মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর স্থল অভিযানের শঙ্কা এবং ইরানের অপ্রতিসম যুদ্ধকৌশল

তেহরান, ২৯ মার্চ – মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম তাদের ওয়েবসাইটে ইরানে পরিচালিত সামরিক অভিযানের বিভিন্ন তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করে আসছে। সেখানে হামলার সংখ্যা ব্যবহৃত অস্ত্রের ধরন এবং লক্ষ্যবস্তুর প্রকৃতি কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম থেকে শুরু করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কেন্দ্র পর্যন্ত বিস্তারিতভাবে তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে। তবে এই প্রকাশিত তালিকার বাইরে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অজানা রয়ে গেছে।
নির্দিষ্ট কোন স্থাপনায় হামলা হয়েছে কী ধরনের গোলাবারুদ ব্যবহার করা হয়েছে বা অভিযানের কার্যকারিতা মূল্যায়নে ব্যবহৃত ব্যাটল ড্যামেজ অ্যাসেসমেন্ট এর বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। সামরিক বাহিনী সাধারণত রণক্ষেত্রের পূর্ণাঙ্গ তথ্য বা উপগ্রহচিত্র প্রকাশ করে না এবং এটি অত্যন্ত স্বাভাবিক বিষয়। তবে বিশ্লেষকদের মতে এই তথ্য অস্পষ্টতার পেছনে ভিন্ন একটি বাস্তবতা রয়েছে। তারা মনে করেন কেবল আকাশপথে হামলার মাধ্যমে সীমিত সাফল্যের চেয়ে বেশি কিছু অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন। ওয়াশিংটনভিত্তিক স্টিমসন সেন্টারের সিনিয়র ফেলো ও আকাশযুদ্ধ বিশেষজ্ঞ ড. কেলি গ্রিকো ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজকে জানিয়েছেন সেন্টকমের লক্ষ্যবস্তুর তালিকাই আকাশপথের সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরছে। এই সীমাবদ্ধতার কারণেই বারবার বুটস অন দ্য গ্রাউন্ড বা স্থল সেনা মোতায়েনের প্রসঙ্গটি সামনে আসছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা এবং জ্বালানি স্থাপনায় হামলা স্থগিত রাখার কথা বললেও বাস্তবে মার্কিন স্থলবাহিনী ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান করছে। ড. গ্রিকোর মতে দুটি মেরিন এক্সপিডিশনারি ইউনিটে প্রায় ৫ হাজার সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্তই এই পরিস্থিতির গভীরতা বোঝায়। অন্যদিকে নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে পেন্টাগন অতিরিক্ত প্রায় ২ হাজার প্যারাট্রুপার মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছে। এরা ইমিডিয়েট রেসপন্স ফোর্সের অংশ হিসেবে ১৮ ঘণ্টার মধ্যে যেকোনো স্থানে পৌঁছাতে সক্ষম। সব মিলিয়ে ইরানকেন্দ্রিক এই অভিযানে বর্তমানে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা নিযুক্ত রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্থলবাহিনীর সম্ভাব্য লক্ষ্য কী হবে সেই প্রশ্নের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে আরেকটি গুরুতর উদ্বেগ। বিশেষজ্ঞরা একে ইরানি ফাঁদ হিসেবে উল্লেখ করছেন।
একই সঙ্গে এমন একটি যুদ্ধে মার্কিন জনগণের অনীহাও নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপন্সিবল স্টেটক্রাফট এর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো উইলিয়াম হার্টুং মনে করেন ইরানে স্থল অভিযান শুরু হলে ইরাক যুদ্ধকেও তুলনামূলকভাবে অনেক সহজ বলে মনে হবে। ড. গ্রিকোর মতে মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি স্থলযুদ্ধে মার্কিন জনমত এবং এমনকি ট্রাম্পের সমর্থকরাও কোনোভাবেই সমর্থন দেবে না। তিনি উল্লেখ করেন গত দুই দশকে ইরাক ও আফগানিস্তানে প্রাণহানি বিপুল ব্যয় এবং কৌশলগত ক্ষতির তিক্ত অভিজ্ঞতা যুক্তরাষ্ট্রকে ক্লান্ত করে তুলেছে।
যুদ্ধবিরোধী অবস্থান নিয়েই ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেছিলেন এবং এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। বিশ্লেষকদের মতে ইরানে সম্ভাব্য স্থল অভিযানের দুটি প্রধান লক্ষ্য থাকতে পারে এবং এর উভয়ই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রথমটি হলো ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খারগ দ্বীপ দখল করা। তবে গ্রিকোর মতে ইরান দীর্ঘদিন ধরেই এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে এবং ওই অঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনী খুব সহজেই ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। এমনকি দ্বীপটি দখল করা গেলেও ইরান তাদের সামরিক সক্ষমতা স্থলভাগের গভীরে সরিয়ে নিতে পারে এবং দীর্ঘ উপকূলজুড়ে পাল্টা হামলা চালাতে পারে। এতে সংঘাত আরও জটিল আকার ধারণ করবে।
দ্বিতীয় সম্ভাব্য লক্ষ্য হতে পারে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করা বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া। যদিও আকাশ হামলায় এসব স্থাপনা সাময়িকভাবে অচল করা সম্ভব তবে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা বা পুনর্গঠন রোধ করা বেশ কঠিন। এটি স্থল অভিযানের পক্ষে একটি যুক্তি তৈরি করে কিন্তু একই সঙ্গে এর ঝুঁকি ও ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ শক্তির চরম আধিপত্য সত্ত্বেও ইরান টিকে থাকার পেছনে মূল কারণ হলো তাদের অপ্রতিসম যুদ্ধ কৌশল।
ড. গ্রিকোর মতে ইরানের প্রধান লক্ষ্য প্রতিপক্ষকে সরাসরি পরাজিত করা নয় বরং দীর্ঘমেয়াদে ক্লান্ত করে ফেলা। এই কৌশলে আক্রমণকারী পক্ষকে প্রতিটি মোবাইল লঞ্চ সিস্টেম খুঁজে বের করতে হয় যেখানে প্রতিরক্ষাকারীর জন্য অল্প কিছু অস্ত্র গোপন রাখাই যথেষ্ট বলে বিবেচিত হয়। অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই সম্ভাব্য যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল। উইলিয়াম হার্টুং বলেন মাত্র কয়েক হাজার ডলারের ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করতে যুক্তরাষ্ট্রকে কয়েক মিলিয়ন ডলারের ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হচ্ছে।
এর ফলে ব্যয়ের বোঝা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বাড়ছে। ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে ড. গ্রিকো ও তার সহকর্মীরা হাইব্রিড এয়ার ডিনায়াল এর ধারণাটি সামনে এনেছেন। এর লক্ষ্য আকাশসীমা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা নয় বরং প্রতিপক্ষের জন্য সেটিকে অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলা। এই কৌশলের অংশ হিসেবে সস্তা ড্রোন দিয়ে বিমানবন্দর অচল করা সমুদ্রপথে বিঘ্ন ঘটানো এবং বেসামরিক জীবনে অস্থিরতা সৃষ্টি করে রাষ্ট্রের ওপর সাধারণ জনগণের আস্থা দুর্বল করে দেওয়া ইরানের সম্ভাব্য পরিকল্পনার অংশ হতে পারে। পেন্টাগনের তথ্য গোপন রাখা এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সামগ্রিক কৌশল নিয়েও ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে।
হার্টুংয়ের মতে পরিস্থিতিকে সহজ মনে করা হলেও বাস্তবে এটি একটি বিস্তৃত আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়া ও চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলোও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে যে ইরান কীভাবে মার্কিন আধুনিক প্রযুক্তির মোকাবিলা করছে। সবশেষে একটি বড় প্রশ্ন থেকে যায় আর তা হলো এই সংঘাতের পর মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ আসলে কী হবে।
গ্রিকোর মতে দুর্বল ইরান মানেই অনুগত ইরান এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। বরং টিকে থাকা শাসনব্যবস্থা আরও কঠোর হতে পারে এবং পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের দিকে আরও বেশি করে ঝুঁকতে পারে। আব্রাহাম অ্যাকর্ডস যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েল নিরাপত্তা সম্পর্ক এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের কৌশলগত ভারসাম্য নিয়ে যখন গভীর আলোচনার প্রয়োজন ঠিক তখন তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক লাভের আশায় যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়াই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে। গ্রিকোর মতে যুদ্ধোত্তর কৌশল নিয়ে স্পষ্ট পরিকল্পনার অভাবই বর্তমান মার্কিন নীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
এ এম/ ২৯ মার্চ ২০২৬









