নেতিবাচক চিন্তার লুকানো ক্ষমতা

অনুষ্ঠানটির নাম ‘আনলিশ দ্য পাওয়ার উইদিন’। এখানে মানুষ খালি পায়ে জ্বলন্ত কয়লার ওপর হাঁটেন।
ক্যালিফোর্নিয়ার সান জোসে এমনই এক আয়োজন দেখতে আসে মানুষ। সেখানে ২১ জন খালি পায়ে দুঃসাহসীক কাজটি করেই ফেলেন। অনুপ্রেরণাদায়ক বক্তা টনি রবিন্স বলতে থাকেন, যারা হাঁটছেন তারা এ কাজের মাধ্যমে আসলে কি আশা করছেন? কি ঘটতে পারে? আসলে আগুনে হাঁটার বিষয়ে একটা রহস্য আচে। তাপ শোষনের ক্ষেত্রে খুবই দুর্বল কয়লা। এমনকি মানুষের ত্বকও তেমনি। তাই জ্বলন্ত কয়লার ওপর দিয়ে খুব দ্রুত হালকা পা ফেলে যদি হাঁটা যায় তো খারাপ কিছু ঘটবে না।
কিন্তু এই মানুষদের মস্তিষ্কে এখন পদার্থবিজ্ঞান কাজ করবে না। সে সময়ও নেই। তাদের কাছে বিষয়টি মানসিকতার। এই ভয়ংকর অবস্থার মধ্য দিয়ে সফলভাবে যাওয়ার জন্য মানসিক প্রস্তুতি তৈরি করাই মূল উদ্দেশ্য। আর তা করতে পারলে যেকোনো কাজই সম্ভব। কিন্তু জ্বলন্ত কয়লার ওপর দিয়ে হাঁটার বিষয়টিকে কি ইতিবাচকভাবে দেখা সম্ভব? জোর করে ইতিবাচকভাবে কি কিছু ভাবা সম্ভব?
সবকিছুতে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী আনার কৌশল বিবেচনা করুন। মনোবিজ্ঞানী গ্যাব্রিয়েলে ওয়েটিনজেন এবং তার সহকর্মীদের গবেষণায় বলা হয়, মস্তিষ্কে কোনো ইতিবাচক চিত্র ফুটিয়ে তোলার মাধ্যমে যেকোনো কাজ সফলভাবে করা যেতে পারে। তবে কিছু পরিস্থিতি শর্ত হিসাবে কাজ করে। গবেষণায় বিশেষজ্ঞরা অংশগ্রহণকারীদের পানি খেতে মানা করেন। একটা সময় পর তাদের দেহে পানির অভাব দেখা দেয়। তাদের কয়েক জনকে এক গ্লাস পানির কথা ভাবতে বলেন বিশেষজ্ঞরা। আরেক দলকে বিষয়টিকে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গীতে দেখতে বলা হয়। দেখা গেছে, তৃষ্ণার্ত অবস্থায় যারা পানির কথা ভাবছিলেন, তাদের প্রাণশক্তি কমে আসে। কিন্তু যারা নিরপেক্ষম চিন্তা করছিলেন বা নেতিবাচকভাবে দেখছিলেন, তাদের প্রাণশক্তির ঘাটতি ঘটে নাই।
ইউনিভার্সিটি অব ওয়াটারলু’র গবেষণায় কিছু অনুপ্রেরণাদায়ক বাক্যের কথা তুলে ধরা হয়। যেমন ‘আমার জীবনটা আনন্দে পূর্ণ’ কিংবা ‘আমাকে সবাই ভালোবাসে’ ইত্যাদি। গবেষণায় বলা হয়, যারা এসব বাক্য ব্যবহার করে চিন্তা করেন তাদের আত্মবিশ্বাসের অভাব রয়েছে। এমনকি তা আরো কমেম আসে। কারণ হিসাবে বলা হয়, আপনি একজন পছন্দনীয় মানুষ- এ কথাটি যখন জোর দিয়ে চিন্তা করার চেষ্টা করছেন, তখন মনের গহীনে কাজ করছে যে আপনি তেমনটা নন।
এমনকি প্রতিষ্ঠানের নেতাদের লক্ষ্য নির্ধারণ করে কাজে এগিয়ে যাওয়ার বিয়ষটিও অনেক সময় হিতে বিপরীত ঘটায়। কোনো একটি লক্ষ্যের প্রতি সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করলে প্রতিষ্ঠানের সার্বিক লক্ষ্য নষ্ট হতে পারে। বেশ কয়েকটি বিজনেস স্কুলের গবেষণায় বলা হয়, কর্মীদের লক্ষ্য নির্ধারণ করে দিলে তাদের কর্মআদর্শ অনেক ক্ষেত্রেই নষ্ট হয়।
যদিও এ ধরনের গবেষণা নতুন অবস্থায় রয়েছে, কিন্তু এখানে নেতিবাচক চিন্তার শক্তিমত্তা বেরিয়ে এসেছে। প্রাচীন আমলের দার্শনিক এবং আধ্যাত্মিক শিক্ষকরা ইতিবাচক ও নেতিবাচক, আশা ও নৈরাশ্য, সফলতা ও ব্যর্থতার মধ্যে ভারসাম্য আনার চেষ্টা করতেন। স্টিয়কবাদে আগে থেকেই অশুভ বিষয়গুলো সামলাতে পরিকল্পনা গ্রহণের কথা বলা হয়। সবচেয়ে খারাপ কিছুর কথা চিন্তা করলে শক্তিশালী মানসিকতা সৃষ্টি হয়। এই পদ্ধতিতে আরেকটি সুবিধা মেলে। যদি সম্পর্কটা ব্যর্থ হবে বলে ভেবে নেন, তো সফলতা লাভে পর তার অনেক বেশি উপভোগ্য ও তৃপ্তিদায়ক হয়ে উঠবে।
বুদ্ধিস্ট মেডিটেশনে ক্রমাগত ইতিবাচক চিন্তার বিষয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠার বিষয়ে নিরুৎসাহিত করা হয়। এখানে আবেগ ও অনুভূতির উত্থান ও পতনের বিষয়ে উৎসাহিত করা হয়েছে। ২০০৯ সালে ‘দ্য জার্নাল অব পেইন’-এ মেডিটেশনের প্রশিক্ষণ বিষয়ে নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। সেখানে ব্যথা কমানোর জন্য যন্ত্রণাদায়ক অনুভূতিকে এড়িয়ে যেতে বলা হয়নি। একে অনুভব করে অবহেলা করতে বলা হয়েছে।
বলা যায়, সব সময় ইতিবাচক চিন্তার মাধ্যমে আনন্দদায়ক কিছু লাভ করা যায় না। এর মাধ্যমে মানসিক চাপ থেকেও বেরিয়ে আসা যায় না। নেতিবাচক বিষয় মানুষকে আরো যোগ্য ও উদ্যমী করে তুলতে পারে। রবিন্সের গবেষণায় বলা হয়, ইতিবাচক চিন্তার অধিকারী মানুষ কখনোই আয়েশ করতে পারেন না। কারণ সেখানে নেতিবাচক বিষয়ের আশঙ্কা থেকেই যায়। তারা ব্যর্থতার ভয় থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন না। কিন্তু যারা নেতিবাচক চিন্তা করেন, তারা এর জন্য প্রস্তুত থাকেন। খারাপ কিছু তাদের দুঃস্বপ্ন হয়ে দেখা দেয় না।
তাই যারা জ্বলন্ত কয়লার ওপর দিয়ে হাঁটবেন তাদের একে বরফের টুকরা ভাবনে মানা করেন রবিন্স। বরং একে গরম কিছু বলেই মনে করুন। এর ওপর দিয়ে কৌশল মেনে হেঁটে চলে যেতে হবে। তবে সান জোসে সেই সময় উপস্থিত থাকা অগ্নি নির্বাপক দলের প্রধান দার্শনিকের মতো বলেন, তবে এই কয়লার ওপর দিয়ে হাঁটতে আমরা মানুষকে নিরুৎসাহিত করি।
এম ইউ







