Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ , ৫ আশ্বিন ১৪২৬

ড. হাসান শহীদ

সৌরশক্তি দিয়েই চলবে হেলিকপ্টার। উদ্ভাবন করেছে ব্রিটেনের কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের একটি গবেষক দল। যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন একজন বাংলাদেশি। তিনি ড. হাসান শহীদ। নেতৃত্ব দিয়েছেন ক্যাপসুল রোবট উদ্ভাবনেও।

জন্ম এবং পরিবার
ড. হাসান শহীদের জন্ম ১৯৬৯ সালে বরিশালের বাকেরগঞ্জ থানার হানুয়া গ্রামে। বাবার নাম ইসমাইল সিকদার, মা বেগম সাইদুন্নেছা। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক।

শিক্ষা জীবন
বরিশাল ক্যাডেট কলেজ থেকে এসএসসি এবং এইচএসসি উভয় পরীক্ষায় যশোর বোর্ডের সম্মিলিত মেধা তালিকায় তৃতীয় স্থান অধিকার করেন। এরপর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের 'অ্যাপ্লাইড ফিজিক্স, ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং' বিভাগে। স্নাতকে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন। স্নাতকোত্তর শেষে ১৯৯৬ সালের জুন মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় যোগ দেন। সেখান থেকে ১৯৯৭ সালের সেপ্টেম্বরে পিএইচডির জন্য চলে যান ব্রিটেনের শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল রোবটের হাত নিয়ন্ত্রণ। ২০০১ সাল থেকে কুইন মেরিতে শিক্ষকতা করছেন।

তার লেখালেখি জীবন
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা এবং গবেষণার পাশাপাশি লেখালেখি করেন বিজ্ঞান ও সমসাময়িক বিষয়ে। সময় প্রকাশনী থেকে ২০০৭ সালে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর 'এলিয়েন : সম্ভাবনা ও সন্ধান'। ২০০৮ সালে প্রকাশিত হয়েছে 'মহাবিস্ময়ের মহাকাশ'। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অবস্থায় ছিলেন 'মাসিক কম্পিউটার জগৎ' পত্রিকার কন্ট্রিবিউটিং এডিটর। সে সময় প্রকাশিত 'কম্পিউটার বিজ্ঞান (প্রশ্ন-উত্তরে)' এবং 'মাধ্যমিক কম্পিউটার শিক্ষা' বই দুটির তিনি সহলেখক। লন্ডনের স্প্রিংগ্রার প্রকাশিত 'প্যারালাল কম্পিউটিং ফর রিয়েল-টাইম সিগন্যাল প্রসেসিং অ্যান্ড কন্ট্রোল' বইটিরও সহলেখক ড. হাসান শহীদ।

তার উদ্ভাবনীর শুরুর কথা
২০১১ সাল। লন্ডনের কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি অনার্স প্রকল্প শুরু করেন ইরাকি ছাত্র আলী আবিদ আলী। প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক ড. হাসান শহীদ। পরিকল্পনাও ড. হাসানের। এই প্রকল্পের মাধ্যমে তৈরি হয় সোলার হেলিকপ্টারের মডেল। কোনো সমস্যা ছাড়াই সেটি আকাশে উড়তে সক্ষম হয়। সহজে গতি নিয়ন্ত্রণও সম্ভব হয়। তবে কিছু সীমাবদ্ধতা থেকে যায়। শুধু সৌরশক্তির মাধ্যমে চলতে পারত না এটি, ব্যাটারির সাহায্য নিতে হতো। হেলিকপ্টারে যুক্ত সোলার প্যানেলের মাধ্যমে চার্জ করা হতো ব্যাটারি। এ সীমাবদ্ধতা কাটাতে নতুন করে কাজ শুরু হয়। ব্যাটারি বা অন্য কোনো জ্বালানি ছাড়া শুধু সৌরশক্তি দিয়েই হেলিকপ্টার চালাতে চাইছিলেন গবেষক দল। প্রকল্পটি স্নাতকোত্তর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়। আলী আবিদ আলীর সঙ্গে যোগ দেন আরো ছয়জন ছাত্র। এবার ড. হাসান শহীদের সঙ্গে সহ-তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে যোগ দেন অধ্যাপক আন্তনিও মুনজিয়া।
তত্ত্বীয় গবেষণা আর কম্পিউটারে নকশা চলতে থাকে একসঙ্গে। এটি সম্ভব হলে তা হবে বিশ্বে প্রথম, আকাশপথের জন্য সম্পূর্ণ নতুন কিছু- এ ছিল কাজের অনুপ্রেরণা। সাপ্তাহিক নির্ধারিত সভায় আলোচনা করা হয় কাজের অগ্রগতি, সমস্যার খুঁটিনাটি এবং তা উত্তরণের উপায় নিয়ে। হালকা, মজবুত আর কম শক্তি ব্যয়- এ তিনটি লক্ষ্য সামনে রেখে অনেকগুলো নকশা করা হয়। উপযুক্ত নকশাটি বেছে নিতে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলে। বিভিন্ন রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয় সঠিক নির্মাণ উপাদান। পাঁচ মাসের পরিশ্রমে তৈরি হয়ে যায় পৃথিবীর প্রথম সোলার হেলিকপ্টার, নাম দেওয়া হয় সোলারকপ্টার। পুরো সিস্টেমের ওজন দাঁড়ায় এক কেজিরও কম। কাজ শেষ হয় এ বছরের মার্চের শুরুতে।

উড়ে এলো ল্যাবের আকাশ
সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সোলারকপ্টারটি ল্যাবে ওড়ানো হবে। সে জন্য ল্যাবে আগে থেকেই তৈরি করা হয় হ্যালোজেন বাতির যোগে সান সিমিউলেটর। সিমিউলেটর অন করে রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে চালু করতেই ঘুরতে শুরু করে চারটি প্রপেলার (মোটরচালিত পাখা)। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বেইজ প্ল্যাটফর্ম থেকে ওপরে উঠে আসে সোলারকপ্টার। দিনটি ছিল ৬ মার্চ। সোলারকপ্টার প্রথম শূন্যে ভাসল।
কপ্টারটি আসলে প্রপেলারযুক্ত একটি কোয়াডরোটর। চার প্রপেলারের কপ্টারকে বলা হয় কোয়াডরোটর। ব্যাটারি বা অন্য কোনো রকম জ্বালানির প্রয়োজন হয় না এর। ল্যাবের সান সিমিউলেটরের পরীক্ষায় এটি আধা মিনিট পর্যন্ত উড়তে পারে। তবে বাস্তব সূর্যালোকে পরীক্ষা করা হয়নি। এই গ্রীষ্মেই এটি অনেক সময় ধরে আকাশে থাকতে পারবে বলে আশা করছেন ড. হাসান। তবে শিগগিরই আরো কিছু কাজ সম্পন্ন হলে গড়পড়তা সূর্যালোক থাকা পর্যন্ত এটি আকাশে উড়তে পারবে। বাংলাদেশের কোনো রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত উড়তে পারবে। তবে খুব সকালে, সন্ধ্যার আগে, রাতে বা মেঘাচ্ছন্ন আকাশে উড়তে গেলে ব্যাটারির সাহায্য নিতে হবে। যখন সূর্যালোক থাকবে না, ব্যাটারি দিয়ে চলবে। যে ব্যাটারি চার্জ হবে হেলিকপ্টারের সোলার প্যানেলের মাধ্যমে, সৌরশক্তি থেকে।

উড়ে গেল ওড়ার খবর
ব্রিটেনের বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রির প্রতিনিধিদের সামনে স্নাতকোত্তর পর্যায়ের ১৭টি প্রজেক্ট উপস্থাপন করা হলে ন্যাশনাল ফিজিক্স ল্যাবরেটরির শ্রেষ্ঠ পুরস্কার জিতে নেয় সোলারকপ্টার। এ খবর ছড়িয়ে পড়ে ফেসবুক আর ব্লগে। ইউটিউবের ভিডিও ব্যাপক সাড়া জাগায় উৎসাহীদের মধ্যে। সেখানে সোলারকপ্টারের গবেষণা থেকে শুরু করে নির্মাণ উপকরণ, কিভাবে তৈরি করা হয়েছে, উপযোগিতা এবং ব্যবহার নিয়ে আলোচনা রয়েছে। গিজম্যাগ, ফার্স্ট কম্পানি, ডিজাইনবুমসহ বিশ্বের কয়েকটি নামকরা টেকনোলজিবিষয়ক ম্যাগাজিন সোলারকপ্টারের ওপর প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ডিসকভারি চ্যানেলের 'ডেইলি প্ল্যানেট শো' সোলারকপ্টারের ওপর একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রচার করেছে।

চলবে গবেষণার কাজ
এ গবেষণাকে প্রয়োগ বা বাস্তব পর্যায়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এখন ড. হাসান শহীদের মূল লক্ষ্য। ইতিমধ্যে পরের ব্যাচের স্নাতকোত্তরের ছাত্রদের জন্য নতুন কাজের তালিকা তৈরি করে পরিকল্পনা প্রস্তাব করেছেন। বর্তমান দলটিও তাদের গ্র্যাজুয়েশন শেষে গ্রীষ্মে আরো কিছু কাজ করতে পারবে বলে আশা করছেন তিনি।
এই কুইন মেরিতে অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কাজ আজকের নয়। ১০০ বছরেরও আগে ব্রিটেনের প্রথম 'অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং' বিভাগ চালু হয়েছিল এখানে। এখানে শিক্ষকতার শুরু থেকে হেলিকপ্টার নিয়ে গবেষণা করছেন ড. হাসান।

শিক্ষকতায়ও সেরা
গবেষণার পাশাপাশি শিক্ষকতায় হাসান শহীদের বিশেষ কৃতিত্ব রয়েছে। কুইন মেরির ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দ্বিতীয় বর্ষের 'ইলেকট্রিক্যাল টেকনোলজি' কোর্সে 'প্রবলেম বেইজড লার্নিং (পিবিএল)' ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন তিনি। ২০১১ সালে কুইন মেরির 'ড্রেপার্স প্রাইজ ফর ডেভেলপমেন্ট ইন লার্নিং অ্যান্ড টিচিং' পুরস্কার পান। ইউনিভার্সিটির 'ড্রেপার্স অ্যাওয়ার্ড ফর অ্যাক্সিলেন্স ইন টিচিং'-এর জন্যও কয়েকবার নির্বাচিত হন। এ ছাড়া কুইন মেরিতে তাঁর অধীনে এ পর্যন্ত চারটি অনার্স প্রজেক্ট 'ইনস্টিটিউশন অব মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার্স'-এর পুরস্কার পেয়েছে। প্রজেক্টগুলোর বিষয় ছিল হেলিকপ্টার, সোলার হেলিকপ্টার এবং রোবট ডিজাইন, মডেলিং ও কন্ট্রোল।

ড. হাসানের ক্যাপসুল রোবট
সোলারকপ্টারের মতো আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প রয়েছে ড. হাসানের। সেটি হলো, নিয়ন্ত্রণ করা যায় এমন ক্যাপসুল রোবট উদ্ভাবন। মানুষের শরীরের খাদ্যনালিতে (জিআই ট্রাক্ট) ক্যান্সার, রক্তক্ষরণ, আলসার ইত্যাদি রোগ নির্ণয়ে ব্যবহার করা হয় ক্যাপসুল রোবট। গিভেন ইমেজিং, অলিম্পাস, আর এফ সিস্টেমসহ বেশ কিছু বহুজাতিক কম্পানির ক্যাপসুল রোবট বাজারে চালু রয়েছে। ক্যাপসুলের মতোই পানি দিয়ে গিলতে হয় এ রোবট। গেলার সঙ্গে সঙ্গে তা স্বাভাবিক খাবারের মতো নালির ভেতর দিয়ে বাহিত হয়ে নির্দিষ্ট সময় পর শরীর থেকে বের হয়ে যায়। এ সময় রোবটের ভেতরে সংযুক্ত ছোট ক্যামেরা প্রতি সেকেন্ডে কয়েকটি করে ছবি পাঠাতে থাকে। সে ছবি বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার খাদ্যনালির রোগ নির্ণয় করে থাকেন। এটি এন্ডোস্কপির বিকল্প হিসেবে কাজ করে। তবে এ সিস্টেমের অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। খাদ্যনালির কোথাও কোনো রোগের লক্ষণ দেখা গেলে বিভিন্ন দিক থেকে ছবি তোলার জন্য এ রোবট সেখানে থামতে বা ঘুরতে পারে না। প্রয়োজনে এর গতিও বাড়ানো বা কমানো যায় না। এসব সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার জন্য নিয়ন্ত্রণ করা যায় এমন ক্যাপসুল রোবট প্রয়োজন। এ জন্য থাকা চাই ক্যাপসুলের নিজস্ব চলার ব্যবস্থা। ক্যাপসুলে পা, চাকা বা ম্যাগনেট যুক্ত করার জন্য গবেষণা চলছে। ড. হাসান এ গবেষণা চালিয়ে আসছেন অনেক দিন ধরে। সোলারকপ্টার গ্রুপের মতো এ বিষয়ে তাঁর অন্য একটি মাস্টার্স প্রজেক্ট রয়েছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে এর মধ্যে খাদ্যনালিতে ক্যাপসুল রোবট চলার দুটি বিশেষ পদ্ধতির উদ্ভাবন করা হয়েছে এবং তা কুইন মেরি ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ডের জন্য নির্বাচিত হয়েছে।


Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে