টলিউড

সত্যজিৎ-সৌমিত্র অমর জুটির কেউ রইলো না আর

কলকাতা, ১৫ নভেম্বর- ‘চারুলতাকে অমল চিঠি লিখবে। শুট চলছে ‘চারুলতা’-র। বাবা (সত্যজিৎ রায়) গম্ভীর গলায় সৌমিত্রকাকুকে বললেন, ‘তোমার এই হাতের লেখায় হবে না। সেই সময়ের হাতের লেখার মতো করে চিঠি লিখতে হবে।’ এরপর বাবা হাতে ধরে ক্যালিগ্রাফি শিখিয়েছিলেন সৌমিত্রকাকুকে।

খুব মন দিয়ে তখন দেখেছিলাম ‘চারুলতা’ ছবির অমল সেই হাতের লেখা রপ্ত করলেন। পরবর্তীকালে খেয়াল করে দেখলাম, সৌমিত্রকাকুর হাতের লেখাটাই বদলে গেল! ‘অমল’র মতো করেই লিখতে শুরু করলেন তিনি।

এমন-ই ছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। গলার স্বর, কথা বলার ভঙ্গি- সবকিছু প্রথম থেকেই অসাধারণ ছিল। তবুও নিজেকে তিনি তৈরি করেছেন বারবার চরিত্রের প্রয়োজনে। ‘অপুর সংসার’ ছবির সময় বাবা বলতেন, ‘সৌমিত্রের গলার আওয়াজ বড্ড পাতলা।’ সেটা শুনে সৌমিত্রকাকু একজন দক্ষ আবৃত্তিকার হয়ে উঠলেন! এই যে নিজেকে তৈরি করার বিষয়টা, এটাই আমায় আশ্চর্য করত। গলার আওয়াজ নিয়ে নানা চর্চা, বিভিন্ন দিকে তার শ্রম তাকে কেবলমাত্র একজন অভিনেতা নয়, একজন শিল্পী হয়ে ওঠার দিকে নিয়ে গেল! নিজের সঙ্গে নিজের চ্যালেঞ্জ ছিল তার। কিছু হয়ে ওঠার চ্যালেঞ্জ’- সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে এভাবেই বললেন সত্যজিৎ রায়ের ছেলে সন্দীপ রায়।

আরও পড়ুন: সৌমিত্রের মৃত্যুতে মুখ্যমন্ত্রী মমতার শোক, জানালেন শেষকৃত্যের সময়

সত্যজিৎ রায় এই উপমহাদেশের সবচেয়ে আলোচিত চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব। তার হাত ধরেই এই উপমহাদেশে প্রথমবারের মতো অস্কার এসেছে। সেই পরিচালকের সিনেমায় অভিনয় করতে মুখিয়ে থাকতেন বলিউডের অনেক নামজাদা তারকারাও। আর সেই সত্যজিতের প্রিয় অভিনেতা ছিলেন সৌমিত্র। এই সৌমিত্রকে সত্যজিৎ গড়েছেন নিজের মনের মতো করে। ঠিক যেমন ভাস্কর তার সৃষ্টিকে গড়ে তুলে।

কিভাবে সৌমিত্রকে পর্দায় ভালো লাগবে, কেমন ধরনের চরিত্রে সৌমিত্রকে কাজ করানো যাবে সেগুলোই তিনি ভেবেছেন। সৌমিত্রের পোশাক, সাজ-মেকাপ সবকিছুতেই তার বাড়তি নজর ছিলো। শুটিং করতে গিয়ে চুলটা একটু এদিক সেদিক হলে নিজেই এগিয়ে যেতেন। সৌমিত্রের মধ্য দিয়ে তিনি যেন নিজেকেই প্রতিষ্ঠিক করতেন সিনেমার চরিত্রে। তাই যত্নটাও হতো নিখুঁত।

সেই ১৯৫৯ সালের ঘটনা। আকাশবাণী কলকাতার ঘোষকের কাজ করছেন সৌমিত্র। কিছু নাটকে ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয় করছেন। এর মধ্যেই একদিন অকস্মাৎ স্বয়ং সত্যজিৎ রায়ের কাছ থেকে অপুর সংসারের কেন্দ্রীয় চরিত্রের অভিনয়ের প্রস্তাব আসে। সেই ছিল সূচনা। এরপর সত্যজিৎ রায়ের ২৭টি চলচ্চিত্রের মধ্যে ১৪টিতেই অভিনয় করেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। এই সৌভাগ্য বাংলার আর কোনো অভিনেতা ও অভিনেত্রীর ভাগ্যে জোটেনি।

সৌমিত্র সবচেয়ে বেশি খ্যাতি পেয়েছেন সত্যজিতের ফেলুদা চরিত্রে অভিনয়ের জন্য। ‘সোনার কেল্লা’ চলচ্চিত্রে তিনি এতটাই দুর্দান্ত অভিনয় করেন যে সিনেমা রিলিজের পর স্বয়ং পরিচালক সত্যজিত রায় পর্যন্ত স্বীকার করতে বাধ্য হন যে, ‘তার চেয়ে ভাল আর কেউ অভিনয় করতে পারতেন না।’

সত্যজিতের ‘অপুর সংসার’, ‘ঘরে বাইরে’, ‘অশনি সংকেত’ ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’, ‘হীরক রাজার দেশে’সহ বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে অনবদ্য অভিনয় করেছেন সৌমিত্র।

একসঙ্গে দীর্ঘদিনের কাজের সুবাদে দুজনের সম্পর্কটা জমে উঠেছিলো দারুণ। সত্যজিতের ছেলে সন্দীপ আনন্দবাজারকে বলেন, ‘আমাদের পরিবার, ইউনিট সব কিছুর সঙ্গে একাত্ম হয়ে থাকতেন সৌমিত্রকাকু। স্পটবয় থেকে ক্যামেরাম্যান- সকলের সঙ্গে গল্প করতেন শুটিং ফ্লোরে। বাবাও আলাদা করে ভাবতেন তাকে নিয়ে। ‘অপুর সংসার’-এর পর বাবা বলেছিলেন, ‘আমার এ ছবিতে তোমার কাজ যা হয়েছে, তাতে লোকজন তোমায় কাজ দেবে। তবুও যদি কাজ না-পাও, আর কিছু না হোক, তুমি আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট হয়ে তো কাজ করতেই পারো।’

অনেকেই বাবাকে সৌমিত্রকাকুর ‘মানসপিতা’ বলেন। আর সৌমিত্রকাকুকে বাবার ‘মানসপুত্র’। পরিচালক আর অভিনেতার ওই নির্ভরতা দেখে আমারও মনে হত, দু’জনের মধ্যে যেন পিতা-পুত্রের সম্পর্কই তৈরি হয়ে গিয়েছিল।’

এতদিন সত্যজিৎ রায়ের নানা গল্প শোনাতেন সৌমিত্র। সেসব গল্পে উঠে আসতো সত্যজিতের সিনেমা নিয়ে নানা ভাবনা, নির্মাণের কলাকৌশল, মিষ্টি মধুর স্মৃতিচারণ। আজ সেই সৌমিত্রও চলে গেলেন। বাংলা সিনেমার অমর জুটিটির কেউ রইলো না আর!

সূত্র: জাগোনিউজ

আর/০৮:১৪/১৫ নভেম্বর


Back to top button
🌐 Read in Your Language