এশিয়া

সেনা অভ্যুত্থানের পর প্রথমবারের মতো বসল মিয়ানমার পার্লামেন্ট

নেপিডো, ১৬ মার্চ – মিয়ানমারে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর প্রথমবারের মতো সোমবার পার্লামেন্ট অধিবেশন শুরু হয়েছে। এএফপির সংবাদকর্মীরা জানিয়েছেন, সেনা সমর্থিত বিতর্কিত নির্বাচনে জয়ী হওয়া জান্তাপন্থী আইনপ্রণেতারা এই অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন।

বর্তমান সংসদের অধিকাংশ সদস্যই সামরিকপন্থী রাজনৈতিক দল ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি বা ইউএসডিপি থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। এর বাইরে বাকি সদস্যদের বড় অংশ সরাসরি সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিনিধিত্ব করছেন। দেশটির সংবিধান অনুযায়ী সংসদের এক চতুর্থাংশ আসন সামরিক বাহিনীর জন্য সংরক্ষিত রয়েছে। সোমবার সকালে পিপলস অ্যাসেম্বলিতে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয় এবং ইউএসডিপি নেতা খিন ই স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত হন।

উল্লেখ্য, ২০২০ সালের সাধারণ নির্বাচনে অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন দল বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল। তবে সামরিক জান্তা ব্যাপক ভোট জালিয়াতির অভিযোগ তুলে সেই নির্বাচনের ফলাফল সম্পূর্ণ বাতিল করে দেয়। পরবর্তীতে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী নেত্রী সু চিকে কারাবন্দি করা হয় এবং তার রাজনৈতিক দল ভেঙে দেওয়া হয়। এর ফলে পুরো দেশটি এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।

সামরিক শাসনের অধীনে থাকার পর জান্তা সরকার গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে ধাপে ধাপে একটি পুনর্নির্বাচনের আয়োজন করে। তবে গণতন্ত্রপন্থী পর্যবেক্ষকদের মতে, এই নির্বাচন প্রক্রিয়ায় যেকোনো ধরনের সমালোচনা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল এবং ব্যালট পেপারে মূলত জান্তার বেসামরিক মিত্রদেরই একচেটিয়া প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল। এদিকে জান্তা সমর্থিত আইনপ্রণেতারা যখন সংসদে অধিবেশনে যোগ দিয়েছেন, ঠিক তখনই ২০২০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী এবং বর্তমানে নির্বাসিত বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য একটি সমান্তরাল অধিবেশন আয়োজন করেন।

তারা দাবি করেন, তাদের গঠিত ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট বা এনইউজি এখনো মিয়ানমারের একমাত্র বৈধ নেতৃত্ব। এই ছায়া সরকারের ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দুয়া লাশি লা একটি অনলাইন বৈঠকে অংশ নিয়ে বলেন, জান্তা সরকার এই ভুয়া নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতারণামূলক প্রতিনিধিত্ব তৈরি করে সাধারণ জনগণকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, অভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্ত এই গোষ্ঠী যেকোনো উপায়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি আদায়ের চেষ্টা করছে। তাই এটিকে কোনোভাবেই একটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।

মিয়ানমারের যেসব বিশাল এলাকা বর্তমানে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সেখানে কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, নবনির্বাচিত এই সংসদ সদস্যরা মূলত সামরিক বাহিনীর স্বার্থেরই প্রতিনিধিত্ব করছেন এবং তাদের এই উপস্থিতির মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক শাসনকে একটি আইনি ও বৈধতার আবরণ দেওয়ার প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং খুব শিগগিরই সামরিক পোশাক পরিবর্তন করে বেসামরিক প্রেসিডেন্টের পদ গ্রহণ করার পরিকল্পনা করছেন।

এর মাধ্যমে আগামী মাসে নতুন সরকার গঠিত হলে তিনি সরাসরি নেতৃত্ব প্রদানের সুযোগ পাবেন। নিয়ম অনুযায়ী পার্লামেন্টের উভয় কক্ষের ভোটে দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। আর বর্তমান পার্লামেন্টের প্রায় সব সদস্যই সামরিক বাহিনীর অন্ধ সমর্থক অথবা সরাসরি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য। সোমবারের সংক্ষিপ্ত অধিবেশন শেষে নবনির্বাচিত স্পিকার খিন ই সংবাদমাধ্যম এএফপিকে জানান, পরবর্তী প্রেসিডেন্ট কে হবেন তা এই মুহূর্তে অনুমান করা পুরোপুরি অসম্ভব।

এদিন সকালে হালকা সবুজ রঙের সামরিক পোশাক পরিহিত সেনা সদস্যরা সংসদীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করার জন্য দীর্ঘ ভিড় জমান। তবে তারা সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কোনো কথা বলতে বা সাক্ষাৎকার দিতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানান। অন্যদিকে, এএফপির সংবাদকর্মীরা পুরো সংসদ ভবনের কোথাও জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইংকে দেখতে পাননি।

এ এম/ ১৬ মার্চ ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language