জাতীয়

খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে উদ্বেগ: বিশ্বব্যাংকের ‘লাল তালিকায়’ বাংলাদেশ

ঢাকা, ২৫ মার্চ – বাংলাদেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি নতুন করে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যমতে, উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতির কারণে বিশ্বব্যাংকের ঝুঁকিপূর্ণ দেশের লাল তালিকায় প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। দীর্ঘ সময় ধরে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়তে থাকায় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় এর নেতিবাচক প্রভাব অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠছে। বিশ্বব্যাংক গত বছরের নভেম্বর পর্যন্ত বৈশ্বিক খাদ্য মূল্যস্ফীতির চিত্র প্রকাশ করেছিল। তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বা বিবিএস ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত নিজেদের হালনাগাদ তথ্য জনসমক্ষে এনেছে। বিবিএসের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে দেশের খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ।

এই হার গত ১৩ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৭২ শতাংশ। পরবর্তী সময়ে তা কিছুটা কমে এলেও সাম্প্রতিক পাঁচ মাস ধরে ধারাবাহিকভাবে এই হার ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। একই সময়ে খাদ্যবহির্ভূত খাতেও মূল্যস্ফীতি ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। ফেব্রুয়ারি মাসে এই খাতে মূল্যস্ফীতি রেকর্ড করা হয়েছে ৯ দশমিক ১ শতাংশ। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের ওপর সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে। কারণ এই শ্রেণির মানুষের আয়ের সিংহভাগই ব্যয় হয় দৈনন্দিন খাদ্যের পেছনে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের মোট আয়ের দুই তৃতীয়াংশ পর্যন্ত কেবল খাবার কিনতেই চলে যায়।

ফলে খাদ্যের দাম সামান্য বৃদ্ধি পেলেও তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বিশাল প্রভাব পড়ে। এক বছর আগে যে পরিমাণ খাবার কিনতে ১০০ টাকা খরচ হতো, বর্তমানে একই পরিমাণ খাবার কিনতে ১০৯ টাকা ৩০ পয়সা গুনতে হচ্ছে। এই বাড়তি খরচের ধাক্কা সামাল দিতে গিয়ে বহু পরিবারকে বাধ্য হয়ে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। পাশাপাশি অনেকেই তাদের দৈনন্দিন খাবারের তালিকা ছোট করতে বাধ্য হচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের অভিমত অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি অনেকটা অদৃশ্য কর হিসেবে কাজ করে। সাধারণ মানুষের আয় স্থির থাকলেও ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতি বজায় থাকলে দেশে দারিদ্র্য বৃদ্ধি এবং পুষ্টিহীনতার চরম ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশে গত তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি তুলনামূলকভাবে বেশ চড়া পর্যায়ে রয়েছে। এত দীর্ঘ সময় ধরে এমন সংকটজনক পরিস্থিতি অতীতে খুব একটা দেখা যায়নি। ফলশ্রুতিতে নিম্ন আয়ের মানুষের ভোগান্তি এখন দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতির দেশগুলোকে ঝুঁকির মাত্রার ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন রঙে ভাগ করা হয়ে থাকে। এর মধ্যে বেগুনি শ্রেণি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এবং লাল শ্রেণি উচ্চঝুঁকির নির্দেশক। বাংলাদেশ বর্তমানে এই লাল তালিকায় অবস্থান করছে যা দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির একটি গুরুতর দিক নির্দেশ করে। একই সময়ে বিশ্বের আরো কয়েকটি দেশের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়।

আফ্রিকার দেশ মালাউয়ি টানা নয় মাস ধরে বেগুনি শ্রেণিতে রয়েছে। ইরান ও জাম্বিয়া আট মাস এবং তুরস্ক ও আর্জেন্টিনা সাত মাস ধরে এই উচ্চঝুঁকির তালিকায় অবস্থান করছে। অন্যদিকে বিশ্বের কিছু দেশ নিজেদের পরিস্থিতির উন্নতি ঘটিয়ে লাল বা বেগুনি থেকে হলুদ কিংবা সবুজ তালিকায় উঠে আসতে সক্ষম হয়েছে। সার্বিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, খাদ্য মূল্যস্ফীতির এই ঊর্ধ্বগতি কেবল অর্থনীতির একটি সাধারণ সূচক নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন টিকে থাকার লড়াইয়ের ওপর সরাসরি আঘাত হানছে। আয় না বাড়লেও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়তে থাকায় সাধারণ জনগণকে ক্রমেই এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এই সংকটজনক পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের তরফ থেকে দ্রুত ও কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন।

এস এম/ ২৫ মার্চ ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language