সংকটে, চিকিৎসার অভাবে, অনেক শিকারই মারা গেছেন। বিচারব্যবস্থার এই ধীর গতি অনেকের কাছে যেন আরেক দফা মৃত্যুদণ্ডের মতো।
সৌদি আরব থেকে ফেরত আসা অন্তত ১২৮ জন বাংলাদেশি শ্রমিকের উপর পরিচালিত এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, তাদের মধ্যে ৭২ শতাংশ এখন কিডনি জনিত জটিল রোগে ভুগছেন। যারা একদিন বিদেশে গিয়েছিলেন পরিবারের ভাগ্য বদলানোর আশায়, তাঁদের অনেকে আজ নিজ বাড়ির এক কোণে শরীরে অপারেশনের ক্ষতচিহ্ন আর মনে গভীর অনিশ্চয়তা নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে প্রতিদিন সূর্য অস্ত যায়। কিন্তু এইসব মানুষের জীবনে যে অন্ধকার নামে, তা সন্ধ্যার মতো স্বল্পস্থায়ী নয়। সেটি থেকে যায়। কারও পেটে সেলাই হয়ে, কারও শ্বাসকষ্টে, কারও দুর্বলতায়, কারও পরিবারের ভাঙনে, কারও স্ত্রীর চোখে, কারও মায়ের দীর্ঘশ্বাসে।
এই লেখা তাঁদের জন্য, যারা ফিরে এসেও আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারেননি। এই লেখা তাঁদের জন্য, যাদের শরীরে ক্ষত আছে কিন্তু কণ্ঠস্বর নেই। এই লেখা তাঁদের জন্যও, যারা আর ফেরেননি, এবং যাদের পরিবার আজও জানে না, প্রবাসে তাদের প্রিয় মানুষটির মৃত্যুর আগে তার শরীরের ভেতরে আসলে কী ঘটেছিল।
বি. দ্র. এই প্রতিবেদনে কয়েকজন ভুক্তভোগী, অভিযুক্ত এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম আইনি ও নিরাপত্তাজনিত কারণে পরিবর্তিত বা কল্পিত আকারে ব্যবহার করা হয়েছে। তবে ঘটনাগুলোর ধরন, অভিযোগের কাঠামো এবং বর্ণিত পদ্ধতি অনুসন্ধান, সাক্ষ্য, মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ এবং প্রাপ্ত তথ্যের আলোকে নির্মিত।
তথ্যসূত্র:
World Health Organization, Transplantation (১২ এপ্রিল ২০২২)
UNODC, Global Report on Trafficking in Persons 2024
Migrant-Rights.org (১৬ এপ্রিল ২০২৫)
U.S. Department of State, 2025 Trafficking in Persons Report: Saudi Arabia









