Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শুক্রবার, ২২ নভেম্বর, ২০১৯ , ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.6/5 (43 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১০-২২-২০১১

একটি তালিবানি বিবাহোৎসব

একটি তালিবানি বিবাহোৎসব
(Letters to My Daughters, ফৌজিয়া কুফির সদ্যপ্রকাশিত আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ---প্রকাশক Douglas and McIntyre. ফৌজিয়ার জন্ম আফগানিস্তানের যুদ্ধপূর্ব যুগে যখন তাঁদের পরিবারে ধনদৌলত বা সুখস্বাচ্ছন্দ্যের অভাব ছিল না। তা সত্ত্বেও এ-বইটির প্রথম অধ্যায়ের প্রথম লাইনটিই এরকমঃ ? যেদিন আমি ভূমিষ্ঠ হই পৃথিবীতে সেদিনই আমার মরে যাবার কথা ছিল?। তিনি মারা যাবেন এই আশাতে তাঁর মা, তাঁর আপন গর্ভধারিনী মা, তাঁকে ভরা দুপুরের কড়া রৌদ্রে খালি গায়ে ছেড়ে রেখেছিলেন বাইরে। কেন, এবং পরবর্তীকালে কেমন করে তিনি য কেবল বেঁচেই থাকেননি, তালিবান শাসনের বিভীষিকাময় সময়টুকু অতিক্রম করে কালক্রমে তালিবানমুক্ত আফগানিস্তানের জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্য হিসেবে দেশের প্রথম ডেপুটি স্পীকার পদ দখল করেছিলেন, বইটি সেই অবিশ্বাস্য যাত্রারই এক চিত্তাকর্ষক বর্ণনা। এর একটা অংশ গত রোববার (২৯শে মে, ২০১১) অটোয়ার দৈনিক পত্রিকা ?দ্য সিটিজেন?এ ছাপা হয়েছিল। লেখাটি বেশ ভাল লেগে গেল বলে ভাবলাম আমার পাঠকদের সঙ্গে স্বাদটি ভাগাভাগি করা যাক?।

   সংসারে এমন মেয়ে কি আছে কোথাও যে তার বিয়ের কথা ভেবে স্বপ্নের জাল বোনে না মনে মনে? আমি তার ব্যতিক্রম না।
  আমি সবসময় কি মনে করি জানেন? মনে করি যে মানুষের জীবনটা আসলে কতগুলো বিশেষ বিশেষ মুহূর্তের সমষ্টিমাত্র। এই বিশেষ মুহূর্তগুলোই আমাদের জীবনকে অর্থ দান করে, আমরা নিজেদের সত্তা অর্জন করি এগুলোর মাধ্যমে। আমরা সজ্ঞানে, সচেতনভাবে, এই ভাস্বর মুহূর্তগুলোকে বুকের মনিকোঠাতে সযত্নে লালন করি সারাজীবন। এগুলো আমাদের সিন্দুকে-ভরে-রাখা অমূল্য স্মৃতি। যেমন ধরুণ অতীতের কোনও হাসিহুল্লোড়মুখর অনুপম সন্ধ্যা, কোনও অসাধারণ আনন্দমেলা, অথবা বৃষ্টিস্নাত সবুজ ঘাসের ঘ্রাণ, নদীর ধারে সুরম্য বনভোজন, প্রাণপ্রিয় সন্তানের জন্ম, কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন উৎসবে সগৌরবে ডিগ্রি হাতে নিয়ে বের হওয়া।
   বিয়ের কন্যা যেদিন তার বিয়ের পোশাক কেনাকাটা করতে বেরোয়, সেদিনটিও তো তেমনি এক স্মরণীয় দিবস হিসেবে গণ্য হবার যোগ্যতা রাখে, তাই না? কিন্তু কি জানেন? আমার বিয়ের সময় যখন জামাকাপড় আর চাদরটাদর পরে বাজার করতে বেরিয়াছিলাম তখন নিজেকে বিয়েবাড়ির রাজকন্যা মনে হয়নি, মনে হয়েছিল একটা আস্ত ভূত বেরিয়েছে বাড়ি থেকে।
  আমি ছিলাম পরিবারের সবচেয়ে ছোট মেয়ে। সেকারণে আমার কখন বিয়ে হবে, এবং কতটা জাঁকজমকের সাথে উদযাপিত হবে সে নিয়ে বাবামা ভাইবোন কারুরই জল্পনাকল্পনার সীমা ছিল না। কত না গালগল্প আর হাসিঠাট্টা হয়েছে তা নিয়ে। বাড়িতে নিত্যই আলাপ হত আমার বিয়ের পোশাক আশাক আর অলঙ্কারাদি নিয়ে, আমার কেশবিন্যাস নিয়ে, অতিথিদের কিধরণের খানাপিনার ব্যবস্থা হবে তা নিয়ে। কি যে সুখের সময় ছিল সেটা। মানুষের মনে তখন শান্তি ছিল। নিশ্চিন্তে নির্ভয়ে বিছানায় গিয়ে ঘুমোতে পারত। সেযুগে আমাদের পরিবারটি বেশ সচ্ছলই ছিল বলা চলে---খাওয়াপরার কোনও অভাবই বোধ করিনি আমরা। সেটা যুদ্ধপূর্ব যুগ। মনুষ্যত্বের যুগ। সুতরাং আমার বিয়েটা যে মহা আড়ম্বরে পালন করা হবে, যাতে উপস্থিত থাকবে দূর দূরান্ত থেকে আসা আত্নীয় পরিজন আর পারিবারিক বন্ধুবান্ধব সেটা অনায়াসেই ধরে নেওয়া যেত। এই জাঁকজমকের ব্যাপারটি কিন্তু একসময় আমি নিজে খুব একটা ভাল চোখে দেখতাম না-- অহেতুক বাড়াবাড়ি বলেই মনে হত। তারপর যখন বিয়ের বয়স কাছিয়ে আসতে থাকল তখন আস্তে আস্তে আমার মত বদলাতে শুরু করল। বিয়ে ঘটনাটির যে রোমান্টিক দিক আছে সেটাই বড় করে দেখা দিতে লাগল আমার কাছে। তাই তো, বিয়ে তো মানুষের একবারই হয়। হোকনা একটু বাড়াবাড়ি---কি আছে তাতে। ধূমধামের ব্যাপারটি তখন আর খুব আপত্তিকর মনে হলনা। আমি বাড়ির কনিষ্ঠ মেয়ে---সকলের চোখের মণি। আমার বিয়েতে ধূমধাম হওয়াটাই তো স্বাভাবিক। বলতে লজ্জা নেই যে সেই স্বপ্নিল দিনটির পথ চেয়ে আমি বরং অধীর আগ্রহের সাথেই অপেক্ষা করছিলাম। খুব করে চাইছিলাম বাড়িশুদ্ধ লোক সারা বাড়ি মাথায় তুলুক আমার বিয়ের আয়োজনে। বিশেষ করে আমার মা। কিন্তু কি পোড়া কপাল আমার যে সেই মা?ই চলে গেলেন ঠিক বিয়ের আগে আগে। তিনি গেলেন বটে, কিন্তু আমার মনের গভীর কন্দরে রেখে গেলেন এক দুঃসহ ব্যথার যন্ত্রণা। আমি কখনোই কল্পনা করিনি যে আমার বিয়ের দিনটিতেই তিনি ইহধামে থাকবেন না।
  সাথে সাথে এ?ও কল্পনার মধ্যে ছিল না আমার যে আমার বিয়ে হবে ঠিক যখন তালিবানরা কায়েম হয়ে বসেছে দেশে। ওদের হাতে শাসনদণ্ড ছিল বলে নাচগান বাদ্যবাজনা ভিডিও, এসব করার উপায় ছিল না। সব নিষিদ্ধ। বড় বড় রেস্টুরেন্ট বা মিলনায়তন যেখানে বিয়েশাদীর ব্যবস্থা হয় সাধারণত, সেগুলো ওরা আইন করে বন্ধ করে দিয়েছিল। যে-কোন আনন্দ উৎসবই একেবারে বেআইনী। আনন্দ শব্দটাই ভীষণ আতঙ্কজনক তালিবানদের জন্যে---আনন্দ মানেই যেন সোজা দোজখ। আচ্ছা বলুন, বিয়েতে একটু হৈহল্লা আমোদফূর্তি হবে না এটা কি কোন কথা হল? সংসারে কোন মেয়েই কি সেটা মেনে নিতে পারে? বিয়ের প্রতীক্ষায় আমার সলজ্জ উত্তেজনা দূরে থাক, রোজ রাতে শুয়ে শুয়ে আমি কাঁদতাম---কেঁদে কেঁদে বালিশ ভিজিয়ে একসময় হয়ত ঘুমিয়ে পড়তাম। কান্না এই তালিবানি নিষ্ঠুরতার জন্যেই ছিল না কেবল, ছিল আমার মা?কে অসময়ে হারানোর ব্যথাতেও।
  তালিবান যুগে বোরখা ছাড়া বাইরে যাওয়া মেয়েদের জন্যে গুরুতর অপরাধ---আইনত দণ্ডণীয়। কিন্তু আমি কিছুতেই মন থেকে সাড়া পাচ্ছিলাম না নিজের জন্যে একটা পছন্দমত বোরখা কিনতে দোকানে গিয়ে। বাইরে বেরুনোটাই ছেড়ে দিয়েছিলাম প্রায় বোরখা পরার ভয়ে। কিন্তু বিয়ের সদাই আমি করি কি বাজারে না গিয়ে। এদিকে বোরখা ছাড়া ঘরের বাইরে পা ফেলার যে কি ঝুঁকি সেটা কোন আফগান মেয়েরই অজানা ছিল না। শেষে ঠিক করলাম আমার মা যে বোরখাটা ব্যবহার করতেন সেটাই পরে যাব। যেমন তেমন বোরখা ছিল না ওটা---জমকালো চুনিদার বোরখা, যাতে আভিজাত্যের ছাপ, উঁচু বংশের ছাপ। আজকালকার সস্তা পাকিস্তানী নাইলন বোরখাগুলো দুচোখে দেখতে পারতাম না আমি। পরতেই যখন হবে সস্তা আজেবাজে জিনিস পরব কেন।
  বাজারের দিন আমার সাথে ছিল আমার ভাবী বর, আর তার এক বোন। অনেকগুলো মাস কেটে গেছে আমার প্রিয়তম মানুষটিকে চোখে দেখার সুযোগ হয়নি। শেষ দেখেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে, তখনো তালিবানরা ক্ষমতায় আসেনি---ক্ষমতা ছিল মুজাহিদদের হাতে। যেদিন আমার বড়ভাই (বাবা তো তার অনেক আগেই পরলোকে চলে গিয়েছলেন)হামিদের সঙ্গে আমার বিয়েতে চূড়ান্ত মত দিয়েছিলেন সেদিন ওকে ভারি সুন্দর দেখাচ্ছিল। দীর্ঘাঙ্গী, স্বাস্থ্যবান সুপুরুষ, ছোট করে ছাঁটা একগোছা দাড়ি। কিন্তু বাজারে যে লোকটাকে দেখলাম সে যেন সম্পূর্ণ অন্য মানুষ। লম্বা দাড়ি (পুরুষদের জন্যে সেটাও আবশ্যিক), চেহারানমুনাতেও কেমন সাদামাঠা, নিস্প্রভ, নিস্তেজ। বেচারার চেহারা দেখে আমার মনটা নতুন করে বিষিয়ে উঠল তালিবান নামক এই দস্যু জাতিটার ওপর। আমার অভাগা দেশটা একটু একটু করে এগুতে শুরু করেছিল---সে শুরুটা তারা মুগুরের আঘাতে থামিয়েই দিল না কেবল, পেছনদিকে  মোড় ঘুরিয়ে দিল। আজকে আমার সোনার দেশটির শাসনদণ্ড চলে গেল একদল গণ্ডমূর্খ বন্য জীবের হাতে।
  তালিবানরা আরেকটা আইন জারি করেছিল মেয়েদের পায়ে তালা লাগানোর উদ্দেশ্যেঃ কোন মেয়েকে যদি অনিবার্য কারণে ঘরের বাইরে যেতেই হয়, তাহলে তার সঙ্গে থাকতে হবে একজন নিকটাত্মীয় পুরুষ---হয় বাবা, নয়ত আপন ভাই, বয়সে ছোটবড় যা?ই হোক, কিংবা চাচা মামাধরণের মুরুব্বীস্থানীয় ব্যক্তি। বোরখা জিনিসটা আমাদের আফগান সমাজে আগেও ছিল---বাধ্যবাধকভাবে নয়, স্বেচ্ছামূলকভাবে। আমার দাদীনানীরা খুশি হয়েই পরতেন। কিন্তু এই ?পুরুষ অভিভাবকের? নজরদারি ছাড়া বাইরে যাওয়া চলবে না এটা একেবারে নতুন---পুরোপুরি আরবি প্রথা। তালিবানরা এসে সমাজের সনাতন ধারাটিকে আফগানমুখি না রেখে আগাগোড়া আরবমুখি করে ফেলল।
   আফগান নারীকে গৃহবন্দী করার চেষ্টায় তালিবানরা শহরের মোড়ে মোড়ে পাহারাদার মোতায়েন করত। তাদের প্রধান কর্তব্য ছিল গাড়ি থামিয়ে আরোহীদের পোশাক আশাক আর পরিচয়পত্র পরীক্ষা করা। কোন মেয়ে যদি প্রমাণ করতে না পারত যে তার পুরুষ সঙ্গীটি সত্যি সত্যি তার রক্তের আত্মীয়, তাহলে তার বারোটা বেজে গেছে। তাকে বাঁচানোর সাধ্য কার। তালিবানদের পুরো একটা মন্ত্রণালয় ছিল নারীপুরুষের চরিত্রের ওপর নজরদারি করার---এর নাম ছিল ?পাপপুণ্য মন্ত্রণালয়?। অর্থনীতি বা শিক্ষাদীক্ষা নিয়ে তেমন মাথাব্যথা ছিল না ওদের যতটা ছিল চারিত্রিক শুদ্ধি নিয়ে---মানে তালিবানি শুদ্ধি যার সঙ্গে মনুষ্যত্বর খুব একটা সম্পর্ক ছিল না। নারী যেন সূর্যের মুখ না দেখে।
  তালিবান পাহারাদের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা ছিল বিয়ের বাজার। তারা যত অশিক্ষিতই হোক এটুকু জ্ঞান তাদের ছিল যে বিয়ের বাজারে যেতেই হবে মেয়েদের---অতএব সেটাই হল শিকারের উত্তম জায়গা। বিয়েতে একটু সাজগোজ করতে চাইবে না এমন কোন মেয়ে আছে সংসারে? অথচ সেখানেই তালিবান সরকারের কড়া নির্দেশ---কোনরকম জমকালো বা পশ্চিমা পোশাকাদি চলবে না। আমার চোখের সামনে দেখলাম একটি মেয়ে সাদা ট্রাউজার পরে বাজার করতে এসেছে। আমি প্রমাদ গুণলাম---বোকা মেয়ে কি আত্মহত্যা করতে চাইছে? ট্রাউজার তো কবিরা গুণার শামিল। বেচারি হয়ত তালিবানদের ভয়ে ঘরের দরজা খুলে বাইরে উঁকি মেরেও দেখেনি কোনদিন---জানতই না কোন পোশাকের কি শাস্তি। অজুহাত যা?ই হোক ?পাপের? কোনও মাফ নেই। আমি নিজের কানে শুনলাম কে একজন আরবিতে তীক্ষ্ণভাবে গালাগাল করছে মেয়েটিকে( তদ্দিনে প্রচুর আরবি মর্দ আমদানি হয়েছে আফগানিস্তানে)। আরবি ভাষায় কর্কশ চিৎকার শুনে তালিবান বীরপুরুষগণ তুমুল বিক্রমে মেয়েটিকে মাটিতে শুইয়ে চাবুক দিয়ে চাবকাতে শুরু করল দুপায়ে ( অর্থাৎ কোন্ সাহসে বেটি ট্রাউজার পরেছি পায়ে?)।সে কি বুকফাটা চিৎকার মেয়েটির। আমি তাকাতে পারলাম না বেচারির দিকে। রাগে দুঃখে এমন জোরে কামড় দিলাম নিজের ঠোঁটে যে রক্ত বেরিয়ে গেল। চোখের সামনে এতবড় একটা পাশবিক ঘটনা ঘটে গেল, অথচ আমি অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম পুরো দৃশ্যটা---কিছু করবার সাহস পেলাম না।
  ?পাপপুণ্য? বিভাগের সরকারি গাড়িটির কথা আমি জীবনে ভুলতে পারব না।  বেশির ভাগ গাড়িই ছিল হাইলাক্স কোম্পানির ট্রাক। এগুলোর কাজ ছিল টো টো করে সারা শহর চষে বেড়ানো লাউডস্পীকারে পবিত্র কোরানের সূরা বাজিয়ে বাজিয়ে। ওই গাড়ির শব্দ শোনামাত্র আফগানি মেয়েদের ভয়ে বুক কাঁপত, জিভ শুকিয়ে যেত আসন্ন বিপদের সম্ভাবনায়। তাদের ছুটাছুটি শুরু হয়ে যেত কোথায় লুকানোর জায়গা পাওয়া  যায়। তুচ্ছ নগণ্য অপরাধের জন্যেও শক্ত পিটুনি খেতে হত তাদের প্রকাশ্য রাস্তায়। মাঝে মাঝে কোনও অন্যায় না করেও মার খেত কেউ কেউ। হয়ত একটা বোরখাপরা মেয়ের দিকে তাকিয়ে তাদের সুবিধা মনে হচ্ছে না, ব্যস, লাগাও চাবুক। একদিন আমি নিজের চোখে দেখলাম একটা অল্পবয়স্ক মেয়েকে মারতে শুরু করেছে তারা কি জানি কি কারণে, আর বেচারির মা-বোন দুজনে মেয়েটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে আগলে রাখার জন্যে। কিন্তু তালিবান কি পিছপা হবে তাতে? চাবুক চলল একজন নয়, তিনজনেরই ওপর।
  সেদিন আমার কপালটা ভাল ছিল। বাজারে গিয়েছিলাম আমরা তিনজনে মিলেঃ আমি, আমার ভাবী স্বামী এবং ভাবী ননদ। ?ভাবী স্বামী? অবশ্য আইনত ঠিক স্বামী নয়, সুতরাং ধরা পড়লে বিপদ। তালিবানরা টের পেলে আমার বারোটা বেজে গিয়েছিল। ননদটির কিছু হত না, হত আমার---ও তো নিজের সহোদর ভাইয়ের সঙ্গে এসেছে, আমি এসেছি পরপুরুষের সঙ্গে---অমার্জনীয় অপরাধ। সৌভাগ্যবশত ওরা বোধ হয় আমাদের তেমন লক্ষ্য করেনি। বেশ নিরঞ্ঝাটেই আমার বিয়ের আংটি কেনা গেল। বোরখার ফাঁক দিয়ে আমার প্রিয় মানুষটির দিকে এক নজর তাকালাম। একটি অবর্ণনীয় সুখের মুহূর্ত সেটি। ওর চোখেমুখে সুখের দীপ্তি, আমার প্রাণেও প্রেমের প্রবল উচ্ছ্বাস। আংটি কেনার পর খুঁজতে থাকলাম জামাকাপড়ের দোকান। কিন্তু কোথায় জামাকাপড়? বেশির ভাগ দোকানই তালামারা। ব্যবসা মন্দা। এত কড়াকড়ি আর বাধানিষেধের পর কারও ব্যবসা চলতে পারে? আমার বড় সখ ছিল ফাঁপা খোলা-হাতা জামা কেনা বিয়ের সময়। কিন্তু সেটাও নিষিদ্ধ--- মেয়েদের গায়ের এতটুকু চামড়া যেন কারো চোখে না পড়ে!
   শেষ পর্যন্ত বিয়েটা হয়ে গেল আমার---কোনরকমে। তেতোমিষ্টিতে মিলিয়ে। আমার মা নেই, যে-কটা বোন বেঁচে আছে এখনো তাদের একজনও আসতে পারেনি বিয়েতে। মায়ের কথাটাই বারবার মনে পড়ছিল। এই মা, আমার জন্মমুহূর্তেই যিনি আমাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিলেন, সেই একই মা সারাজীবন কি প্রাণান্ত চেষ্টাই না করেছিলেন যাতে আমার একটা সুন্দর জীবন হয় ভবিষ্যতে, এমনকি মৃত্যুশয্যাতে শুয়েও আমার ভাবী বর পছন্দ করে গিয়েছিলেন, তাঁর না থাকা্টা আমি কেমন করে মেনে নিই বলুন। মনটা আমার হু হু করে কাঁদছিল সারাক্ষণ। মেয়েদের বিয়েতে তাদের সবচেয়ে বড় সহায় কে? তার মা। যিনি কানে কানে কত কথা বলে যান মেয়েকে, কত উপদেশবাণী, শ্বশুরবাড়ির কত গোপন রহস্য যা শুধু মায়েরাই জানেন তাদের সারাজীবনের সুখদুঃখভরা তিক্তমধুর অভিজ্ঞতা থেকে, সেই অমূল্য সুধাবাণী থেকে আমি চিরবঞ্চিত। মা?ই তো তাঁর প্রাণের মেয়েকে শেষ বিদায় জানানোর জন্যে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকেন কাতর চোখে। তার ওপর এই ঘনায়িত কৃষ্ণপক্ষ সারা দেশজুড়ে। চারিদিকে তালিবানের শ্যনদৃষ্টি। আফগান মেয়েদের ভাগ্যে কি সুখ বলে কিছু থাকা সম্ভব?
  সকাল ছ?টায় আমি হেয়ারড্রেসারের দোকানে উপস্থিত। ভদ্রমহিলা আমার চেহারা দেখেই কপাল কুঁচকালেন। কি ব্যাপার? এমন হতচ্ছিরি দশা কেন তোমার? ঘুম হয়নি বুঝি সারা রাত? আসলেই হয়নি। আয়নাতে নিজের চেহারা দেখে বুঝলাম কি বিধ্বস্ত অবস্থা দাঁড়িয়েছে আমার। চুল ছাঁটব কি, চেয়ারে বসেই কখন ঘুমিয়ে পড়লাম মনে নেই। ঘুম ভাঙ্গতে ঘড়িতে দেখি সাড়ে দশটা। ঘুম কিছুটা হল বটে, কিন্তু মনটাকে ভাল করি কি করে। চেহারার অবস্থা আগের মতই---মানে যাচ্ছেতাই, তাকানো যায় না। চোখের কোণায় লালচে রেখা, গালে মুখে গোটা গোটা দাগের মত কিসব। কিছুতেই ফূর্তি আনতে পারছিলাম না মনের মাঝে। কি করে আনি বলুন, অসভ্য তালিবান আমার বিয়েতে ভিডিও ক্যামেরা ব্যবহার করতে দেবে না, পেশাদার ফটোগ্রাফার আনতে দেবে না---ওসব নিষিদ্ধ। দুয়েকজন দুঃসাহসী ফটোগ্রাফার যা?ও পাওয়া যাচ্ছিল, একেবারে গলাকাটা দাম। কি করব, শেষ পর্যন্ত দুয়েকজন বন্ধুবান্ধবের ব্যক্তিগত ক্যামেরাতে যাকিছু তোলা সম্ভব হল তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হল। আমার বিয়ের কোনও উল্লেখযোগ্য স্মৃতি ধরে রাখা সম্ভব হল না এই অভিশপ্ত তালিবান জাতিটার জন্যে।
  বিয়ের অতিথিদের অনেককেই আমি চিনতাম না। তারা কারা? একবেলা স্বাদু খানাপিনার জন্যেই কি তারা এসেছিল বিয়েতে? ওদের মুখ দেখে খুশি না হয়ে বরং বিরক্তিই লাগছিল আমার।
  বিয়ের ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদির জন্যে হামিদ আর আমি একটা আলাদা ঘরে গেলাম, দু?জন সাক্ষী সহকারে। মৌলবীসাহেব আমাদের দু?জনকে সূরাটুরা পড়িয়ে বিবাহপর্ব সমাপ্ত করলেন। কেন জানিনা ঠিক্ তখনই আমার বুক ফেটে কান্না পেতে লাগল। কিছুতেই সামাল দিতে পারছিলাম না নিজেকে। চোখের পানিতে আমার কাপড়জামা ভিজে যেতে লাগল। গালেমুখে রুজপাউডার যা ছিল সব রঙ বারিধারার মত বইতে শুরু করল, ফলে বারোটা বেজে গেল আমার বিয়ের সাজসজ্জার। ভাগ্যিস এর ঠিক পরের পর্বেই ছিল পোশাক বদলে একটা সাদা লেসবাঁধা কাপড় পরা। তাতে চেহারার কিছুটা উন্নতি হয়েছিল, অন্তত আমার মতে। নববধূর লম্বা ঘোমটা আর জমকালো সাদা পোশাকে নেহাৎ খারাপ দেখাচ্ছিল না আমাকে।
  সন্ধ্যার দিকে এল বিদায়ের পালা। নিয়ম হল পরিবারে জ্যষ্ঠ গুরুজন, বাবা কিংবা বড়ভাই, একটা ছোট কাপড়ের পুঁটলিতে সামান্য কিছু মিষ্টি আর কাপড়চোপড় ভরে, রঙ্গিনব সূতো দিয়ে মেয়ের কব্জিতে বেঁধে দেওয়া----যার অর্থ হল যে তোমাকে এবার স্বামীর হাতে ছেড়ে দিচ্ছি। ওই মুহূর্তটিই সবচেয়ে কষ্টকর। সবচেয়ে অন্তরঙ্গ বেদনার সময় ওটি। আমার ভাই মির্শাকি যখন পুঁটলিটি বেঁধে দিচ্ছিলেন আমার হাতে তখন আমি কিছুতেই সামলাতে পারছিলাম না নিজেকে---অঝোর কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম। সাথে সাথে ভাইটিও কাঁদতে শুরু করলেন আমাকে জড়িয়ে ধরে। দু?ভাইবোন আমরা পরস্পরকে জড়াজড়ি করে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদলাম বেশ কিছুক্ষণ। আমরা কি কেবল মুহূর্তটির বিপুল আবেগোচ্ছ্বাসে বিহ্বল হয়েই কান্না থামাতে পারছিলাম না? না, তা নয়। আমরা, দু?টি আত্মার বন্ধনে আবদ্ধ মানুষ, আমরা শৈশব থেকে যৌবনে পৌঁচেছি একই সঙ্গে চার দেয়ালের পরিসীমাতে, আজকে আমরা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হতে যাচ্ছি সারাজীবনের জন্যে, সেই অপরিসীম বেদনাটির যে কি বিশালতা, সেটা শ্বশুরালয়গামী কোন মেয়েরই তো অজানা নয়। তার ওপর বাবা নেই, মা নেই, নেই আমার প্রিয় বোনেরা। কিন্তু আফগান আকাশে আরো একটি করাল ছায়া বিপুল পাখা মেলে বিরাজ করছিল তখন---তালিবান। আমাদের প্রিয় দেশটিকে তারা ধ্বংস করে দিয়েছে। সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে কি মন খুলে হাসতে পারে কেউ? পারে কি কোন নববধূ তার কান্না থামাতে বড়ভাইয়ের বুকের ওপর মাথা রেখে? একদিন আমাদের পরিবারে কোনকিছুরই অভাব ছিল না, আজকে আমরা বলতে গেলে নিঃস্ব, অসহায়, পঙ্গু--- হৃতসর্বস্ব, হতবল, হতচিত্ত। না, আমি শুধু পারিবারিক বিচ্ছেদের কারণে কাঁদিনি, কেঁদেছিলাম আমার দেশহারানোর সীমাহীন বেদনাতেও। নিজেকে বড় নিঃস্ব মনে হচ্ছিল---আমার মা নেই, বাবা নেই, ভাইদেরও কেউ কেউ নেই, বোনেরা অনুপস্থিত, সর্বোপরি আমার দেশব্যাপী এই অনির্বান দাবানল।
 একসময় ভাইটি তাঁর আবেগের রাশ টেনে ধরলেন। কন্ঠে একটু মুরুব্বিয়ানা ভাব এনে কপট কঠোরতা দেখিয়ে বললেনঃ ?ঢের হয়েছে ফৌজিয়াজি, আর নয়?। এই বলে আমার নাকের ডগাতে একটু আঙ্গুল ছুঁইয়ে আদর করলেন, জোর করে একটু হাসবারও চেষ্টা করলেন। তারপর আলগোছে আমার হাত ধরে বাইরের অপেক্ষমাণ গাড়িতে তুলে দিলেন আমাকে।

অনুবাদকঃ মীজান রহমান
অটোয়া, ৩রা জুন, ?১১
মুক্তিসন, ৪০

মুক্তমঞ্চ

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে