মধ্যপ্রাচ্য

ইরানের সঙ্গে সংঘাতে ১৬টি সামরিক বিমান হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

তেহরান, ২০ মার্চ – ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র অন্তত ১৬টি সামরিক বিমান হারিয়েছে। ব্লুমবার্গের একটি প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী শত্রুপক্ষের গুলিতে ১০টি রিপার স্ট্রাইক ড্রোন বিধ্বস্ত হয়েছে এবং হামলা বা দুর্ঘটনার কারণে আরও প্রায় ছয়টি বিমান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনাটি ঘটেছে কুয়েতে। সেখানে মার্কিন বাহিনী ভুলবশত নিজেদের গুলিতেই তিনটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে। একই সঙ্গে মাঝআকাশে জ্বালানি ভরার সময় একটি কেসি-১৩৫ ট্যাংকার ধ্বংস হয়। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ট্যাংকারটির ছয়জন ক্রু সদস্য প্রাণ হারান। এ ছাড়া সৌদি আরবের একটি বিমানঘাঁটিতে পার্ক করে রাখা অবস্থায় ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আরও পাঁচটি কেসি-১৩৫ বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে এখন পর্যন্ত ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেবল চালকবিহীন রিপার ড্রোনগুলোকেই ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে। আকাশে উড্ডয়নরত অবস্থায় অন্তত নয়টি ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে। জর্ডানের একটি বিমানঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে একটি ড্রোন বিধ্বস্ত হয় এবং অন্য দুটি রিপার ড্রোন দুর্ঘটনার কবলে পড়ে ধ্বংস হয়ে যায়।

মূলত উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি চালানোর জন্যই এই ড্রোনগুলো তৈরি করা হয়েছিল। কারণ এগুলোতে কোনো পাইলট থাকে না এবং অন্যান্য যুদ্ধবিমানের তুলনায় এগুলোর পরিচালনা ব্যয় অনেক কম। অন্যদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ইরানে একটি সামরিক অভিযান শেষ করার পর জরুরি অবতরণ করতে বাধ্য হয়। মধ্যপ্রাচ্যের দায়িত্বে থাকা মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স জানিয়েছেন বিমানটি নিরাপদে অবতরণ করতে সক্ষম হয়েছে এবং এর পাইলট সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন।

সিএনএন তাদের প্রতিবেদনে দাবি করেছে যে ইরানের ছোড়া গুলিতেই বিমানটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন রেভল্যুশনারি গার্ডের একটি বিবৃতি উদ্ধৃত করে জানিয়েছে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আঘাতেই একটি মার্কিন এফ-৩৫ বিমান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে ক্যাপ্টেন হকিন্স এই বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান এবং উল্লেখ করেন যে পুরো ঘটনাটি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে।

কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিসের ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী স্টিলথ প্রযুক্তির এই অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানগুলোর প্রতিটির নির্মাণ ব্যয় প্রায় ৭ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার। প্রায় এক দশক আগে সামরিক বাহিনীতে যুক্ত হওয়ার পর থেকে এগুলো নিয়মিত যুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে এর আগে কখনো শত্রুপক্ষের হামলায় কোনো এফ-৩৫ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন ইরান ৩৫৮ মডেলের ইনফ্রারেড নির্দেশিত ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে।

ছোট ও বহনযোগ্য উৎক্ষেপক থেকে ছোড়া এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ২৫ হাজার ফুট উচ্চতা পর্যন্ত নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। রাডার ব্যবস্থা না থাকায় এগুলো ধেয়ে আসার সময় বিমানগুলো কোনো সতর্কবার্তা পায় না। গত বছর ইয়েমেনে চালানো অভিযানের সময়ও এগুলো মার্কিন বিমানবাহিনীর জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করেছিল।

২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের লিবিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপের সময় চার মাসে মাত্র তিনটি যুদ্ধকালীন ক্ষতির খবর পাওয়া গিয়েছিল। সেগুলোর মধ্যে একটি ছিল মার্কিন নৌবাহিনীর ড্রোন। রয়্যাল অস্ট্রেলিয়ান এয়ার ফোর্সের সাবেক কর্মকর্তা এবং গ্রিফিথ এশিয়া ইনস্টিটিউটের ভিজিটিং ফেলো পিটার লেটন মনে করেন সামরিক অভিযানের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণেই তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটছে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো আলোচনা করতে রাজি হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করা। তবে তারা তা সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করতে বা আকাশপথে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়নি।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত তেরোজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ছয়জন কেসি-১৩৫ বিমান দুর্ঘটনায় এবং সাতজন যুদ্ধের শুরুতে ইরানি হামলায় প্রাণ হারান।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী মধ্যপ্রাচ্যের সাতটি দেশে প্রায় ২০০ জন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন এবং তাদের বেশিরভাগই চিকিৎসা শেষে নিজ নিজ দায়িত্বে ফিরে গেছেন।

এ এম/ ২০ মার্চ ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language