Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ , ১ আশ্বিন ১৪২৬

ড. আনিস রহমান

২০০৮ সালে স্পেকট্রোমিটার আবিষ্কারের পর প্রবাসী এই বাংলাদেশি বিজ্ঞানী চলে আসেন আলোচনায়। তাঁকে নিয়ে লেখালেখি শুরু হয় মার্কিন গণমাধ্যমে। এনবিসির মতো নামি টেলিভিশনও সংবাদ প্রচার করে। স্পেকট্রোমিটার মানুষের শরীরে থাকা যেকোনো ধরনের বিস্ফোরক সহজে শনাক্ত করতে পারে। যন্ত্রটি সম্পর্কে ড. আনিস বলেন, 'এখন আমাদের চারপাশের সবাই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গোটা দুনিয়ায় খরচ করা হচ্ছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার। নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় আনা হচ্ছে হাসপাতাল থেকে শুরু করে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত। মেটালিক কোনো বিস্ফোরক হলে সেটা যেকোনো জায়গায়ই ধরা পড়ে। এ জন্য ব্যবহার করা হয় সাধারণ এক্স-রে মেশিন। কিন্তু এখন ব্যবহার করা হচ্ছে পাউডারসহ নানা রাসায়নিক বিস্ফোরক, যেগুলো সাধারণ মেশিনে ধরা যায় না। এ সমস্যা সমাধানে দীর্ঘ ও ক্লান্তিহীন গবেষণার পর আমরা এই স্পেকট্রোমিটার আবিষ্কার করেছি।'

শিক্ষা জীবন
আনিস রহমানের জন্ম পাবনা জেলায়। ছোটবেলা থেকেই ছিলেন মেধাবী ছাত্র। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের পর ভর্তি হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিষয় ছিল পদার্থবিজ্ঞান। নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে লাভ করেন ব্যাচেলর ডিগ্রি। হন প্রথম শ্রেণীতে দ্বিতীয়। মাস্টার্সও করেন একই বিষয়ে। এবার হন প্রথম শ্রেণীতে প্রথম। উচ্চতর লেখাপড়ার জন্য এরপর বৃত্তি নিয়ে চলে যান যুক্তরাষ্ট্রে। উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যের মার্কুইটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএস করেন সলিড-স্ট্যাট ফিজিক্সে। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডিও করেন ১৯৯৪ সালে। পোস্ট-ডক্টরাল ডিগ্রি লাভের জন্য এরপর ভর্তি হন নিউ ইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত টানা তিন বছর এখানে লেখাপড়া করেন। উদ্ভাবন করেন পলিমারিক ও ন্যানো পার্টিক্যাল থিন ফিল্ম ফ্যাসিলিটিস।

ড. আনিস রহমান বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশনের রেডিয়েশন কন্ট্রোল অফিসার হিসেবে নন ডিগ্রি সার্টিফিকেট অর্জন করেন। একই সঙ্গে মালয়েশিয়ার এমআইএনটি থেকে নন ডিগ্রি সার্টিফিকেট লাভ করেন 'রেডিয়েশন প্রোটেকশন অ্যান্ড সেফটি প্রোগ্রাম ইন ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেডিওগ্রাফি' বিষয়ে। আনিস রহমানের ঝুলিতে আরো আছে সিঙ্গাপুরের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে রেডিয়েশন প্রোটেকশন অ্যান্ড ওয়েস্ট সেফটি ইনফ্রাসট্রাকচার বিষয়ে নন ডিগ্রি সার্টিফিকেটও।

পেশাগত জীবন
কেবল শিক্ষাগত জীবনেই নয়, আনিস রহমান সাফল্য পেয়েছেন কর্মজীবনেও। পোস্ট-ডক্টরাল ডিগ্রি নেওয়ার পর যোগ দেন আমেরিকার 'পটোম্যাক ফটোনিক্স মেরিল্যান্ড' নামের একটি প্রতিষ্ঠানে। এ প্রতিষ্ঠানে থাকার সময় 'লেজার ডিরেক্ট রাইট ওয়ার্কস্টেশন' নিয়ে কাজ করেন। লেজার শক্তিকে আরো উন্নত করা ছিল যার মূল লক্ষ্য। ২০০০ সালে যোগ দেন পেনসিলভানিয়ার হ্যারিসবার্গের টয়কো ইলেকট্রোনিক্স ফাইবার অপটিকস ডিভিশনে। এরপর ক্যালিফোর্নিয়ার স্যানিভ্যালির ইন্টেলিজেন্ট ফাইবার অপটিক সিস্টেমে কাজ করেন। এখানে ছিলেন পরামর্শক, ২০০২ সাল পর্যন্ত।

স্বীকৃতি
* ১৯৯৭ সালে তালিকাভুক্ত হন 'হুজ হু' অব দ্য প্রফেশনাল' হিসেবে।
* কাজ করেছেন বিশ্ববিখ্যাত কম্পিউটার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ইন্টেলের 'ইন্টেল ট্যালেন্ট সার্চ'-এর মেন্টর হিসেবে।
* গেল বছর থেকে কাজ করে যাচ্ছেন 'দ্য স্মল কেমিক্যাল বিজনেস ডিভিশন অব দি আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটি'র প্ল্যানিং চেয়ার ও বুথ কো-অর্ডিনেটর হিসেবে।
* ২০১২ সাল থেকে জড়িত রয়েছেন টেকনোলজি ট্রান্সফার সো-কেস 'সিএলইও'র কোর কমিটির সদস্য হিসেবে।
* ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন 'সাউদার্ন পেনসিলভানিয়ান সেকশন অব দি আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটি'র প্রধান হিসেবে।
* ২০১১ সালের এপ্রিলে 'সিএলইওর ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ড' পুরস্কার লাভ করেন।

স্পেকট্রোমিটার ও গতানুগতিক নিরাপত্তা বলয়
গতানুগতিক নিরাপত্তা বলয় সাধারণত আকারে অনেক বড় হয়। সহজে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তর করা যায় না। খরচও করতে হয় প্রচুর। কিন্তু এর পরও এর মাধ্যমে মেটালিক বিস্ফোরক ছাড়া অন্য কোনো ধরনের বিস্ফোরক ধরা পড়ে না। তবে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি মাত্রায় বেড়েছে কেমিক্যাল পাউডারজাতীয় বিস্ফোরকদ্রব্যের ব্যবহার। এসব বিস্ফোরক ধরা পড়ে না গতানুগতিক নিরাপত্তা বলয়ে। কিন্তু স্পেকট্রোমিটার যেকোনো ধরনের বিস্ফোরকদ্রব্যই শনাক্ত করতে পারে। এ ছাড়া এ মেশিন যেন ভুল সিগন্যাল না দেয় অথবা সন্ত্রাসীরা যাতে সিগন্যাল আড়াল করতে না পারে, সে জন্য বিশেষ ধরনের প্রাযুক্তিক কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মধ্যে আছে অপটিক্যাল ফাইবার, নানা ধরনের সেন্সর ও ন্যানো প্রযুক্তির আলোকরশ্মি। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো স্পেকট্রোমিটারের আকার- মেশিনটি সহজেই একটি টেবিলে বসানো সম্ভব। বহনেও খুব একটা সমস্যা হয় না।
স্পেকট্রোমিটারের প্যাটেন্ট ড. আনিসের হলেও যুক্তরাষ্ট্রের হয়েই প্রযুক্তিটি ব্যবহার করছেন তিনি। অনেক রাষ্ট্রের কাছেই পাঠানো হয়েছে স্পেকট্রোমিটার। এর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব ও ভারত। প্রযুক্তিটির সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে আরো অনেক দেশ এই প্রযুক্তি ব্যবহারে আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের শর্ত অনুসারে- যুক্তরাষ্ট্র বা তার বন্ধু নয়, এমন কোনো দেশের কাছে এই প্রযুক্তি বিক্রি করা যাবে না। সে তালিকায় রয়েছে রাশিয়া, ইরানও। আরেকটি বিষয় হলো, স্পেকট্রোমিটার বেশ দামি। ড. আনিস বলেন, 'আমাদের এই যন্ত্রের দাম প্রায় আড়াই লাখ মার্কিন ডলার। ভবিষ্যতে হয়তো দাম কমবে। তবে নিশ্চিত করে বলা যায় না। কারণ চাহিদা ও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্পেকট্রোমিটারের উন্নততর সংস্করণ তৈরি করা হবে। তাই এটির বাজারমূল্য সময়ের ওপর নির্ভর করবে। আর স্পেকট্রোমিটারের সব ধরনের বাজারজাতকরণ ও বিনিময় ক্ষমতা নিউ জার্সির একটি কম্পানির মাধ্যমে হয়।'

অ্যাপ্লায়েড রিসার্চ অ্যান্ড ফটোনিক্স ইনক
যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ার হ্যারিসবার্গভিত্তিক প্রতিষ্ঠান অ্যাপ্লায়েড রিসার্চ অ্যান্ড ফটোনিক্স ইনকের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও চিফ টেকনোলজি অফিসার ড. আনিস রহমান। এটি বিশ্বের হাতেগোনা কয়েকটি অ্যাপ্লায়েড রিসার্চ ও ফটোনিক্স প্রতিষ্ঠানের অন্যতম। ড. আনিসের হাত ধরেই প্রতিষ্ঠানটি প্রায় এক দশক আগে, ২০০৩ সালের জানুয়ারি মাসে যাত্রা শুরু করেছিল। অ্যাপ্লায়েড রিসার্চ অ্যান্ড ফটোনিক্স ইনকের অন্যতম লক্ষ্য ন্যানো ফটোনিক ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট অর্থাৎ ছোট চিপ বা যন্ত্রের মধ্যে সূক্ষ্মতর যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে শক্তিশালী প্রযুক্তি তৈরি করা।
অ্যাপ্লায়েড রিসার্চ অ্যান্ড ফটোনিক্স ইনকের এ পর্যন্ত সবচেয়ে সাড়া জাগানো আবিষ্কার উচ্চ শক্তিশালী ও কার্যক্ষমতাসম্পন্ন টেরাহার্টজ টেকনোলজি। বায়োলজি, বায়োমেডিক্যাল ও বায়োফার্মা থেকে শুরু করে সব ধরনের লাইফ সায়েন্সে এটির ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। ড. আনিস জানান, অ্যাপ্লায়েড রিসার্চ অ্যান্ড ফটোনিক্স ইনকের যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে শিল্প খাতের উন্নয়নে। এই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ১০ জন।

নাসার স্বীকৃতি
বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল অ্যারোনটিক্স অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা নাসার বিশ্বসেরা ৫০ বিজ্ঞানীর তালিকার অন্যতম বিজ্ঞানী হিসেবে মনোনীত হয়েছেন আনিস রহমান। নাসা তাঁকে ফেলোও মনোনীত করেছে। ২০০৮ সালে নাসার 'টেক ব্রিফ ন্যাশনাল ফিফটি ন্যানো অ্যাওয়ার্ড' জয় করেন আনিস রহমান। ন্যানো টেকনোলজিতে টেরাহার্টজ রেডিয়েশন সোর্স ও স্পেকট্রোমিটার আবিষ্কারের জন্য উদ্ভাবক বিজ্ঞানী হিসেবে এ পুরস্কার লাভ করেন তিনি।

তার লেখালেখি
রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, ন্যানো টেকনোলজি, কেমিস্ট্রি, প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট, বায়োটেকনোলজি, থিন ফিল্ম, লাইফ সায়েন্স, সারফেস কেমিস্ট্রি পলিমার, ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স, অপটিক্স, ক্যারেক্টারাইজেশন, স্পেকট্রোকপি, ডিজাইন অব এক্সপেরিমেন্ট বিষয়ে গবেষণা রয়েছে আনিস রহমানের। গবেষণামূলক কাজের পাশাপাশি লেখালেখিও করেন তিনি। এ পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত রচনা প্রায় ৭০০। যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত গবেষণাধর্মী লেখা আছে সাতটি, একক কনফারেন্স পেপার রয়েছে ৩০টিরও বেশি।

অ্যাওয়াড জয়
২০০৮ সালে জয় করেন নাসার 'টেক ব্রিফ ন্যাশনাল ফিফটি ন্যানো অ্যাওয়ার্ড', (ডানে) ২০১১ সালে লাভ করেন 'লেজার ফোকাস ওয়ার্ল্ড ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ড'।


Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে