
নিউইয়র্ক শহরের কুইন্সের উডসাইড। ২৯ মার্চ রোববার রাত প্রায় ১১টা ৫৫ মিনিট। নিশাত জান্নাত নামে ১৯ বছর বয়সী এক বাংলাদেশি তরুণী ৬২ স্ট্রিটের ক্রসওয়াক দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছিলেন। ঠিক সেই সময় পশ্চিমমুখী রুজভেল্ট অ্যাভিনিউ ধরে আসা রয়্যাল ওয়েস্ট সার্ভিসেসের একটি গারবেজ ট্রাক ডান দিকে মোড় নিতে গিয়ে তাকে ধাক্কা দেয়। জরুরি চিকিৎসাকর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও নিশাতকে সেখানেই মৃত ঘোষণা করা হয়।
ট্রাকটির ৩৮ বছর বয়সী নারী চালক ঘটনাস্থলেই ছিলেন। নিউইয়র্কের আইন অনুযায়ী, এ ধরনের ঘটনায় চালকের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ফৌজদারি অভিযোগ আনা সহজ নয়, যদি না নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো, ইচ্ছাকৃত আঘাত বা গুরুতর বেপরোয়া আচরণের প্রমাণ মেলে। তবে নিশাত ক্রসওয়াক দিয়েই রাস্তা পার হচ্ছিলেন বলে পথচারীর অগ্রাধিকার (Right of Way) লঙ্ঘিত হয়েছে কি না, সেটি তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে। নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের হাইওয়ে ডিস্ট্রিক্টের কলিশন ইনভেস্টিগেশন স্কোয়াড ঘটনাটি তদন্ত করছে।
নিশাতের বাসা ছিল দূর্ঘটনাস্থল থেকে মাত্র কয়েক মিনিটের পথ। কাজ শেষে তিনি উডসাইড স্টেশনে নেমেছিলেন। তার কর্মস্থল ছিল জ্যামাইকার পারসন্স বুলেভার্ডে একটি পার্কিং গ্যারেজ, যেখানে তিনি পার্ট টাইম রিসেপশনিস্ট হিসেবে কাজ করতেন। প্রতিদিনের মতো সেদিনও তিনি কাজ সেরে বাড়ি ফিরছিলেন, কিন্তু সেই পরিচিত পথই শেষ পর্যন্ত তার জীবনের শেষ যাত্রাপথ হয়ে ওঠে।
বাসার ভেতরে তখন অপেক্ষা করছিলেন বড় বোন নওশিন জান্নাত। রাত বাড়ছিল, কিন্তু নিশাত ফিরছিলেন না। ফোনে কল যাচ্ছিল, তবু সাড়া মিলছিল না। উদ্বেগ ধীরে ধীরে আশঙ্কায়, আর আশঙ্কা আতঙ্কে রূপ নিচ্ছিল। রাত প্রায় দুটোর দিকে নওশিন ফোনের লোকেশন ট্র্যাক করে ছুটে যান সেই মোড়ে। মা বাবাকে নিয়ে সেখানে পৌঁছে তিনি দেখেন চারদিক ঘিরে রয়েছে পুলিশের গাড়ি, ঝলসানো নীল আলো, আর এক অসহনীয় সত্য। যার জন্য এতক্ষণ অপেক্ষা করছিলেন, সেই বোনটি তখন আর বেঁচে নেই।
নওশিনের বয়ানে যে নিশাতের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে, তা গভীরভাবে স্পর্শ করে। তিনি বলেছেন, নিশাত ছিল অসম্ভব আশাবাদী, আধ্যাত্মিক এক মেয়ে। সে মানুষকে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে বলত, আশা হারাতে নিষেধ করত। জীবনের অনিশ্চয়তা নিয়ে তার কথা ছিল, মৃত্যু যেকোনো সময় আসতে পারে, তাই বর্তমানকে ভালোবেসে বাঁচতে হয়। আজ সেই কথাগুলো আরও বেশি বেদনাদায়ক হয়ে ফিরে আসে। কারণ যে মেয়েটি অন্যকে বর্তমান মুহূর্তের মূল্য বুঝতে শিখিয়েছিল, তার নিজের জীবনই থেমে গেল ঘরে ফেরার ঠিক আগে, একটি ব্যস্ত রাস্তার মোড়ে।
সেই রাতের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দিকটি হলো, নিশাতের হাতে ছিল একটি কেক। ছোট বোনের জন্য কেনা সেই কেকের কথাই এখন এই দুর্ঘটনার সবচেয়ে হৃদয়বিদারক স্মৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিশাত ছিলেন চার বোনের একজন। বড় বোন নওশিনের বয়স ২১। দুই ছোট বোনের একজনের বয়স ৯, আরেকজনের মাত্র ৪। যে ছোট বোনের জন্য কেক নিয়ে ফিরছিলেন, সে হয়তো এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি কেন তার আপা ঘরে ফিরছে না।
নিশাতের বাবা হেলাল আহমদ উডসাইডের বায়তুল জান্নাহ মসজিদের ইমাম। কমিউনিটিতে তিনি ধর্মীয় ও মানবিক আস্থার এক পরিচিত মুখ। প্রতিদিন যিনি অন্যের শোকের সময় সান্ত্বনার কথা বলেন, মৃত্যুর মুখোমুখি পরিবারকে ধৈর্য ধরতে উপদেশ দেন, তাকেই আজ দাঁড়াতে হয়েছে নিজের সন্তানের মৃত্যুতে ভেঙে পড়া এক অসহনীয় বাস্তবতার সামনে।
হেলাল আহমেদের পরিবারটি ২০১৭ সালে অভিবাসী ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে আসে। তাদের দেশের বাড়ি সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঢাকা দক্ষিণের রায়গড় গ্রামে। নতুন দেশে এসে পরিবারটি স্বপ্ন দেখেছিল স্থিতি, সন্তানদের পড়াশোনার সুযোগ, নিরাপদ ভবিষ্যৎ এবং সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার। সেই স্বপ্নের উজ্জ্বল অংশ ছিল নিশাত। তিনি কাজ করতেন, নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা করতেন, সংসারে সাধ্যমতো হাত বাড়িয়ে দিতেন, আর ছোট বোনদের প্রতিও ছিল তার গভীর দায়িত্ববোধ।
এই ঘটনার আইনি দিকও এখন গুরুত্ব পাচ্ছে। নিশাতের পরিবার চাইলে সিভিল কোর্টে ‘Wrongful Death’ অর্থাৎ অবহেলা বা দায়িত্বে গাফিলতির কারণে মৃত্যুর অভিযোগে মামলা দায়ের করতে পারবে। তদন্তে যদি চালকের অবহেলা, নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘন বা ট্রাকের যান্ত্রিক ত্রুটির প্রমাণ মেলে, তবে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে ক্ষতিপূরণ দিতে হতে পারে। তবে পরিবারের কাছে এই ক্ষতিপূরণ তাদের প্রিয় কন্যার প্রাণের বিনিময়ে তুচ্ছ।
এই মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত শোক হয়ে থাকেনি। খবরটি ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই উডসাইড, জ্যাকসন হাইটস এবং বৃহত্তর নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে গভীর শোক নেমে আসে। কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ নিশাতের স্মৃতিতে ওই মোড়ে একটি স্থায়ী স্মারক স্থাপনের দাবি তুলেছেন। তাদের বক্তব্য, এই ঘটনা কেবল একটি সড়ক দুর্ঘটনা নয়, বরং ব্যস্ত নগরজীবনে পথচারীর নিরাপত্তাহীনতা এবং এক অভিবাসী পরিবারের ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের নির্মম উদাহরণ।
তথ্যসূত্র:
New York Post (৩০ মার্চ ২০২৬)
NYPD (৩০ মার্চ ২০২৬)









