
ঢাকা,৭ নভেম্বর- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মৃতপ্রায় রেলওয়েকে পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছে। সাশ্রয়ী ও নিরাপদ যাতায়াতের জন্য সরকার নতুন রেলপথ নির্মাণসহ এ খাতে গ্রহণ করেছে ব্যাপক উন্নয়ন কার্যক্রম। এর অংশ হিসেবে গত ১০ বছরে ৭৯টি রেল প্রকল্পের কাজ শেষ করা হয়েছে। চলছে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের কাজ। আগামী ২৯ নভেম্বর দ্বিতীয় বঙ্গবন্ধু রেল সেতুর ভিত্তি স্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এসব বড় অবকাঠামো উন্নয়ন গতির পাশাপাশি যাত্রী সাধারণের সুবিধায় জরুরি ভিত্তিতে রেলকোচ ক্রয় প্রকল্প বাস্তবায়নে চলছে শম্বুকগতি। দক্ষিণ কোরিয়া থেকে বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ১৫০টি রেলকোচ (ক্যারেজ) সংগ্রহের প্রকল্পপ্রক্রিয়াতেই চলে গেছে তিন বছরের বেশি সময়। এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অসন্তোষ প্রকাশ করলেও সংশ্লিষ্ট কেউ দায় নিচ্ছেন না।
জানা গেছে, প্রকল্প পরিচালক বিধি না মানায় সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এ নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির তদন্তে বেরিয়ে আসে অনিয়মের বিষয়টি। ওই তদন্ত প্রতিবেদন ধামাচাপা দিতে সুবিধা নেওয়া পক্ষটি বর্তমানে বেশ তৎপর। বিষয়টি সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত গড়িয়েছে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, দক্ষিণ কোরিয়া থেকে বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ১৫০টি রেলকোচ সংগ্রহের প্রকল্পে প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ হাসান মনসুর বিধি লঙ্ঘন করেছেন। সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি বলছে, নিয়ম অনুযায়ী ১৫০টি কোচ (ক্যারেজ) সংগ্রহের দরপত্র সংবাদপত্রে আহ্বানের আগেই ‘অফিশিয়াল এস্টিমেট’ সিলগালা করে প্রকল্প পরিচালকের নিজের হেফাজতে রাখার কথা। কিন্তু প্রকল্প পরিচালক ২০১৯ সালের ৭ আগস্ট দরপত্র আহ্বানের প্রায় দুই মাস পর এস্টিমেট সিলগালা করেন। এ ক্ষেত্রে বড় অনিয়ম হওয়ার আশঙ্কা করছেন সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদনে প্রকল্পের দরপত্রপ্রক্রিয়ার বিধান না মানার বিষয়টি উল্লেখ করে রেলসচিব বরাবর জমা দিলেও তা প্রকাশ করা হচ্ছে না। গত জুনে গঠিত তদন্ত কমিটি প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতেও বলেছে। অথচ উল্টো প্রকল্প পরিচালকের অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্প পরিচালককে রক্ষায় সুবিধাভোগী পক্ষটি প্রভাব বিস্তার করে রেখেছে রেলসচিবের দপ্তরে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মোহাম্মদ শামছুজ্জামান এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘বিষয়টি মন্ত্রণালয় দেখছে। আমি এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’
দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ১৫০টি রেলকোচ কিনতে ২০১৭ সালের ১ জুলাই প্রকল্প অনুমোদিত হয়। এরপর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দেড় শ কোচ সংগ্রহে চুক্তি হয় চলতি বছরের ২৯ জুলাই। চুক্তি স্বাক্ষরের দিন থেকে ১৮ থেকে ৩০ মাসের মধ্যে কোচগুলো বাংলাদেশ রেলওয়ের কাছে সরবরাহের কথা। প্রকল্পের চুক্তিমূল্য ৬৫৮ কোটি ৮১ লাখ ৩০ হাজার টাকা।
জানা গেছে, গত ২৪ জুন অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির ভার্চুয়াল সভায় ক্রয় প্রস্তাব প্রক্রিয়ায় অনিয়মের বিষয়টি উঠে আসে। সভায় এ জন্য রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন ও পরিকল্পনা) প্রণব কুমার ঘোষকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তবে সরকারের উন্নয়নকাজ অব্যাহত রাখতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করতে মত দেয় মন্ত্রিসভা কমিটি। সেই সঙ্গে দরপত্রপ্রক্রিয়ার অনিয়মের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের ব্যাপারে তদন্ত করতেও নির্দেশ দেওয়া হয়, যাতে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
তদন্ত কমিটি সূত্রে জানা গেছে, কমিটি ক্রয় প্রস্তাব প্রক্রিয়ায় বিধি-বিধান না মানায় প্রকল্প পরিচালককে দায়ী করেছে। প্রস্তাবটি পরীক্ষার পর দেখা গেছে, সেটি প্রক্রিয়াকরণে বিধি-বিধানের ব্যত্যয় সৃষ্টি করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের চিহ্নিত করে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হয়। তদন্ত কমিটির সদস্য, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব আলী কবীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রায় এক মাস আগে আমরা প্রতিবেদন জমা দিয়েছি।’
রেলওয়ে সূত্র জানায়, প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ হাসান মনসুর কারিগরি দরপত্র মূল্যায়ন প্রতিবেদন ইডিসিএফ কোরিয়া বরাবর কনফারেন্সের জন্য পাঠানোর আগে ক্রয়কারী কার্যালয়প্রধানের কাছ থেকে অনুমোদন নেননি। বাংলাদেশ রেলওয়ের এক চিঠিতে এটিকে ‘দাপ্তরিক শৃঙ্খলা পরিপন্থী’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্প পরিচালকের আচরণকে ‘অনিয়ম ঘটানোর অভিপ্রায়, অদক্ষতা এবং কর্তব্যে উদাসীনতার শামিল’ বলে মন্তব্য করেছে রেলওয়ে।
প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ হাসান মনসুরের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করে রেলওয়ের মহাপরিচালক মোহাম্মদ শামছুজ্জামান গত ২৩ আগস্ট প্রকল্প পরিচালকের কাছে লিখিত কৈয়িফত তলব করেন। গত ২ সেপ্টেম্বর তিনি কৈফিয়তের জবাব দিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছেন।
অভিযোগ সম্পর্কে প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ হাসান মনসুর এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমি এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করব না।’
রেলসচিব মো. সেলিম রেজা বলেন, ‘বিষয়টির তদন্ত হয়েছে। আমি এর বেশি কিছু বলতে পারব না।’
সূত্র: কালের কন্ঠ
আর/০৮:১৪/৭ নভেম্বর









