Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই, ২০১৯ , ৮ শ্রাবণ ১৪২৬

মোহাম্মদ ময়েজউদ্দিন

জন্মঃ ১৭ মার্চ, ১৯৩০
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যেসব সূর্যসন্তানের নাম ভাস্বর হয়ে রয়েছে, তাঁদের একজন হলেন শহীদ মোহাম্মদ ময়েজউদ্দিন। তিনি ছিলেন রাজনীতিবিদ, আইনজীবী, সমাজকর্মী ও মুক্তিযোদ্ধা। সকল পরিচয়ে তিনি ছিলেন উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের মতো ভাস্বর। তিনি মাটি ও মানুষের জন্য যে অবদান রেখে গেছেন তা অবিস্মরণীয়।

জন্ম ও পরিবার
মোহাম্মদ ময়েজউদ্দিন ১৯৩০ সালের ১৭ মার্চ গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বড়হরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা মো. ছুরত আলী ও মা মোসাম্মৎ শহর বানু। বাবা-মার চার ছেলের মধ্যে তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠ। শহীদ ময়েজউদ্দিনের উত্তরসূরি হিসেবে তাঁর কন্যা মেহের আফরোজ চুমকি। তিনি নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন।

শিক্ষাজীবন
মোহাম্মদ ময়েজউদ্দিনের শিক্ষাজীবন শুরু হয় নোয়াপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরে রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৪৮ সালে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ভর্তি হন ঢাকা কলেজে। ১৯৫০ সালে প্রথম বিভাগে আইএ পাস করেন। এর ১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্র্রবিজ্ঞানে বিএ (সম্মান) ও ১৯৫৫ সালে এমএ ডিগ্রী অর্জন করেন। ১৯৫৬ সালে সিএসপিতে (পরে বিসিএস) কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েও স্বাধীনচেতা ময়েজউদ্দিন সরকারী চাকরিতে যোগদান না করে ১৯৬০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি পাস করেন।

রাজনীতিতে প্রবেশ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হতে থাকেন। ১৯৬৮ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান বাঙালীর অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানসহ ৩৫ জনকে অভিযুক্ত করে তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়েরের মাধ্যমে চক্রান্ত শুরু করে। সে সময় আওয়ামী লীগের বেশিরভাগ নেতা ও সংগঠক কারাগারে। তখন আওয়ামী লীগের নেতা মোহাম্মদ ময়েজউদ্দিন দেশব্যাপী সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। সঙ্গে সঙ্গে বাঙালীর মুক্তির সনদ ৬-দফা প্রচারে নেতৃত্বের ছাপ রাখেন। ঐতিহাসিক আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা পরিচালনা এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল সংগ্রহ করার উদ্দেশ্যে যে কমিটি গঠিত হয়, সেই কমিটির আহ্বায়ক নির্বাচিত হন জননেতা মোহাম্মদ ময়েজউদ্দিন। দেশব্যাপী ‘মুজিব তহবিল’-এর জন্য কুপন বিক্রয় করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন তিনি। সেই তহবিলের অর্থ দিয়েই আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অভিযুক্তদের আইনি সহায়তাদানের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করেন। পাশাপাশি আইয়ুববিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনের যথেষ্ট সাংগঠনিক তৎপরতা চালিয়ে আন্দোলনকে বেগবান করেন। তখন তিনি ঢাকা শহর আওয়ামী লীগের সক্রিয় একজন নেতা ছিলেন। অন্যদিকে শিক্ষা জীবন শেষে শহীদ মোহাম্মদ ময়েজউদ্দিন আইন পেশায় যোগদান ও ঢাকার কমলাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হন। তিনি চেয়ারম্যান থাকাবস্থায় আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনগুলোকে সংগ্রাম-আন্দোলনসহ রাজনৈতিক কর্মকান্ডে সহযোগিতা করেন। ১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচনে তিনি তাঁর নিজ এলাকা কালীগঞ্জ থেকে প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। জননেতা ময়েজউদ্দিন বন্ধু ও অনুগত জনের প্রতি গভীর ভালবাসা, দেশপ্রেম, কর্তব্য নিষ্ঠা, কঠোর পরিশ্রম আর সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে রাজনৈতিক অঙ্গনে একটা আদর্শের জায়গা তৈরি করতে সক্ষম হন।

বাঙালীর মহান নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একনিষ্ঠ সহযোগী ও কর্মী ছিলেন শহীদ মোহাম্মদ ময়েজউদ্দিন। ১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই তাজউদ্দীন আহমদের তত্ত্বাবধানে আস্থাবান রাজনৈতিক সহকর্মী মোহাম্মদ ময়েজউদ্দিন দলীয় কর্মকান্ডে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু কর্তৃক স্বাধীনতা ঘোষণার পর বর্বর পাকিস্তানী বাহিনীর যে হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়, তা নিজ চোখে ঢাকায় অবলোকন করেন। এই অবস্থায় তিনি ও তাঁর পরিবার ঢাকা ত্যাগ করে নিজ গ্রাম বড়হরায় চলে আসেন। মার্চ মাসের শেষদিকে বাংলাদেশকে শত্রুমুক্ত করার অভিপ্রায়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলার উদ্দেশে রওনা হন। মুক্তিযুদ্ধকালীন ভারতে তিনি সার্থক সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন।

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ দেশ শত্রুমুক্ত হয়। মুক্তিযুদ্ধের আরও কয়েকজন সংগঠকসহ মোহাম্মদ ময়েজউদ্দিন ঢাকায় আসেন ১৮ ডিসেম্বর। স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের নেতাদের ঢাকায় পৌঁছতে আরও কয়েকদিন সময় লাগবে বিধায় আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলার একটি সাংগঠনিক কাঠামো দাঁড় করানোর লক্ষ্যে নাগরিক সভার আয়োজন করা হয়। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সোনার বাংলা গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন শহীদ ময়েজউদ্দিন। তিনি বঙ্গবন্ধুর বিশ্বাসভাজন ব্যক্তি ছিলেন। কালীগঞ্জের সকল স্তরের মানুষের কাছে তিনি খুবই জনপ্রিয় ছিলেন। তাই ১৯৭৩ সালের সাধারণ নির্বাচনে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হতে তাঁর তেমন কষ্ট হয়নি।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর ময়েজউদ্দিন কয়েকজনকে নিয়ে প্রতিরোধ আন্দোলনের প্রস্তুতি নেন, যা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

তাঁর অবদান
যে জনপদে শহীদ ময়েজউদ্দিনের জন্ম, সেখানকার জনসাধারণের কল্যাণ সাধনে তিনি সর্বদা নিয়োজিত ছিলেন। তিনি দাতব্য চিকিৎসালয়, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, মাতৃসদন কেন্দ্র স্থাপন করেন। তিনি রোগীদেরকে বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সমন্বিত প্রকল্প হিসেবে তাঁর নিজ এলাকার ছয়টি গ্রামের গ্রামবাসীদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে বেকারত্ব হ্রাসের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এ সব উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থ সংস্থানের জন্য বিদেশী দাতা-সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁর আন্তরিক যোগাযোগের ফলে এক বিদেশী দাতা সংস্থা শহীদ ময়েজউদ্দিনের নিজ গ্রামে ১৯৮৩ সালে ৯ কোটি টাকার প্রাক্কলন করে উন্নয়নমূলক কর্মসূচীর অবকাঠামোসহ স্থাপনা তৈরি করে দেয়। সেই স্থাপনায় রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ও মাতৃসদন কেন্দ্রের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। আমৃত্যু তিনি ছিলেন বাংলাদেশ পরিবার-পরিকল্পনা সমিতির অবৈতনিক মহাসচিব ও রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির ভাইস চেয়ারম্যান। তাঁর নিজ এলাকার নোয়াপাড়া ময়েজউদ্দিন আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের আমৃত্যু প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। তিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আইন পেশা ও রাজনীতি দু’টিতেই সমানভাবে পারদর্শিতা, কৃতিত্ব ও একনিষ্ঠতার পরিচয় দিয়েছেন। জীবনের সকল সঞ্চয় ও আহরণকে তিনি অকাতরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মাদ্রাসা ও মন্দিরসহ সামাজিক প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে বিলি করেন।

সম্মাননা
২০০১ সালে শহীদ মোহাম্মদ ময়েজউদ্দিনকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।

মৃত্যুবরণ
স্বৈরাচারী শাসক হটাও ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবিতে ১৯৮৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল চলাকালে কালীগঞ্জে হরতাল-পিকেটিংয়ের নেতৃত্বে ছিলেন জননেতা ময়েজউদ্দিন। গণতান্ত্রিক সংগ্রামের অকুতোভয় এই সৈনিক আন্দোলনরত অবস্থায় স্বৈরাচারী সরকারের ঘাতকদের হাতে নির্মমভাবে শহীদ হন।

 


Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে