সম্পাদকের পাতা

নিউইয়র্কে মরণনেশা ‘ওপিওড’ বাণিজ্যে নজরদারিতে বাংলাদেশি মালিকানাধীন অসাধু ফার্মেসি

নজরুল মিন্টো

মধ্যরাত। নিউইয়র্কের কুইন্সের একটি নির্জন ব্লকের মোড়ে অবস্থিত ছোট্ট একটি ফার্মেসি। দোকানের বাইরে কোনো ভিড় নেই, কিন্তু ভেতর থেকে টিমটিমে আলো বেরিয়ে আসছে। পেছনের দরজায় হুট করেই থামলো একটি কালো এসইউভি। কেবল একটি খাম হাতবদল হলো আর তার বিনিময়ে গাড়ির আরোহী পেলেন ছোট একটি প্লাস্টিকের কৌটা। কৌটার ভেতরে ভরা নীলচে রঙের ছোট ছোট পিল; যাকে রাজপথের ভাষায় বলা হয় ‘ব্লু গোল্ড’ বা অক্সিকোডোন।

দৃশ্যটি কোনো হলিউড থ্রিলারের খণ্ডচিত্র মনে হতে পারে, কিন্তু এটিই এখন নিউইয়র্কের অনেক অভিবাসী অধ্যুষিত এলাকার রূঢ় বাস্তবতা। ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (DEA) এর গোয়েন্দারা এখন এই নীল পিলের উৎস খুঁজতে গিয়ে পৌঁছে যাচ্ছেন কমিউনিটির পরিচিত কিছু মানুষের দুয়ারে। যারা দিনের আলোয় সাদা অ্যাপ্রোন পরে কমিউনিটির সেবা করেন, রাতের আঁধারে তারাই হয়ে উঠছেন ‘পিল মিল’ এর কারিগর।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই অবৈধ কারবার চলে একটি সুসংগঠিত ত্রিভুজ কাঠামোর মাধ্যমে। ডাক্তার, ফার্মেসি মালিক এবং ‘রানার’ বা দালাল। দালালরা গৃহহীন বা নিম্নবিত্ত মানুষদের সামান্য টাকার বিনিময়ে চিকিৎসকের কাছে পাঠায়। চিকিৎসক একটি ‘বোগাস’ বা ভুয়া প্রেসক্রিপশন লিখে দেন। সেই প্রেসক্রিপশন নিয়ে সোজা চলে আসা হয় নির্দিষ্ট ফার্মেসিতে। সেখানে ইন্সুরেন্স ব্যবহার না করে সরাসরি নগদ (Cash) ডলারে কেনা হয় সেই ওষুধ। একটি ৩০ মিলিগ্রামের অক্সিকোডোন পিল ফার্মেসি থেকে মাত্র কয়েক ডলারে কেনা হলেও কালোবাজারে তার দাম ৫০ থেকে ১০০ ডলার পর্যন্ত ওঠে।

অক্সিকোডোন মূলত এক প্রকার ওপিওড জাতীয় ওষুধ যা আফিম গাছ থেকে তৈরি হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটি তীব্র ব্যথা উপশমে ব্যবহৃত হলেও ইদানীং তরুণরা এর মোহে অন্ধ হয়ে পড়ছে। তাদের ভ্রান্ত ধারণা—ফার্মেসির ওষুধ বলে এটি রাস্তার মাদকের চেয়ে নিরাপদ। পিল হওয়ায় এটি সেবন করা সহজ এবং শরীরে কোনো গন্ধ থাকে না বলে পরিবারের চোখ ফাঁকি দেওয়া যায় অনায়াসেই। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি এক ভয়ংকর আসক্তি যা মানুষের মস্তিষ্কের গঠন বদলে দেয়, যেখান থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরা প্রায় অসম্ভব।

২০২৫ সালের শুরুর দিকে ফেডারেল আদালত কাঁপিয়ে দেওয়া এক রায়ে উঠে আসে মোহাম্মদ হাসান ও ইউসুফ এনাবের নাম। ব্রুকলিন, কুইন্স এবং স্ট্যাটেন আইল্যান্ডে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ২০টি ফার্মেসির মালিক ছিলেন হাসান। ফেডারেল তদন্তে প্রকাশ পায়, এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তারা প্রায় ১৬ লাখ ওপিওড পিল অবৈধভাবে বিতরণ করেছেন। ফেডারেল কোর্ট ডকুমেন্ট অনুযায়ী, তাদের ফার্মেসিগুলোতে স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি ওপিওড ডিসপেন্স করা হয়েছিল, যা ডিজিটাল ডাটাবেস ও অ্যালগরিদমিক নজরদারিতে ধরা পড়ে। ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ভাষায়, এটি ছিল একটি ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কেল অপারেশন’। তদন্তে আরও দেখা যায়, যেসব রোগীর নামে এসব ওষুধ ছাড় করা হয়েছে, তাদের অনেকেরই বসবাসের ঠিকানা ছিল সংশ্লিষ্ট ফার্মেসি থেকে ১০০ মাইলেরও বেশি দূরে, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে সরাসরি সন্দেহের জন্ম দেয়।

কুইন্সের বেলেরোজ এলাকার ফার্মাসিস্ট ফিরোজের মামলাটি ছিল আরও চাঞ্চল্যকর। তিনি সরাসরি চিকিৎসকদের সাথে যোগসাজশ করে প্রেসক্রিপশন জালিয়াতি করতেন। ডিইএ যখন তার ফার্মেসিতে হানা দেয়, তখন তারা বিপুল পরিমাণ হিসাববিহীন নগদ অর্থ উদ্ধার করে। তার এই কর্মকাণ্ড কেবল কমিউনিটির ক্ষতিই করেনি, বরং সাধারণ রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধের কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছিল।

নিউইয়র্কের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত দুই বছরে অন্তত ডজনখানেক এমন ফার্মেসি সিলগালা করা হয়েছে যাদের মালিকানা ছিল দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের হাতে। এদের অনেকেই মেডিকেইড ও মেডিকেয়ার জালিয়াতির পাশাপাশি এই ওপিওড বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন।

ফেডারেল আইনের অধীনে এই অপরাধের শাস্তি অত্যন্ত কঠোর। প্রেসক্রিপশন জালিয়াতি এবং অবৈধ ড্রাগ বিতরণের দায়ে মাত্রা ভেদে ১০ বছর থেকে শুরু করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। এছাড়া মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত জরিমানা এবং অর্জিত সমস্ত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়। স্টেট বোর্ড অফ ফার্মেসি চিরস্থায়ীভাবে লাইসেন্স বাতিল করে দেয়, যার ফলে ক্যারিয়ারের চূড়ান্ত মৃত্যু ঘটে। তাছাড়া গ্রিন কার্ডধারী বা নন-সিটিজেনদের ক্ষেত্রে সাজা খাটার পর সরাসরি নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

নিউইয়র্ক সিটি ডিপার্টমেন্ট অফ হেলথ অ্যান্ড মেন্টাল হাইজিনের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, শহরটিতে ওপিওড ওভারডোজের হার ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। পরিসংখ্যান বলছে, গত এক বছরে নিউইয়র্ক সিটিতে প্রতি তিন ঘণ্টায় একজন করে মানুষ ড্রাগ ওভারডোজে মারা গেছেন, যা বছরে তিন হাজার ছাড়িয়ে যায়। এই মৃত্যুর ৮১ শতাংশ ক্ষেত্রে দায়ী ছিল ফেন্টানিল ও উচ্চমাত্রার ওপিওড পিল। সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে ব্রঙ্কস এবং সেন্ট্রাল ব্রুকলিনে, যেখানে বাংলাদেশীসহ অনেক অভিবাসী পরিবারের বাস। গত পাঁচ বছরে এই এলাকাগুলোতে ওপিওড সংক্রান্ত মৃত্যুর হার ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

২৪ বছর বয়সী জাহিদ হাসান (ছদ্মনাম) ছিলেন কুইন্সের জ্যামাইকায় বসবাসরত এক মেধাবী ছাত্র। বাবা-মায়ের স্বপ্ন ছিল ছেলে বড় হয়ে ডাক্তার হবে। কিন্তু ছোটখাটো একটি ফুটবল ইনজুরির পর জাহিদকে ব্যথানাশক হিসেবে ওপিওড দেওয়া হয়। সেই সামান্য প্রেসক্রিপশনই তার জীবনের কাল হয়ে দাঁড়ালো।

জাহিদের মা মরিয়ম বেগম অশ্রুসিক্ত চোখে বলেন, “প্রথমে জানতাম না ও নেশা করছে। যখন প্রেসক্রিপশন শেষ হয়ে গেল, ও পাগলের মতো হয়ে যায়। তারপর সে গোপনে ঐ ওষুধ সংগ্রহ করতো। আমরা অবাক হতাম প্রেসক্রিপশন ছাড়া সে কীভাবে এই ওষুধ সংগ্রহ করতো? পরে জেনেছি, আমাদের এলাকারই এক পরিচিত ফার্মেসি মালিক কোনো প্রেসক্রিপশন ছাড়াই জাহিদকে ক্যাশ এর বিনিময়ে ওষুধ দিত। সেই ফার্মাসিস্ট জানতেন জাহিদ নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে, কিন্তু টাকার লোভে তিনি কখনোই তাকে বাধা দেননি।”

এক শুক্রবারের সকালে জাহিদকে তার ঘরে নিথর অবস্থায় পাওয়া যায়। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে জানা যায়, সে সেদিন অতিরিক্ত অক্সিকোডোন সেবন করেছিল। জাহিদের বাবার আক্ষেপ, “যাদের কাজ ছিল জীবন বাঁচানো, তারাই টাকার লোভে আমার ছেলের হাতে বিষ তুলে দিল। সেই ফার্মাসিস্ট আজ হয়তো তার আলিশান বাড়িতে ঘুমাচ্ছেন, কিন্তু আমার ঘর চিরদিনের জন্য অন্ধকার হয়ে গেল।”

এই শোকাতুর গল্পটি কেবল জাহিদের একার নয়; বরং নিউইয়র্কের শত শত অভিবাসী পরিবারের বর্তমান চিত্র। যখন কমিউনিটির একজন ফার্মেসি মালিক নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ বিক্রি করেন, তখন তিনি কেবল ব্যবসা করেন না, বরং একটি সাজানো জীবন ও পরিবার ধ্বংসের নেপথ্য কারিগর হিসেবে কাজ করেন।

নিউইয়র্কের আকাশচুম্বী দালান আর আলোকোজ্জ্বল রাজপথের আড়ালে ওপিওডের এই মরণনেশা আজ এক নীরব মহামারীতে রূপ নিয়েছে। ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (DEA) এই সাঁড়াশি অভিযান কেবল কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে নয়, বরং এটি একটি সমাজকে বাঁচানোর লড়াই। যখন সাদা অ্যাপ্রোন পরা একজন ফার্মাসিস্ট বা চিকিৎসকের দিকে সাধারণ মানুষ আস্থার চোখে তাকায়, তখন সেই আস্থার সুযোগ নিয়ে পিল বিক্রির মাধ্যমে পকেট ভারী করা কেবল অপরাধ নয়, এটি চরমতম নৈতিক বিশ্বাসঘাতকতা।

কমিউনিটির ফার্মেসি ব্যবসায়ীদের মনে রাখতে হবে, ডিইএ এর নজরদারি এখন আগের চেয়ে হাজার গুণ শক্তিশালী। ডিজিটাল ডাটাবেস ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন প্রতিটি পিলের হিসাব রাখছে। ফেডারেল আইন কঠোর, জেলের সাজা দীর্ঘ এবং কলঙ্কের দাগ আজীবনের। কিন্তু আইনের চেয়েও বড় বিচারক হলো নিজের বিবেক। যারা এই মরণনেশার জালে জড়িয়ে পড়েছেন, তাদের এখনই ফিরে আসার সময়। অন্যথায়, ডিইএ এর হাতকড়া কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র।

References:

✔ U.S. Department of Justice
✔ Drug Enforcement Administration (DEA)
✔ Federal Bureau of Investigation (court filings and statements)
✔ New York City Department of Health and Mental Hygiene


Back to top button
🌐 Read in Your Language