ইরানে মার্কিন সামরিক অভিযান ‘এপিক ফিউরি’: লক্ষ্য, সমরাস্ত্র ও ব্যয়ের খতিয়ান

ওয়াশিংটন, ৩ মার্চ – যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দীর্ঘদিনের স্নায়ুযুদ্ধ গত শনিবার এক নতুন ও ভয়াবহ মোড় নিয়েছে। এদিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে বিমান হামলা শুরু করার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাতের সূচনা হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে এই অভিযান অন্তত চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে। এমতাবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে মধ্যপ্রাচ্যে এই নতুন যুদ্ধের ব্যয়ভার বহন করার সক্ষমতা ওয়াশিংটনের আছে কি না এবং এর শেষ কোথায়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিশ্চিত করেন যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অভ্যন্তরে একটি বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করেছে। পেন্টাগন পরবর্তীতে এই মিশনের নাম দেয় অপারেশন এপিক ফিউরি। ট্রাম্পের ভাষ্যমতে এই অভিযানের মূল লক্ষ্য হলো ইরান যাতে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে তা নিশ্চিত করা। তিনি জানান তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শিল্পকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেবেন।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর তথ্যমতে শনিবার থেকে ইরানে এক হাজার আড়াইশোর বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে। সেন্টকম জানিয়েছে তারা ইরানের এগারোটি জাহাজ ধ্বংস করেছে। এই অভিযানে বিমান হামলা সমুদ্র থেকে উৎক্ষিপ্ত ক্রুজ মিসাইল এবং ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে সমন্বিত আক্রমণ চালানো হয়েছে।
সেন্টকমের তথ্যমতে এই অভিযানে ইতিমধ্যে তেহরানে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ পাঁচ শতাধিক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। সোমবার পর্যন্ত পাওয়া তথ্যমতে ইরানের একশো ত্রিশটি স্থানে হামলায় অন্তত পাঁচশো পঞ্চান্ন জন প্রাণ হারিয়েছেন। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির কস্টস অব ওয়ার রিপোর্ট অনুযায়ী ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে প্রায় একুশ দশমিক সাত বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা দিয়েছে। এছাড়া ইয়েমেন ইরান এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের সমর্থনে মার্কিন অভিযানে আরও নয় দশমিক ছয় পাঁচ থেকে বারো দশমিক শূন্য সাত বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে।
ফলে গত দেড় বছরে এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় একত্রিশ দশমিক তিন পাঁচ থেকে তেত্রিশ দশমিক সাত সাত বিলিয়ন ডলারে। সেন্টকমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী অপারেশন এপিক ফিউরি অভিযানে আকাশ জল স্থল এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিশটিরও বেশি সমরাস্ত্র প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। সেন্টকমের সাবেক অপারেশন ডিরেক্টর কেভিন ডনেগান জানান বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের মূল লক্ষ্য হলো ইরানের আক্রমণাত্মক সক্ষমতাকে যত দ্রুত সম্ভব দুর্বল করে দেওয়া।
এই অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপকভাবে তাদের আকাশপথের শক্তির ওপর নির্ভর করছে। বি ওয়ান বোমারু বিমান বি টু স্টিলথ বোমারু বিমান এবং এফ পঁয়ত্রিশ লাইটনিং টু এর মতো অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে এক মার্চ কুয়েতের আকাশে এক দুর্ঘটনায় তিনটি এফ পনেরো বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। এছাড়া প্রথমবারের মতো লুকাস ড্রোনের রণক্ষেত্রে ব্যবহার শুরু হয়েছে। সমুদ্রসীমায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড এবং ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন নামের দুটি বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন করা হয়েছে। একটি চলমান সামরিক অভিযানের মোট ব্যয় সুনির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন হলেও আনাদোলু নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী অপারেশন এপিক ফিউরির প্রথম চব্বিশ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের খরচ হয়েছে প্রায় সাতশো ঊনআশি মিলিয়ন ডলার। স্টিমসন সেন্টারের জ্যেষ্ঠ ফেলো ক্রিস্টোফার প্রিবল বলেন খরচের দিক থেকে এটি সামলানো সম্ভব হলেও বড় উদ্বেগের বিষয় হলো সমরাস্ত্রের মজুত। বিশেষ করে ব্যালিস্টিক মিসাইল ঠেকানোর জন্য ব্যবহৃত প্যাট্রিয়ট বা এসএম সিক্স এর মতো ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কতটুকু আছে সেটিই এখন মার্কিন প্রশাসনের মূল চিন্তার বিষয়।
এসএএস/ ৩ মার্চ ২০২৬









