
ঢাকা, ২২ ফেব্রুয়ারি – স্কুলপড়ূয়া কিশোরী বা তরুণীরা ওদের টার্গেট। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ঘেঁটে এমন কয়েকজনকে বেছে নেওয়া হয়। তাদের সঙ্গে মেসেঞ্জারে কথোপকথনের মাধ্যমে গড়ে তোলা হয় ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। এরপর টিকটক-লাইকির মতো ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মে তাদের তারকা বানানোর প্রলোভন দেখানো হয়। এই ফাঁদে সহজেই পা দেন কিশোরী-তরুণীরা। তখন শুটিংয়ের নামে ডেকে তাদের ধর্ষণ করা হয়। সেই ঘটনার ভিডিও ও ছবি তুলে রাখা হয়। শেষ ধাপে সেই ভিডিও বা ছবি ইন্টারনেটে ছড়ানোর ভয় দেখিয়ে আদায় করা হয় মোটা অঙ্কের অর্থ।
এমন ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে টিকটক-লাইকিতে ভিডিও শেয়ার করে পরিচিতি পাওয়া কিছু তরুণ। সম্প্রতি এমন একটি চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর বেরিয়ে আসে নানা তথ্য। তাদের ফোনে পাওয়া যায় অর্ধশত কিশোরী-তরুণীর আপত্তিকর ছবি, যারা সবাই এই চক্রের শিকার বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, কিশোরী-তরুণীদের বড় অংশই এখন সামাজিক যোগাযোগের নানা মাধ্যমে সক্রিয়। তাদের অনেকেই রাতারাতি তারকা খ্যাতি পেতে চায়। এই সুযোগটাই কাজে লাগায় প্রতারকরা। তারা টিকটক-লাইকিতে অ্যাকাউন্ট খুলে নিজেদের ভিডিও শেয়ার করে। এতে অনেকে এ ধরনের ভিডিও বানাতে বা মডেল হতে আগ্রহী হয়। কেউ কেউ তাদের ভিডিও কনটেন্টের ব্যাপারে মন্তব্য করে। এর মধ্যে কয়েকজনকে বেছে নিয়ে শুরু হয় নতুন মিশন। কখনও ফাঁদে ফেলে ধর্ষণ ও অর্থ আদায়, আবার কখনও ভুক্তভোগীদের প্রতিবেশী দেশে পাচার করে দেওয়া হয়।
এ ঘটনার শিকার এক কিশোরীর (১৪) বাবা সম্প্রতি রাজধানীর তেজগাঁও থানায় পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করেন। তিনি জানান, ৩১ জানুয়ারি একজন তার ভাগ্নের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে কিশোরীর কিছু নগ্ন ছবি ও আপত্তিকর মেসেজ পাঠিয়ে জানতে চায়, ছবি তার মামাতো বোনের কিনা? ছবিগুলো তার বোনের জানিয়ে তিনি প্রশ্ন করেন, কোথায় পেয়েছেন এসব? অপর প্রান্ত থেকে বলা হয়, বিভিন্ন কৌশলে ছবিগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে। একটি মোটরসাইকেল কিনে না দিলে তারা এসব ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেবে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম ডিভিশনের ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিম এ মামলার তদন্ত করে। এই টিমের অতিরিক্ত উপকমিশনার জুনায়েদ আলম সরকার বলেন, কিশোরীর আপত্তিকর ছবি ছড়িয়ে টাকা দাবির ঘটনায় দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলো ডিজে নাঈম ও কামাল আলী। রিমান্ডে জানা যায়, কিশোরীকে তারকা বানানোর প্রলোভনে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ এবং আপত্তিকর ছবি তুলে রাখা হয়। তাদের ফোনে বহু কিশোরী-তরুণীর আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও পাওয়া গেছে। এই চক্রের এক সদস্য পলাতক আছে। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
তদন্ত সূত্র জানায়, স্কুলপড়ূয়া ওই কিশোরীকে টিকটকে মডেল হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এ ব্যাপারে ওই কিশোরীকে মেসেঞ্জারে কল দেয় ডিজে নাঈম। পরে তারা টিকটক ভিডিও তৈরির জন্য একটি দল গঠন করে। সেখানে কামাল আলীসহ কয়েকজন ছিল। এক ভিডিও বানিয়েই কিশোরীকে তারা তারকাখ্যাতি পাইয়ে দেবে বলে কথা দেয়। পরে তাকে একটি বাসায় ইনডোর শুটিংয়ের নামে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে ধর্ষণের পর তার নগ্ন ছবি তুলে রাখা হয়। সেই ছবিই ভুক্তভোগীর বাবা ও মামাতো ভাইয়ের কাছে পাঠিয়ে অর্থ দাবি করে তারা।
সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আপত্তিকর ছবি ছড়িয়ে দেওয়া ঠেকাতে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা টাকা দিতে রাজি হন। তখন তাদের ঢাকার বাইরের কোনো মোবাইল ব্যাংকিং নম্বর দেওয়া হয়। সেই নম্বরে টাকা পাঠানোর পর তারা আবারও সেই অর্থ মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমেই নিজেদের নম্বরে আনে। প্রতারণা করে পাওয়া অর্থের ৭০ ভাগ গ্রেপ্তার দু’জন সমান ভাগ করে নিত। পলাতক অপরজন পেত ৩০ ভাগ।
এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বরে চার ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে টিকটকের কথিত মডেল দেওয়ান রসুল হৃদয়কে রাজধানীর ভাটারা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ জানায়, সে ভিডিও তৈরি করে তা টিকটক ও লাইকিতে আপলোড করত। সে অভিনয়ের সুযোগ দেওয়ার নামে একে-একে চার ছাত্রীকে নিজের বাসায় আটকে রেখে ধর্ষণ করে।
ভারতে বাংলাদেশি এক তরুণীকে যৌন নির্যাতনের ভিডিও গত বছরের মে মাসে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এর সূত্র ধরে তদন্তে নেমে একটি চক্রের হোতা আশরাফুল ইসলাম ওরফে বস রাফিকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। র্যাব জানায়, তরুণীদের টিকটক মডেল বানানোসহ অন্যান্য প্রলোভন দেখিয়ে পাচার করা হতো। এই চক্রের মাধ্যমে পাঁচ শতাধিক নারীকে পাচার করা হয়েছে।
সূত্র: সমকাল
এম ইউ/২২ ফেব্রুয়ারি ২০২২









