হরমুজ প্রণালী বন্ধের জেরে বিপাকে যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত চরমে

তেহরান, ১৪ মার্চ – ইরানে হামলা শুরু হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছিলেন এই যুদ্ধ খুব দ্রুত শেষ হবে। কিন্তু দুই সপ্তাহের বেশি সময় পার হলেও পরিস্থিতির কোনো দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি, বরং সংঘাত আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরের সূত্রগুলোর মতে হামলার পরিকল্পনাকালে ইরানের হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার সম্ভাবনা বা এর প্রভাব যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। এর ফলে বর্তমানে জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হামলার পর ইরানের পাল্টা আঘাত কেবল ইসরায়েলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। উপসাগরীয় যেসব দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, সেসব এলাকাতেও হামলার ঘটনা ঘটেছে এবং পরে তা বেসামরিক স্থাপনা পর্যন্ত গড়ায়। এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরব তাদের একটি তেল শোধনাগার বন্ধ করে দিয়েছে এবং কাতার গ্যাস উৎপাদন স্থগিত করেছে। পাশাপাশি ইরাক, ওমান ও বাহরাইনেও তেল স্থাপনায় হামলার খবর পাওয়া গেছে। ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে গিয়ে এসব দেশের আকাশ প্রতিরক্ষার সক্ষমতাও দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। ফলে ইউরোপের কয়েকটি দেশ ওই অঞ্চলে আকাশ প্রতিরক্ষায় সহায়তা করতে এগিয়ে এসেছে।
পেন্টাগন জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়া থেকে টার্মিনাল হাই অল্টিচিউড এরিয়া ডিফেন্স বা থাড সিস্টেমের একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নিচ্ছে। সিএনএনের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ট্রাম্প প্রশাসনের জাতীয় নিরাপত্তা দল সম্ভাব্য পরিণতি পুরোপুরি বিবেচনা করতে ব্যর্থ হয়েছে। অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এবং জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট যুদ্ধ পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন বলে সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে। এর আগে সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনসহ পূর্ববর্তী প্রশাসনগুলো হরমুজ প্রণালী নিয়ে যে বিশ্লেষণ ও পূর্বাভাস দিয়েছিল, তা উপেক্ষা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। রিপাবলিকান এবং ডেমোক্রেটিক প্রশাসনে কাজ করা এক সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা এ নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে জানিয়েছেন, এমন পরিস্থিতি মোকাবিলা করা বহু বছর ধরে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ছিল।
এদিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালী বন্ধই থাকবে। এর ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে কবে নাগাদ স্বাভাবিক পণ্য পরিবহন শুরু হবে, তা নিয়ে ব্যাপক অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। সিএনএনের অপর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরানে হামলার পর ট্রাম্প বর্তমানে এমন এক যুদ্ধ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন যার নিয়ন্ত্রণ ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে। সামরিক দিক থেকে ইরান তুলনামূলকভাবে দুর্বল হলেও হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি নতুন কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। মার্কিন নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন লরেন্স ব্রেনান জানিয়েছেন, যদি হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করা না যায়, তবে কোনো পক্ষই নিজেদের বিজয়ী হিসেবে দাবি করতে পারবে না। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য প্রণালীটি পুনরায় চালু করা জরুরি হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তা মোটেও সহজ কাজ নয়।
সম্প্রতি ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হতে পারে। প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে সুরক্ষা প্রদান করবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। অন্যদিকে ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা চলমান যুদ্ধের দীর্ঘায়ন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত মূল্য দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত কয়েক দিনে বিভিন্ন হামলা ও পাল্টা হামলার জেরে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। আল জাজিরা জানিয়েছে, ইসরায়েলের বিরশেবায় একটি সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরানের ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে।
সিএনএনের তথ্যমতে, ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বহু মানুষ আহত হয়েছেন। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওমানে একটি ড্রোন বিধ্বস্ত হয়ে দুইজন নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন। দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, দুবাইয়ের আল কুজ এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ১৫ হাজারটি হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত এক হাজার ৪৪৪ জন নিহত এবং ১৮ হাজার ৫৫১ জন আহত হয়েছেন।
এস এম/ ১৪ মার্চ ২০২৬









