অপরাধ

ঋণ দেওয়ার নামে প্রতারণা, আটক ৩

ঢাকা, ২৩ ফেব্রুয়ারি – ঋণ দেওয়ার নামে প্রতারণার অভিযোগে রাজধানীর মিরপুর থেকে ‘শিবপুর ক্ষুদ্র ঋণদান কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড’ এর সভাপতি ফয়েজউল্লাহ ও তার দুই সহযোগীকে আটক করেছে র‌্যাব-৪। এ সময় প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন মালামাল জব্দ করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (২২ ফেব্রুয়ারি) দুপুরের সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব-৪ এর অধিনায়ক মোজাম্মেল হক এ তথ্য জানিয়েছেন।

তিনি জানান, সোমবার (২১ ফেব্রুয়ারি) দুপুর থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত মিরপুরের মুক্ত বাংলা শপিং কমপ্লেক্সে অভিযান চালিয়ে ফয়েজ উল্লাহসহ তিনজনকে আটক করা হয়। অন্য দুজন হলেন—আফরিন আক্তার ও মোছা তাসলিমা বেগম। প্রতিষ্ঠানটি ‘শিবপুর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমিতি লিমিটেড’ হিসেবে রেজিস্টার্ড হলেও প্রতারণামূলকভাবে ‘শিবপুর ক্ষুদ্র ঋণদান কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড’ নামে প্রচার ও বিভিন্ন কার্যক্রম চালাচ্ছিল। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওই প্রতিষ্ঠানে কোনো জামানত রক্ষিত নেই।

বিপুল পরিমাণ মালামাল জব্দ
অভিযানকালে ‘শিবপুর ক্ষুদ্র ঋণদান কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড’ অফিস থেকে প্রতারণায় ব্যবহৃত ভর্তি ফরম, ঋণগ্রহীতার ছবি ও জাতীয় পরিচয়পত্র, ঋণগ্রহীতাদের জীবনবৃত্তান্ত, লিফলেট, সিল, বিভিন্ন নামে সঞ্চয় বই, অব্যবহৃত পাস বই, দৈনিক কিস্তি ও ঋণ বিতরণের রেজিস্টার, ব্যাংক চেক, স্ট্যাম্প, আইডি কার্ড, দৈনিক কিস্তি আদায়ের শিট, মাইসার ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের ঋণের আবেদনপত্র, মাইসার ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের সঞ্চয় ও ঋণ পাস বই, মাইসার ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের হিসাব খোলার আবেদন, মাইসার ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের অব্যবহৃত ডেবিট ভাউচার বই, মাইসার ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের সঞ্চয় আদায় শিট, মো. ফয়েজউল্লাহর নামে কমিউনিটি ভিলেজ ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির বিভিন্ন প্রকার সার্টিফিকেট, চেক বই, মনিটর এবং সিপিইউ জব্দ করা হয়।

প্রতারণার কৌশল
ফয়েজের নেতৃত্বাধীন প্রতারক চক্র মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের মাধ্যমে রাজধানীর মিরপুরের বিভিন্ন বস্তি এলাকার প্রতিবন্ধী, ভিক্ষুক, সেলুনের কর্মচারী, দোকানদার, গৃহকর্মী ও নিম্ন আয়ের মানুষদের ঋণের লোভ দেখিয়ে সঞ্চয়ের নামে তাদের কোম্পানিতে বিনিয়োগ/ডিপিএস করতে উদ্বুদ্ধ করে।

প্রলুব্ধকরণ ও সঞ্চয় সংগ্রহ
আটককৃতরা ভুক্তভোগীদের প্রলুব্ধ করে সমিতির অফিসে নিয়ে আসে। ‘শিবপুর ক্ষদ্র ঋণদান কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড’ প্রতিদিন আনুমানিক ২৫০ জন গ্রাহকের কাছ থেকে সঞ্চয় সংগ্রহ করে। ইসলামী শরিয়ার নামে বিভিন্ন প্রকল্পের কথা প্রচার করে। মুদারাবা ডিপোজিট স্কিম, মুদারাবা কোটিপতি বিশেষ সঞ্চয়, মুদারাবা লাখপতি ডিপোজিট স্কিম, মুদারাবা মিলিওনিয়ার ডিপোজিট স্কিম, মুদারাবা পেনশন ডিপোজিট ইত্যাদির প্রলোভন দেখিয়ে নগদ অর্থ হাতিয়ে নেয়। বলা হতো— ১০-১৫ দিন ঠিকমতো নির্দিষ্ট হারে সঞ্চয় করলে ঋণ দেওয়া হবে। দু-একজনকে ঋণ দিলেও অন্যরা ঋণ পেতেন না। কোম্পানির কিছু সদস্য দৈনিক ভিত্তিতে সঞ্চয়/ডিপিএসের টাকা সংগ্রহ করত। বিভিন্নভাবে ভয় দেখানো হতো—যদি সময়মতো সঞ্চয়/ডিপিএসের টাকা না দেয়, তাহলে সঠিক সময়ে ঋণ দেওয়া হবে না বা মেয়াদ শেষে তারা মুনাফা কম পাবেন এবং জরিমানাও করা হবে। প্রতারণার আরও একটি কৌশল হিসেবে ভুক্তভোগীদের বোঝানো হতো যে, দৈনিক ২০০-৩০০ টাকা করে জমা করলে একসময় ঢাকা শহরে তাদের একটি করে ফ্ল্যাট বা জমি দেওয়া হবে।

ফয়েজ উল্লাহর উত্থান
ফয়েজ উল্লাহর বাড়ি ভোলায়। সে ভোলার একটি স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেছে। ১৯৯২ সালে জীবিকার তাগিদে ভোলা থেকে ঢাকায় এসে মিরপুরের ১৪ নম্বরে কনস্ট্রাকশনের কাজ শুরু করে সে। ২০০৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সে কাফরুলের একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ফিল্ড অফিসার পদে চাকরি করে। গত ২০২১ সালে নিজে ‘শিবপুর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমিতি লিমিটেড’ প্রতিষ্ঠা করে। পরবর্তী সময়ে সে এ সমিতির নাম পরিবর্তন করে প্রতারণার উদ্দেশ্যে ‘শিবপুর ক্ষুদ্র ঋণদান কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড’ নামে কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। এ কোম্পানির সদস্য ২৫০-৩০০ জন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে সে আনুমানিক ৫০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছে।

ফয়েজের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ
প্রতারক ফয়েজ উল্লাহ ‘শিবপুর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামে নিবন্ধন নিলেও প্রতারণার লক্ষ্যে ‘শিবপুর ক্ষদ্র ঋণদান কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড’ নামে অবৈধভাবে ঋণদানের কার্যক্রম চালু করে। প্রতিষ্ঠানের ব্যাংকিং কার্যক্রম বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অনুমোদিত নয় এবং এনজিও হিসেবে আর্থিক লেনদেনের জন্য অনুমোদিত নয়। মাইসার ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন ও কমিউনিটি ভিলেজ ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির অনুমোদন নেই। প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্টও নেই।

সূত্র : রাইজিংবিডি
এন এইচ, ২৩ ফেব্রুয়ারি


Back to top button
🌐 Read in Your Language