কেরানীগঞ্জে মা–মেয়েকে হত্যা করে ২১ দিন লাশের সঙ্গে বসবাস

কেরানীগঞ্জ, ১৭ জানুয়ারি – ঢাকার কেরানীগঞ্জে সম্প্রতি ঘটে গেছে এক চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড। মা ও মেয়েকে একসঙ্গে হত্যা করার পর ২১ দিন ধরে তাদের লাশ নিজের ফ্ল্যাটে রেখেই পরিবারসহ স্বাভাবিকভাবে বসবাস করছিলেন হত্যাকারী।
গত বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) রাতে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে কেরানীগঞ্জের কালিন্দী ইউনিয়নের মুক্তিরবাগ এলাকায় নুসরাত মীম নামে এক শিক্ষিকার ফ্ল্যাট থেকে স্কুলছাত্রী জোবাইদা রহমান ফাতেমা ও তার মা রোকেয়া রহমানের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
এই ঘটনায় শিক্ষিকা নুসরাত মীম (২৪), তার স্বামী হুমায়ুন মিয়া (২৮) এবং মীমের ১৫ ও ১১ বছর বয়সী দুই বোনকে আটক করা হয়। পরে গ্রেপ্তার হওয়া নুসরাত মীমকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে পুলিশ একের পর এক ভয়ংকর তথ্য জানতে পারে। জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, হত্যাকাণ্ডের পর টানা ২১ দিন মা-মেয়ের লাশ ফ্ল্যাটে রেখেই পরিবার নিয়ে বসবাস করছিলেন ওই শিক্ষিকা।
এর আগে স্কুলছাত্রী জোবাইদা রহমান (১৪) ও তার মা রোকেয়া রহমান (৩২) গত ২৫ ডিসেম্বর থেকে নিখোঁজ ছিলেন। ঘটনার পরদিন রোকেয়ার স্বামী শাহীন আহম্মেদ কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরে ৬ জানুয়ারি তিনি অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে অপহরণের একটি মামলা দায়ের করেন।
কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এম সাইফুল আলম নিজ কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে জানান, গ্রেপ্তার নুসরাত মীম একটি এনজিও থেকে দেড় লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। ওই ঋণের জামিনদার ছিলেন তার শিক্ষার্থী জোবাইদার মা রোকেয়া রহমান। নির্ধারিত সময়ে কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে না পারায় এনজিও কর্তৃপক্ষ রোকেয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এই বিষয়টি নিয়ে রোকেয়া ও নুসরাতের মধ্যে একাধিকবার কথা-কাটাকাটি ও মনোমালিন্য হয়।
ওসি জানান, ২৫ ডিসেম্বর বিকেলে ফাতেমা প্রাইভেট পড়তে নুসরাতের বাসায় গেলে নুসরাতের ১৫ বছর বয়সী ছোট বোনের সঙ্গে তার বাগ্বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে ওই বোন ফাতেমার গলা চেপে ধরে তাকে হত্যা করে।
ঘটনার পর বিষয়টি আড়াল করতে নুসরাতের বোন ফাতেমার পোশাক পরে বাসা থেকে বের হয়ে যায়, যাতে সিসিটিভি ফুটেজে মনে হয় ফাতেমা নিজেই বাসা ছেড়ে চলে গেছে। ওই ঘটনার প্রায় দুই ঘণ্টা পর নুসরাত ফাতেমার মাকে ফোন করে মেয়ের অসুস্থতার কথা জানান। মেয়েকে নিতে রোকেয়া যখন নুসরাতের বাসায় ঢোকেন, তখন পেছন থেকে ওড়না পেঁচিয়ে তার গলা চেপে ধরেন নুসরাত। একপর্যায়ে রোকেয়াকে ধাক্কা দিয়ে মেঝেতে ফেলে দেওয়া হয়। পরে দুই বোন মিলে শ্বাসরোধ করে রোকেয়াকে হত্যা করেন।
পুলিশ জানায়, হত্যার পর রোকেয়ার লাশ নুসরাতের শোবার ঘরের বক্স খাটের নিচে এবং ফাতেমার লাশ শৌচাগারের ফলস সিলিংয়ের ভেতরে লুকিয়ে রাখা হয়। দুটি লাশ ফ্ল্যাটে রেখেই অভিযুক্ত দুই বোন ও তাদের পরিবার প্রায় ২১ দিন ধরে সেখানে বসবাস করে আসছিল।
ওসি এম সাইফুল আলম আরও জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নুসরাত ও তার ছোট বোন হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। ইতোমধ্যে তাদের আদালতে পাঠানো হয়েছে। নুসরাতের ছোট বোন নাবালিকা হওয়ায় তাকে গাজীপুরের কোনাবাড়ী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। এই ঘটনায় আর কেউ জড়িত ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
এনএন/ ১৭ জানুয়ারি ২০২৬









