Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, সোমবার, ১১ নভেম্বর, ২০১৯ , ২৭ কার্তিক ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.8/5 (25 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১০-২৩-২০১১

বাড়ছে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে গণমানুষের ক্ষোভ

ফকির ইলিয়াস


বাড়ছে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে গণমানুষের ক্ষোভ
ওয়াল স্ট্রিটের পাশ দিয়ে আবারো হেঁটে গেলাম। যারা বিক্ষোভ করতে এসেছে, এরা প্রায় সকলেই বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে আগত। নিউইয়র্কের মানুষের অংশগ্রহণ কম। এর কারণ আছে। এরা কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত। রাস্তায় বাসা বেঁধে বিক্ষোভ করার সময় নেই।
ইতোমধ্যে ঘটে গেছে অনেক বিড়ম্বনা। ওয়াল স্ট্রিট এলাকার বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন সিটি কর্তৃপক্ষের কাছে। বিক্ষোভকারীরা রাস্তাঘাট ময়লা করছে। পরিবেশ দূষণ করছে। ফলে পুলিশ পাহারা বাড়িয়েছে। রাস্তাঘাট পরিষ্কার করতে হয়েছে ঐ বিক্ষোভকারীদেরকেই।
লোয়ার ম্যানহাটানের জুকটি পার্কে বিক্ষোভকারীরা অবস্থান নিতে শুরু করে। তাদের দাবি- ওয়াল স্ট্রিট দখল করো। পুঁজিবাদের প্রতীক ওয়াল স্ট্রিট দখল করার আহ্বান জানিয়ে নিউইয়র্কে বিক্ষোভ শুরু হয় গত ১৭ সেপ্টেম্বর। পরে তা পুরো যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়ে। এদিকে শুরু থেকেই কয়েকশ বিক্ষোভকারী ওয়াল স্ট্রিটের কাছে এই ছোট পার্কে শিবির স্থাপন করে সেখানে অবস্থান করছে।
সামন্তবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যুদ্ধের মহড়ার নামে অর্থ অপচয়, বেকারত্ব, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, প্রভৃতি এই বিক্ষোভের কারণ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। যুক্তরাষ্ট্রে যে বিক্ষোভ চলছে, এতে অংশগ্রহণকারীরা কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যস্ত নয় বলেও জানিয়েছে আয়োজকরা।
দিনে দিনে পুঁজিবাদের লোভ-লালসা, ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য ও সরকারের ব্যয় সংকোচননীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে দেশে দেশে। যুক্তরাষ্ট্রের ?ওয়াল স্ট্রিট দখল করো? ও স্পেনের ?ক্ষুব্ধ জনতা?র আন্দোলনের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে আমেরিকা-ইউরোপ হয়ে আফ্রিকা, এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত।
বিক্ষোভের আয়োজকরা বলছেন, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, ল্যাটিন আমেরিকা, এশিয়া ও আফ্রিকার ৮২টি দেশের ৯৫১টি শহরে এ বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। বিক্ষোভ ছড়িয়ে দিতে তারা সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট ফেসবুক ও মাইক্রোব্লগিং ওয়েবসাইট টুইটার ব্যবহার করছে ব্যাপকভাবে।
মূলত অর্থনৈতিক অসমতা, বেকারত্ব ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতেই বিশ্বের বিভিন্ন শহরের বিক্ষোভে নামে মানুষ। তবে প্রতিটি শহরে বিক্ষোভকারীদের ক্ষোভ ও প্রতিবাদের বিষয়ে ভিন্নতা রয়েছে। যেমন বাংলাদেশে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারিই হয়ে উঠেছে মুখ্য বিষয়। একটি বেশ বড় বিক্ষোভ হয়েছে ইতালির রাজধানী রোমে। সেখানে দুই লাখেরও বেশি মানুষ বিক্ষোভে যোগ দেয়। তাদের অনেকেই প্রধানমন্ত্রী সিলভিও বারলুসকোনি সরকারের ঋণসংকট তদারকির ব্যর্থতায় ক্ষুব্ধ। রোমে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা একটি ব্যাংকে হামলা ও গাড়িতে আগুন দিয়েছে। বিক্ষোভ দমনে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করেছে। বিক্ষোভকারীদের লাঠিপেটা এবং কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের লন্ডনে রাস্তায় নেমে আসে আট শতাধিক মানুষ। তারা পুঁজিবাদবিরোধী বিভিন্ন সে?াগান দেয়। বাজেট কাটছাঁট ও মুনাফালোভীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায় তারা। এ ছাড়া ?সরকারি ব্যয় হ্রাস নয়? ও ?গোল্ডম্যান স্যাকসে শয়তানের কাজ? লেখা ব্যানার বহন করে তারা। শত শত জনতার সঙ্গে উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জও এ বিক্ষোভে শরিক হন।
গেলো ১৫ মে স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে সর্বপ্রথম বেকারত্ব ও দুর্নীতিবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়। এরপর তা অন্যান্য শহরেও ছড়িয়ে পড়ে। মাদ্রিদের বিভিন্ন অংশে হাজার হাজার জনতার বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। তাদের সবার গন্তব্য ছিল পুয়েতা দেল সোল। সেখানে তারা রাতভর বিক্ষোভের প্রস্তুতি নিয়েছে। মাদ্রিদের ২৪ বছর বয়সী এক বিক্ষোভকারী প্রকৌশলের ছাত্র আন্দ্রেয়া মুরারো বলেন, ?আন্দোলন সবে শুরু। আমরা আশা করছি, এটি বৈশ্বিক আন্দোলনে রূপ নেবে।?
জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেছে পাঁচ হাজার মানুষ। বার্লিনেও হয়েছে বিক্ষোভ। সেখানে দানিয়েল গ্রেইবার নামের এক বিক্ষোভকারী বলেন, ?সেই ২০০৮ সাল থেকে আমি এই আন্দোলনের অপেক্ষায় ছিলাম। তিন বছরের অপেক্ষার পর আজ সেই দিন এসেছে।?
পর্তুগালের রাজধানী লিসবনেও বড় বিক্ষোভ হয়েছে। আয়োজকরা বলেছেন, লিসবনে অন্তত ৫০ হাজার মানুষ অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সরকারের আর্থিক নীতির প্রতিবাদে রাস্তায় নামে।
হংকংয়ের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্রে প্রায় ৫০০ মানুষ বিক্ষোভ করে। বিক্ষোভকারীরা অর্থনৈতিক অসমতা ও মুক্তবাজার পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সে?াগান দেয়। ফ্যানিং ইম নামের এক বিক্ষোভকারী বলেন, ?অর্থই একমাত্র বিষয়, যার মূল্য আছে। আমাদের সরকার একটা স্বৈর সরকার, তারা চীনের কমিউনিস্টদের নিয়ন্ত্রণে।?
হংকংয়ে ?লেফট ২১? নামে একটি গোষ্ঠীর বিক্ষোভকারী ওং ওয়েং-চি বলেন, তাঁদের ?অকুপাই সেন্ট্রাল? বিক্ষোভ যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল স্ট্রিট বিক্ষোভের প্রতি সংহতি জানানোর তৎপরতার একটি অংশ।
জাপানের রাজধানী টোকিওর রাস্তায় প্রায় ২০০ মানুষ বিক্ষোভ করে। এ সময় তারা ?টোকিও দখল করো? সে?াগান দেয়। এ ছাড়া বিক্ষোভকারীরা ফুকুশিমার পারমাণবিক বিপর্যয়ের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে। ফুকুশিমার দাইচি পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিচালনা প্রতিষ্ঠান টোকিও ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানির কার্যালয়ের সামনে তারা পরমাণুবিরোধী সে?াগান দেয়।
পুরো বিশ্বের মানুষ এখন দাঁড়াতে চাইছে একক পরাশক্তির বিরুদ্ধে। শান্তিপ্রিয় দেশগুলোর মানুষরা এই যে ফুঁসে উঠছে তা কেমনভাবে দেখছেন বিশ্ব শাসকরা ?
সিডনিতে দুর্নীতি ও পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে প্রায় ২০০০ মানুষ অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বাইরে একটি অস্থায়ী শিবির প্রতিষ্ঠা করেছে। তারা শ্লোগান দিয়েছে, ?পুঁজিবাদ আমাদের অর্থনীতিকে হত্যা করছে?।
মেলবোর্নেও প্রায় এক হাজার লোক বিক্ষোভ করেছে। বিক্ষোভের এক আয়োজক বলেন, অস্ট্রেলিয়া হয়তো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা কাটাতে পেরেছে, তবে দেশে এখনো এমন কিছু গুরুতর ইস্যু রয়েছে যা জাতিকে ভোগাচ্ছে।
নিউজিল্যান্ডের প্রধান শহর অকল্যান্ডের রাস্তায় বিক্ষোভ করেছে তিন হাজার মানুষ। পরে তারা শহরের একটি স্কয়ারে সমবেত হয়ে পুঁজিবাদবিরোধী শ্লোগান দেয়। এ ছাড়া রাজধানী ওয়েলিংটন ও ভূমিকম্পবিধ্বস্ত শহর ক্রাইস্টচার্চেও বিক্ষোভ হয়েছে।
তাইওয়ানের রাজধানী তাইপে ছাড়াও বিশ্বের অন্যান্য শহরে পুঁজিবাদবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে স্টক এক্সচেঞ্জের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করে ৫০ জনের মতো বিক্ষোভকারী। তারা সেখানে দেশের ধনী-গরিবের বৈষম্যের বিরুদ্ধে সে?াগান দেয়।
?দক্ষিণ আফ্রিকা দখল করো? আন্দোলনের একজন সংগঠক মারিয়াস বোসে বলেন, ?খেটে খাওয়া মানুষের অর্থ চুরি করে অভিজাত শ্রেণীর ধনকুবের হওয়ার লোভ সংবরণ করতে হবে।?
যুক্তরাষ্ট্রে দারিদ্র্য বেড়ে যাওয়ায় মানুষ এখন দিশেহারা। দরিদ্ররা আর ধৈর্য ধরতে পারছে না। অনেকে বলছেন, পুঁজিবাদ আমাদেরকে দাস করে রাখতে চাইছে। তা ভাঙা উচিত। তাদের বক্তব্য হচ্ছে-এই লড়াই, অতীতের দাসপ্রথা বিলোপ, নারীদের ভোটাধিকার ও নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের মতোই ?পবিত্র লড়াই?। ঠিক সে সব আন্দোলনের মতোই আমাদেরকে এ লড়াইয়েও জিততে হবে।
এই মতামতের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক রাজনীতিকও দাঁড়াতে শুরু করেছেন। বলা হচ্ছে, তাহরির স্কোয়ার থেকে টাইমস স্কোয়ার এভাবেই গণমানুষের দখলে আসবে।
সেই লক্ষ্যে, ১৫ অক্টোবর ২০১১ গোটা বিশ্বজুড়ে পালিত হয়েছে, ?গ্লোবাল ডে অব এ্যাকশন?। নিউইয়র্কের ওয়াশিংটন স্কোয়ার পার্কে এদিন প্রায় দশ হাজার মানুষের সমাবেশ অনুষ্টিত হয়েছে।
কথা হচ্ছে, পুঁজিবাদের পক্ষেও। ২০১২ সালের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্ধী হারমেন কেইন বলেছেন, বিক্ষোভকারীরা কোনো মতেই ওয়াল স্ট্রিট, বড় বড় ব্যাংকগুলোকে দোষারোপ করার কোনো অধিকার রাখে না। যাদের কাজ নেই, যারা ধনী হতে পারেনি, এর জন্য তারা নিজেরাই দায়ী। নিজেদের কর্মফলের জন্য অন্যকে তারা দোষ দেবে কেন?
অন্যদিকে রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান মিঃ রন পল বলেছেন, আমাদের বর্তমান সমাজব্যবস্থা, রাষ্ট্র ব্যবস্থা মধ্যবিত্তদের সঙ্গে প্রতারণা করছে। আমরা, রাজনীতিদের ভ্রান্ত পথ অনুসরণের কারণেই মানুষ ভোগান্তিতে আছে। এর সমাধানের পথ খুঁজতে হবে সম্মিলিতভাবে। রন পল বলেছেন , শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকে আমি সমর্থন করছি। আমেরিকার অনেক সেলিব্রিটিরাও এগিয়ে এসেছেন এই বিক্ষোভের সমর্থনে।
একটি কথা খুবই স্পষ্ট, বিশ্বে সমাজতন্ত্রের পতনের পর পুঁজিবাদ এখন একক ভাগ্যনিয়ন্ত্রক। আর এ কারণেই মানুষের জীবনে চেক এন্ড ব্যালেন্স এখন বিপর্যস্ত দেশে দেশে। পুঁজিবাদের নিয়ন্ত্রকদের শুভবুদ্ধির উদয় না হলে এর পরিণতি আরো ভয়াবহ হতে পারে।

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে